বি হারের পাঁচ দফা বিধানসভা নির্বাচনের চতুর্থ দফার ভোটগ্রহণ প্রায় শান্তিপূর্ণ ভাবেই সাঙ্গ হয়েছে। আর এক দফা ভোটগ্রহণের পর ৮ নভেম্বর নির্বাচনী ফলাফল জানা যাবে। দেশের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে প্রায়শই বিহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বারের নির্বাচনও সেখানে কোনও ব্যতিক্রম হবে না। মোদী-নীতীশকুমার দ্বৈরথ, লালুপ্রসাদ ও নীতীশকুমারের জোটে সনিয়া গাঁধীর কংগ্রেসের শামিল হওয়া, কোনও জোটে শামিল না হয়ে বামপন্থীদের একক ভাবে প্রতিটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত— এগুলি অবশ্যই সারা দেশের নজর কেড়েছে। সন্দেহ নেই, বিহার বিধানসভার নির্বাচনী ফল সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ছায়া ফেলবে।

এ বারের বিহার বিধানসভা নির্বাচন যে-সব বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলি হল:

এক, একদা নির্বাচনী হিংসায় কুখ্যাত বিহারের এ বারের নির্বাচন লক্ষণীয় ভাবে শান্তিপূর্ণ থেকেছে। এতে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সুস্থ ভোট করার তাগিদে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশকুমারের ভূমিকাও— কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনে পশ্চিমবঙ্গের মতো তিনি কোনও বাগড়া দিতে চাননি।

দুই, বিহার নির্বাচনে এজেন্ডায় ছিল বিজেপি অনুসৃত বিকাশের লাইন বনাম লালু-নীতীশের সামাজিক ন্যায়ের লাইন। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে মোদী-ম্যাজিকে নীতীশকুমার পর্যুদস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তার পর দেড় বছরে এক দিকে মোদী-ম্যাজিকের আবেদন ভোঁতা হয়েছে। এর পিছনে যেমন প্রতিশ্রুত কর্ম সম্পাদনে সরকারের অক্ষমতা কাজ করেছে, তেমনই কার্যকর হয়েছে আখলাক হত্যা, দলিত নিপীড়ন, বিরোধী বিদ্বজ্জন নিধন, বিরোধীদের মুখে কালি লেপন ইত্যাদি অপকর্মের মাধ্যমে দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার অগণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠা।

অন্য দিকে, অস্বীকার করা যাবে না যে, গত দুই দশকে লালু এবং নীতীশের জমানায় সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে এবং গত এক দশকে নীতীশের জমানায় উন্নয়নের কাজে অগ্রগতি হয়েছে। এর ফলে আরজেডি–জেডিইউ এবং কংগ্রেস জোট অনেকাংশে জমি পেয়েছে। লক্ষণীয়, এ কারণেই বিহার নির্বাচনে মোদী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের ভূমিকা ঘিরে  বিজেপি পিছু হটেছে এবং বিকাশের বদলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পথ নিতে বাধ্য হয়েছে।

তিন, আরজেডি, জেডিইউ এবং কংগ্রেস— যাদের জনভিত্তি ভিন্ন, তারা নিজেদের বিভেদ ভুলে জোটবন্ধনে সফল হয়েছে। এই তিন দলের মাঝে পার্থক্য ও বিতর্ক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও বিজেপি এই বিভেদ উসকে দিতে পারেনি। এ যাবৎ এই তিন দলের নেতারাই এক মঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ কতটা কার্যকর হয়েছে তা ফলাফলে বোঝা যাবে।

চার, বিহার নির্বাচনে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হয়েছে বামপন্থীদের অবস্থান। বামপন্থীরা বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে এই সন্ধিক্ষণে দেশের পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ বলে ঘোষণা করেছে, এমনকী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ বলে চিহ্নিত করে সকল বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে এসেছে। অথচ বিহারের ক্ষেত্রে বামপন্থীরা স্বতন্ত্র জোট করে সকল আসনে প্রার্থী দেওয়ার লাইন নিয়েছে। এই স্ববিরোধিতার কারণে বামপন্থীদের ভূমিকা বিভেদমূলক হতে বাধ্য। এ কথা ঠিক যে, অতীতে একের পর এক জোটে শামিল হয়েও বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হয়নি, বরং তাঁদের ভূমিকা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। তাই মনে হতেই পারে যে, দলীয় শক্তি বৃদ্ধির তাগিদে একক ভাবে প্রার্থী দেওয়াতে দোষের কিছু নেই। লালুপ্রসাদ, নীতীশ কুমার বা কংগ্রেসের যে সমালোচনা বামপন্থীরা করেছেন, তা–ও অবজ্ঞা করা যায় না। কিন্তু সব প্রশ্নেই সময় নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এই রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে বামপন্থীরা নিজেরাই ঘোষণা করছেন যে, সর্বশক্তি দিয়ে বিজেপি-কে প্রতিহত করা কর্তব্য, নিজেরাই বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়ভার স্বীকার করে নিচ্ছেন, অথচ এখন সেই কর্তব্য ভুলে আলাদা করে প্রার্থী দিয়েছেন! এর ফলে আগামী দিনে দেশব্যাপী বিজেপি-বিরোধী জোটে বামপন্থীদের অবস্থান দুর্বল হবে। আরজেডি-জেডিইউ-কংগ্রেস জোট যে আগামী দিনে বিজেপি-র বিরুদ্ধে বিকল্প গঠনের ভিত্তি হবে তা এখন স্পষ্ট। সেখানে বামপন্থীদের নতুন করে জায়গা করে নিতে হবে। বামপন্থীদের এই অবস্থানে দূরদর্শিতা নেই, কার্যকারিতাও নেই।

বামপন্থীদের স্বতন্ত্র গণভিত্তি গঠনের এই কর্মসূচি কোনও ক্রমেই সময়োচিত নয়। ঘটনা হল, বামপন্থীরা বিহারে একটি আসনেও সম্ভবত জয়লাভ করবেন না। কিন্তু যে ক’টা ভোট তাঁরা পাবেন, তা বিজেপি-বিরোধী জোটকে দুর্বল করবে এবং প্রকারান্তরে বিজেপির সহায়ক হবে। তা ছাড়া, নিজেদের শক্তিহীনতার দায়ভার বামপন্থীরা জোট গঠনের কার্যক্রমের ওপরে চাপিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, জাতপাতের কথা তুলে সামাজিক ন্যায়ের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটাই বামপন্থীদের শক্তি হ্রাসের কারণ কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ঘটনা হল, বিহার জুড়ে যখন সামাজিক ন্যায়ের ক্ষেত্রে একের পর এক সংগ্রাম গড়ে উঠেছে, তখন শ্রেণিসংগ্রামের ধুয়ো তুলে বামপন্থীরা সেই সংগ্রাম থেকে দূরত্ব রচনা করে নিজেদের হীনবল করেছেন। নির্বাচনে বার বার তারই ছায়াপাত ঘটেছে। রেজ্জাক মোল্লা সাহেবের মতো যেমন জাতপাতের সংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে চিনের দেওয়াল তোলা ঠিক নয়, তেমনই কখনও ভোলা উচিত নয় যে, জাতপাতের সংগ্রাম শেষ বিচারে শ্রেণিসংগ্রামের তথা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ।

পাঁচ, বামপন্থীদের অবস্থানের ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ে মমতাদেবী সর্বভারতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করতে চাইছেন। সন্দেহ নেই যে, এই অবস্থান সুবিধাবাদী— বিজেপি-র কোনও ক্ষতি না করে তিনি বিজেপি-বিরোধী জোটে শামিল হতে চাইছেন। লক্ষণীয়, বিহার নির্বাচনের প্রথম দুই পর্বে, যখন বাঙালিপ্রধান এলাকাগুলিতে ভোট ছিল এবং মমতা দেবীর যৎসামান্য প্রাসঙ্গিকতা ছিল তখন মমতাদেবী চুপ করে বসেছিলেন, এর পর যখন তাঁর কোনও প্রাসঙ্গিকতাই নেই, তখন লালু-নীতীশ-সনিয়াকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করছেন! বামপন্থীরা বিজেপি-বিরোধী মহাজোটে শামিল হলে মমতাদেবী এই সুযোগ পেতেন না। তাঁকে হয় নির্বাচনের দিকে হাত বাড়াতে হত, অন্যথায় একক বিচ্ছিন্নতায় সন্তুষ্ট থাকতে হত।

ঘটনা হল, বিহার নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, সেই ফলাফলে সর্বভারতীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ উন্মোচিত হবে।