পূর্ব মেদিনীপুরের এক অংশের বিপদ ছিল কেলেঘাই নদী। অবিভক্ত মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে প্রবাহিত কেলেঘাই নদী দুঃখের কারণ ছিল বহু নদীপারের বাসিন্দার। এই জেলারই পটাশপুর ও ভগবানপুর থানা এলাকায় প্রায় ১২ কিলোমিটার জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে কেলেঘাই নদী। নদীর নাব্যতা ক্রমেই কমছিল। ফলে জলধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। ২০০৮ সালে কেলেঘাই ভয়ঙ্কর রূপে ধেয়ে আসে। পটাশপুর, ভগবানপুর এবং সবং এলাকায় জলের চাপে ভেঙে যায় নদী বাঁধ। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ভেঙে পড়েছিল কয়েকশো কাঁচা বাড়ি। মৃত্যুও হয়েছিল বেশ কয়েক জনের। 

কেলেঘাই-কপালেশ্বরী নদী সংস্কারে দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। দাবি শুরু হয় সংস্কার। এর ফলে কেলেঘাই নদী তার নাব্যতা আগের মতো অনেকটাই ফিরে পেয়েছে। নদী বাঁধ উঁচু করে বাঁধা হয়েছে। বর্ষার সময়ে নদীতে ভরা জলের স্রোত বইলেও বাঁধ মজবুত থাকায় নদী ভাঙনের আশঙ্কা অনেকটা কমেছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে ভগবানপুরের লছমিচক, আড়গড়া, তাপিন্দা-সহ একাধিক মৌজা কেলেঘাই নদীর জলে ডুবে যায়। এগুলো সবই নদী সংলগ্ন এলাকা। বেশ কয়েকটি মৌজার ধান এবং আনাজ চাষ নষ্ট হয়। 

ভগবানপুরের এই এলাকাগুলোতে প্রতি বছরই বর্ষায় জলে ডোবে। তবে চলতি বছরে জল বেশি ঢুকেছিল। এলাকগুলোয় ৭২ ঘণ্টায় জল ছিল। কেন এই ঘটনা? কেলেঘাই নদীর উপরে বেশ কিছু বাঁশের সাঁকো রয়েছে। আর নদীতে রয়েছে প্রচুর কচুরিপানা। একসময়ে কচুরিপানাগুলো বিভিন্ন সাঁকোর নীচে আটকাতে থাকে। জল একটু বাড়তেই তা বেরবার পথ পায়নি। ফলে এলাকা জলের তলায় চলে যায়। ভাঙে সাঁকো। বিপদের সময়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, বেশ কিছু বাঁধে ফাটল রয়েছে। ভগবানপুরের বিধায়ক অর্ধেন্দু মাইতি জানিয়েছিলেন, দ্রুত সাঁকো সারানো হবে। সেচ দফতর জানিয়েছিল, বাঁধের কিছু জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। সেই মেরামত করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে করা হচ্ছে। যাতে বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। কিন্তু এগুলো সবই সাময়িক পদক্ষেপ। নিয়মিত নজরদারি না চালালে বিপদ প্রতি বছরই ঘটবে।

পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়া দু’টি নদীর ভাঙনে বিপর্যস্ত। একটি হুগলি নদী। অন্যটি হলদি। কেন ভাঙনের গ্রাসে বিভিন্ন এলাকা? এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় নিয়ম না মেনেই তৈরি হচ্ছে ইট ভাটা আর মাছের ভেড়ি। এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে বড়সড় ভাঙনের শঙ্কায় স্থানীয় মানুষ থেকে স্থানীয় ব্লক প্রশাসন। কুকড়াহাটির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়েই রয়েছে হুগলি নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষেই রয়েছে দু’টি গ্রাম এরিয়াখালি আর রায়নগর। নদীর ভাঙনে দিনের পর দিন বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে 

এলাকার জমি। এতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন স্থানীয় প্রশাসন থেকে গ্রামবাসীরা। ঘূর্ণিঝড় ফণীর দাপটে, হুগলি নদীর জলের চাপে বেশ কিছু এলাকার ক্ষয় হয়েছে।

সেচ দফতর অবশ্য ইতিমধ্যেই এলাকায় ভাঙন রুখতে বাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। কুকড়াহাটি–রায়চক জেটি ঘাট থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে এরিয়াখালি ও রায়নগর গ্রাম সংলগ্ন নদী বাঁধে বড় ধরনের ফাটলের মুখে পড়েছে। এরিয়াখালির শিবমন্দির এলাকায় হুগলি নদীর জল আছড়ে পড়ার কারণে বিরাট অংশে ভাঙন স্পষ্ট দেখা যায়। ২০০২ সালেও এখানে ভাঙন ঠেকাতে বাঁধ দেওয়া চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আজও সেই সমস্যা মেটেনি। স্থানীয় বাসিন্দা চন্দন দাস বলেন, ‘‘এই নদী বাঁধের অবস্থা খুবই খারাপ। যে কোনও দিন নদী বাঁধ উপচে আসতে পারে জল। প্রশাসন কংক্রিটের বাঁধন না দিলে রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।’’এই নদী বাঁধ এলাকায় প্রচুর ইট ভাটা তৈরি হচ্ছে। তৈরি হয়েছে মাছের ভেড়ি। নদী বক্ষের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। অভিযোগ ইট ভাটা মাটি কেটে নেওয়ায় পলি জমতে পারছে না। ফলে পাতলা হচ্ছে নদী বাঁধের মাটি। নদীর জল সরাসরি আঘাত করছে নদী বাঁধে। বিঘার পর বিঘা হারিয়ে যাচ্ছে নদী গর্ভে। সুতাহাটা পঞ্চায়েত সমিতির বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ অভিষেক দাস বলেছেন, ‘‘এলাকায় ৯-১০টি ইট ভাটা রয়েছে। আমরা পরিদর্শন এবং নজরদারি করে 

বিষয়টি দেখছি। বিডিও অফিসে আলোচনা হয়েছে। সমস্ত ইট ভাটা মালিকদের ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।’’

জেলিংহ্যামে ভাঙনের কারণও হুগলি নদী। এই নদীর কারণে ভাঙন তীব্র হচ্ছে নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার জেলিংহ্যামে। জেলিংহ্যাম বিট অফিস সূত্রে খবর, ২০০০ সালে ৭৯০ একর জায়গার ওপরে নদীর চরে ৭৬ হাজার ঝাউ গাছ লাগানো হয়েছিল। এখন তা বিরাট আকার ধারণ করেছে। এই বিট অফিসের সামনেই এই ঝাউ জঙ্গল সংলগ্ন নদী বাঁধ বিপন্ন হচ্ছে। বর্তমানে এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বড় বড় বাইন গাছ উপড়ে পড়েছে। জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে নদী বাঁধ। 

গাংরাচরে বাজকুল রেঞ্জের অধীনে বিট অফিস রয়েছে। বিট অফিস সূত্রে খবর, ভাঙনের ফলে হাজার হাজার ম্যানগ্রোভ অরণ্য জলে তলিয়ে যাচ্ছে। বাজকুল রেঞ্জের রেঞ্জার বাণীব্রত সামন্ত বলেন, ‘‘হুগলি নদীর তীরে আমরা সাড়ে চার কিলোমিটার জুড়ে ম্যানগ্রোভ লাগিয়েছিলাম। এর মধ্যে সাউথখালিতে লাগানো হয়েছিল সাড়ে তিন কিলোমিটার জুড়ে। আর গাংরাচরে লাগানো হয়েছিল দেড় কিলোমিটার জুড়ে। সাউথখালির ম্যানগ্রোভের কোনও পরিবর্তন হয়নি। তবে গাংরাচরে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় ২০ হাজার ম্যানগ্রোভ জলের তলায় চলে গিয়েছে। আমরা আশঙ্কায়।’’ তবে ভাঙন ঠেকাতে এখনও পর্যন্ত প্রশাসনিক স্তরে কোনও উদ্যোগ করা হয়নি। বন দফতর বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েছেন বলে দাবি করলেও ভাঙন রোধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বন দফতরের সূত্রে খবর, এই এলাকায় কাঁকড়া, বাইন জাতীয় গাছ লাগানো হয় ২০১২ সালে। সেই ম্যানগ্রোভ এতদিন ভূমিক্ষয় রোধ করে এলেও এখন বিপদ সঙ্কেত দেখা যাচ্ছে।

নন্দীগ্রামের কেন্দেমারি হলদির ভাঙনের কবলে। হলদিয়া ভবনের কাছেও হলদি নদীর ভাঙন বাড়ছে। এলাকার আরেক নদ রূপনারায়ণ। মহিষাদলের নাটশালে রূপনারায়ণ একে একে গ্রাস করে নিচ্ছে জনপদ, ধানের জমি ক্ষেত। 

দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদী তীরে বাসের আশঙ্কা ঘুচবে না বাসিন্দাদের।

তথ্য সহায়তা: আরিফ ইকবাল খান, গোপাল পাত্র