পৃথিবী কি রসাতলে যাইতেছে? সমকালের বহুলপরিচিত প্রশ্ন। তবে এই প্রশ্নে প্রায় চল্লিশ বৎসর পূর্বে বাজি ধরিয়াছিলেন আমেরিকার কতিপয় পণ্ডিত। এক দিকে ছিলেন তিন জীববিজ্ঞানী: পল এরলিখ, জন হোলড্রেন এবং জন হার্ট। অন্য দিকে অর্থনীতিবিদ জুলিয়াস সাইমন। বাজি এরলিখ রচিত এক নিবন্ধের সূত্রে। ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ পত্রিকার ১৪ ডিসেম্বর ১৯৬৭ সংখ্যায় মুদ্রিত নিবন্ধটির প্রতিপাদ্য: মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির চাপে আহার্যের সংস্থান করা ক্রমে বসুন্ধরার সাধ্যাতীত হইয়া পড়িতেছে। ১৯৭০ হইতে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পৃথিবীতে নামিয়া আসিবে দুর্ভিক্ষ, অনাহার ইত্যাদি। নিবন্ধটি প্রবল সাড়া ফেলিয়া দেয়, অচিরে পুস্তকাকারেও প্রকাশিত হয়। বইখানির ৬০ লক্ষ কপি বিক্রি এরলিখকে বিখ্যাত করিয়া তুলে। তাঁহার বক্তব্য খণ্ডন করিবার নিমিত্ত ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে সাইমন ‘সায়েন্স’ জার্নালে এক প্রবন্ধে বলেন যে, এরলিখ অযথা সর্বনাশের পূর্বাভাস দিতেছেন। সাইমনের দাবি: পৃথিবীতে নূতন চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ কমিবার পরিবর্তে বাড়িতেছে। খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সমেত প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব বাড়িতেছে না, কমিতেছে। অতঃপর সাইমন ছয় শত পৃষ্ঠার একটি বই লেখেন। তিনি বলেন, মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা অপরিসীম। যুগে যুগে নূতন সমস্যা যেখানে আসে, তেমনই উদ্ভাবনী ক্ষমতাবলে তাহার সমাধানও মানুষই বাহির করে। ভবিষ্যতের যে ভয়াল ছবি এরলিখ আঁকিতেছেন, তাহাও অচিরে মিথ্যা প্রমাণিত হইবে। 

বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন সাইমন এক বাজির প্রস্তাব দিলে এরলিখ, হোলড্রন এবং হার্ট তাহাতে সানন্দে প্রবৃত্ত হন। সাইমন বলেন, পৃথিবীতে সর্বনাশ নামিয়া আসিলে অর্থনীতির নিয়মানুযায়ী কাঁচামালের মূল্য বাড়ে। ক্রোমিয়াম, নিকেল, টিন টাংস্টেন এবং তামা— এই পাঁচটি ধাতু কাঁচা মাল হিসাবে গণ্য হইল। ১৯৮০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ওই পাঁচ ধাতুর প্রত্যেকটি ২০০ ডলারে (মোট ব্যয় ১০০০ ডলার) যে পরিমাণে মিলে, ১৯৯০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সমপরিমাণ ওই পাঁচ ধাতু ক্রয় করিতে হাজার ডলারের কম না বেশি, কত ব্যয় হইবে? যদি এক দশক পরে (মূল্যস্ফীতি হিসাবে রাখিয়া) হাজার ডলারের বেশি ব্যয় হয়, তাহা হইলে প্রমাণ হইবে কাঁচা মালের দাম বাড়িয়াছে, এবং পৃথিবীতে সত্যই সর্বনাশ নামিয়া আসিতেছে। সাইমন বাজিতে হারিয়াছেন। সে ক্ষেত্রে সাইমন, এরলিখ এবং তাঁহার দুই সহযোগীকে যে পরিমাণ অর্থ বেশি লাগিয়াছে, তাহা দিবেন। আর বিপরীত ঘটিলে তিন পণ্ডিত বাজিতে পরাজয় মানিয়া যত ডলার কম লাগিল তাহা সাইমনকে দিবেন। মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হইলে দেখা যায় সাইমন বাজিতে জিতিয়াছেন। ওই পাঁচ ধাতু ক্রয় করিতে ৪২৩.৯৩ ডলার ব্যয় হয়। বাজির শর্ত অনুযায়ী, এরলিখ এবং তাঁহার সহযোগীরা পরাজিত হইয়াছেন। তাঁহারা সাইমনের ঠিকানায় ৫৭৬ ডলার ৭ সেন্ট মূল্যের এক কেক প্রেরণ করেন। বাজিতে পরাজিত এরলিখ মন্তব্য করেন, সাইমনের দশা হইল সেই মানুষের ন্যায়, যে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর উপর হইতে ভূমিতে ঝাঁপ দিয়াছে, এবং অর্ধেক নীচে পড়িয়া বলিতেছে, দিব্য লাগিতেছে। এরলিখের কথাটির মর্মার্থ: সাইমন অদূরদর্শী, বড় স্বল্পকাল ব্যবধানের জন্য বাজি ধরিয়াছিলেন। অধিক কালের জন্য বাজিতে প্রবৃত্ত হইলে সাইমন পরাজয় বরণ করিতেন। সত্য বটে এরলিখের যুক্তি। ১৯৯০ নহে, ২০১০ সালে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি হইয়াছে। 

এবং পৃথিবীও সর্বনাশের দিকে ধাবিত। রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্টে প্রকাশ, মানবসভ্যতার, বিশেষত কৃষির তাড়নায় প্রায় দশ লক্ষ বৃক্ষ ও পশু প্রজাতি বিলীন হইবার দ্বারপ্রান্তে। ১৩২টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ রিপোর্টে সিলমোহর দিয়াছেন। এই গ্রহে জীববৈচিত্রের হালহকিকত বিষয়ে ২০০৫ সালের পর আর কখনও এত ব্যাপক সমীক্ষা হয় নাই। সংস্থার কর্তাব্যক্তি বলিয়াছেন, পৃথিবীর বিপদ বলিতে সাধারণ মানুষ বুঝে উষ্ণায়ন। কিন্তু জীববৈচিত্রের ক্ষতিও অনুরূপ বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে, যে বিপদ সম্পর্কে রাষ্ট্রনায়করা অবহিত না হইলে বিপদ ত্বরান্বিত হইবে। বাড়তি খাদ্যোৎপাদনের জন্য কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়াইতে হয়। অরণ্য মানুষের বাসভূমিতে পরিণত হয়। সামুদ্রিক লতাগুল্ম কিংবা মৎস্যকুল আরও বেশি পরিমাণে মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকিলে সমস্যা বাড়িবে বই কমিবে না। দীর্ঘমেয়াদি বিচারে এরলিখের বক্তব্য উড়াইয়া দিবার উপায় নাই।

যৎকিঞ্চিৎ

থাপ্পড় আর ‘গণতন্ত্রের থাপ্পড়’ আলাদা। ভাষাটা ভাল করে বুঝতে হবে। আবার ‘গণতান্ত্রিক থাপ্পড়’ও হতে পারে, যার মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি-অনুসারে কারও গালে সত্যি থাপ্পড়। ‘থাপ্পড়ের গণতন্ত্র’ও হতে পারে, অর্থাৎ গণতন্ত্রে যাঁরা ক্ষমতাধর, তাঁরা গণ-কে থাপ্পড় মেরে সিধে রাখেন, যাতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গণ শোধ না নিতে পারে। ‘গণ-র থাপ্পড়তন্ত্র’ও হতে পারে: ‘মাৎস্য ন্যায়’ প্লাস ‘মারব ন্যায়’। ‘তন্ত্রের গণ-থাপ্পড়’ও হতে পারে, কিন্তু তা ভাবতে গেলে ধর্মে আঘাত লাগবে!