E-Paper

সুরের অন্তর্ঘাত

গানের শান্ত শীতল শরীরকে উদ্দাম ছন্দের অভিঘাতে আমূল শিহরিত করা, এটা অচলায়তনকে ভাঙার হাতুড়ির মোক্ষম আঘাত নয়? ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-কে কি শুধু গান বলে ভাবতে পারব?

দেবজ্যোতি মিশ্র

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৭:৩৮

বিপ্লব কি সব সময় পতাকার নীচেই জন্মায়? কখনও কখনও তা জন্ম নিয়েছে এক অচেনা কর্ডে, এক অদ্ভুত তালভঙ্গে— এমন এক সুরে, যাকে প্রথমে মানুষ ভয় পেয়েছিল। কারণ, নতুন সুর মানুষকে অস্থির করে। যেমন নতুন সত্য করে। নজরুল ইসলাম বাংলা গানে তেমনই এক বিপ্লব এনেছিলেন— অন্তর্ঘাত ঘটিয়েছিলেন যাবৎকালের পরিচিত সাঙ্গীতিক ভুবনে। তাঁর আসার আগে সেখানে কীর্তন ছিল, ব্রহ্মসঙ্গীত ছিল, টপ্পা ছিল, ঠুমরির নরম আলো ছিল। নজরুল হঠাৎ মরুভূমির দরজা খুলে দিলেন। তাঁর গানের ভিতর দিয়ে উটের ঘণ্টা শোনা গেল। আরবের বালি উড়ে এল। পারস্যের বিষণ্ণতা এসে বসল বাংলার উঠোনে।

নজরুল অনুবাদ করেননি। উর্দু গজলের শরীর, আরবি-ফারসি অলঙ্কার, ইসলামি সুরভাষার মেলিসমা— এ সব তিনি বাংলা গানের ভিতরে এমন ভাবে ঢুকিয়ে দিলেন, যেন বাংলা নিজেই বহু দিন ধরে এই দরজা খোলার অপেক্ষায় ছিল। বাংলা গানের পরিসরে এ এক আশ্চর্য, অপূর্ব অভ্যুত্থান। এবং এই কাজটি রাজনৈতিক ছিল— একটিও স্লোগান ছাড়া, কোনও মিছিল ছাড়া এক আদ্যন্ত বিপ্লব। একটি ভাষার ভিতরে অন্য ভাষাকে ঢুকতে দেওয়া— এটা তো বিপ্লবই। একটি সংস্কৃতিকে ‘বিশুদ্ধ’ থাকতে না দেওয়া, এটাই তো প্রতিরোধ। গানের শান্ত শীতল শরীরকে উদ্দাম ছন্দের অভিঘাতে আমূল শিহরিত করা, এটা অচলায়তনকে ভাঙার হাতুড়ির মোক্ষম আঘাত নয়? ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-কে কি শুধু গান বলে ভাবতে পারব আজও? মনে হবে না, এক স্থবির সভ্যতার শরীরে তা প্রতিরোধের পদশব্দ? ‘চল চল চল’-এর মার্চিং সং-এর ছন্দে কি একটা জাতির ঘুম ভাঙানোর শব্দ শুনতে ভুল করবে এক জনও?

‘বিশুদ্ধ সংস্কৃতি’ বলে আসলে কিছু হয় না। যারা বিশুদ্ধতার কথা বলে, তারা সাধারণত বর্ডার বানায়। আর সঙ্গীত এই বর্ডারকে ঘৃণা করে।

এই জায়গাটাই পরে আরও অন্য ভাবে খুলে দিলেন সলিল চৌধুরী। তাঁর বিপ্লব ছিল আরও বিপজ্জনক। তিনি জানতেন ক্ষুধার সাউন্ডস্কেপ কেমন হয়। উদ্বাস্তু মানুষের হাঁটার ছন্দ কেমন হয়। কারখানার শ্রমিকের নিঃশ্বাস কোন স্কেল-এ ওঠানামা করে। সলিলের গান শুনলে মনে হয় পৃথিবীর নানা দেশ থেকে বিতাড়িত মানুষরা একটি অদৃশ্য রেলগাড়িতে উঠে বসেছে। সেখানে বাংলার লোকসুর আছে, রাশিয়ান মার্চ আছে, পূর্ব ইউরোপের মেলানকোলিয়া আছে, আইপিটিএ-র মিছিল আছে, আবার আমেরিকান ফোক-এর সরলতাও আছে।

সলিল বুঝতেন, সঙ্গীতেরও শ্রেণি রাজনীতি আছে। কে কোন হারমনি শুনবে, কে কোন যন্ত্র বাজাবে, কোন রিদম ‘উচ্চাঙ্গ’ আর কোনটা ‘লোকজ’— এ সবও ক্ষমতার ভাষা। তাই তিনি সেই উচ্চাবচতা ভেঙেছিলেন। তিনি ভারতীয় মূলধারার গানের ভিতরে এমন সব হারমনিক মুভমেন্ট আনলেন, যা তখন প্রায় অবিশ্বাস্য। কাউন্টারপয়েন্ট, ওয়েস্টার্ন অর্কেস্ট্রেশন, সিঙ্কোপেশন, শিফটিং মিটার— এ সব তিনি ব্যবহার করলেন শুধু তাঁর সাঙ্গীতিক দক্ষতা দেখানোর জন্য নয়, বরং ভারতীয় মেলোডি-কে এক বৃহত্তর নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য।

তিনি যেন বলছিলেন— বাংলা গানও পাসপোর্ট ছাড়া পৃথিবী ঘুরতে পারে। আর সেই কারণেই তাঁর তথাকথিত ‘মাজুরকা-লাইক’ রিদম বা পূর্ব ইউরোপীয় ডান্স মিটার এত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় শ্রোতা হয়তো শব্দটা জানত না, কিন্তু শরীর দিয়ে তা অনুভব করত। এই নতুন রিদমিক আর্কিটেকচার ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ভিতরে এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটাল। সলিল জানতেন, একটা অচেনা ছন্দ অনেক রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়েও বেশি অন্তর্ঘাত ঘটাতে পারে। কারণ, তা মানুষের অভ্যস্ত হাঁটার ছন্দকে পাল্টে দেয়, মানুষ হোঁচট খায়। আর, হোঁচট খেলেই মানুষ ভাবে।

সলিলের কম্পোজ়িশন-এ বেস স্বাধীনতা পেল। কয়ার আলাদা অস্তিত্ব পেল। স্ট্রিংস শুধু অনুভূতির রেখাগুলোকে স্পষ্ট করল না, তৈরি করল তার নিজস্ব আখ্যান। তাঁর গানে অর্কেস্ট্রেশন শুধু সৌন্দর্যায়নের জন্য নয়, সেটাও রাজনীতির বয়ান। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের গানের হাত ধরার প্রয়াস। কারণ, বিপ্লব বস্তুটি চরিত্রগত ভাবেই বৈশ্বিক। হয়তো কোনও একটা নির্দিষ্ট সময়ে তা কোনও একটা দেশে ঘটছে— কিন্তু, তার অনুরণন আন্তর্জাতিক।

‘হোয়্যার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন’ কিংবা ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’— এই গানগুলো যুদ্ধবিরোধী ঠিকই, কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, এগুলো স্মৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। পিট সিগার যখন ফুলের খোঁজ করেন, তখন তিনি আসলে মৃত তরুণদের খুঁজছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা অনামা শরীরগুলোকে ডাকছেন। আর বব ডিলান যখন বলেন, ‘দি অ্যানসার ইজ় ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’, তখন সেটি আসলে কোনও উত্তর নয়। সেটি সভ্যতার ব্যর্থতার অমোঘ প্রমাণপত্র।

তবু এই গানগুলো চিৎকার করে না। গভীরতম প্রতিবাদ অনেক সময় ফিসফিসিয়ে কথা বলে।

ঠিক যেমন লুই আর্মস্ট্রং-এর ট্রাম্পেট।

জ্যাজ় জন্মেছিল সুতীব্র অপমানের ভিতরে। দাস-জাহাজের অন্ধকারে। বর্ণবিদ্বেষের গর্ভে। কিন্তু আর্মস্ট্রং সেই যন্ত্রণাকে এমন এক রূপ দিলেন, যা পৃথিবীর প্রতিটি নিপীড়িত মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। তিনি শুধু ট্রাম্পেট বাজাননি— তিনি পাল্টে দিলেন ব্যথার ব্যাকরণ। কালো মানুষের অপ্রশিক্ষিত মোটা ঠোঁট পাল্টে দিল ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিকালের চেনা সুর, ট্রাম্পেট হয়ে উঠল ব্যথা ও প্রতিরোধের ভাষা। একই ভাবে হ্যারি বেলাফন্টে ক্যালিপসো-কে বিনোদন বাণিজ্যের পণ্য হতে দেননি। তিনি সেটিকে মানুষের রাজনৈতিক স্মৃতির ভিতরে ফিরিয়ে দিলেন। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা র‌্যাপ গাইলেন— তাঁদের যন্ত্রণার কথা, প্রতিবাদের কথা। সে গানের সুর পেলব নয়, তার ছন্দ ধাক্কা মারতে থাকে শ্রোতার কানে। কারণ, এই মানুষগুলোর জীবনে তো মসৃণ সুর নেই। তাঁদের গানেই বা থাকবে কেমন করে?

গানকে বাঁচতে হলে তাকে মানুষের শরীরে ফিরতে হয়।

এই জন্যই সঙ্গীতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লবগুলো প্রায়ই খুব ছোট ছোট জায়গায় শুরু হয়। কেউ প্রথম বার বাউলের সঙ্গে জ্যাজ় কর্ড বসালেন; কেউ মার্চিং রিদম-এর ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন ঘুমপাড়ানি ‘লালাবাই’। কেউ ওয়েস্টার্ন কাউন্টারপয়েন্ট-এর নীচে ভারতীয় মেলোডিকে শুইয়ে দিলেন। আর এই ছোট ছোট খাঁড়ি এক সময় তৈরি করল সভ্যতার ভিতরে এক নতুন নদীপথ।

নজরুলের আগে বাংলা গান এতটা পশ্চিম এশিয়ার দিকে তাকায়নি। সলিলের আগে বাংলা আধুনিক গান এতটা পৃথিবীর দিকে হাঁটেনি। তাঁরা দু’জনেই বাংলা গানের ভূগোলকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন অনেকখানি। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, তাঁরা বাংলাকে মানসিক ভাবে বড় করেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন, মানুষের পরিচয় একমাত্রিক নয়। এক জন বাঙালির ভিতরেও বহু দেশ লুকিয়ে থাকে। বহু ভাষা। বহু নির্বাসন।

পল রবসন কিংবা হ্যারি বেলাফন্টে-র গান কেবল বিপ্লবের পোস্টার ছিল না, তারা রক্তমাখা স্লোগানও ছিল না; তারা আরও বিপজ্জনক কিছু ছিল। তারা মানুষের অভ্যস্ত শোনার ভঙ্গিটাকে বদলে দিয়েছিল। রবসনের কণ্ঠে যখন নদী ভেসে যেত, তখন আমেরিকার তুলো চাষি কালো শ্রমিক আর ভারতের চা-বাগানের শ্রমিকের মধ্যে দূরত্ব কমে আসত। আর বেলাফন্টে— তিনি ক্যালিপসো-কে বিনোদনের বাজার থেকে টেনে এনে মানুষের ইতিহাসের মধ্যে বসালেন। তাঁর গান নাচত, আবার রক্তক্ষরণও করত। হেমাঙ্গ বিশ্বাস অসমের লোকজ সুরকে যে ভাবে তুলে আনলেন, তা নিছক সংগ্রহ ছিল না। তা ছিল পুনর্জন্ম। যেন বহু দিন অবহেলিত কোনও নদী হঠাৎ নিজের নাম ফিরে পেল। তিনি লোকসঙ্গীতকে মিউজ়িয়ম-এর কাচের বাক্সে ভরে রাখেননি। তাকে রাস্তায় নামিয়েছিলেন। মানুষের ঘামে, মিছিলে, ক্ষুধায়, অসমাপ্ত কথোপকথনে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

এই আত্মীকরণ— এই তুলে আনা, নতুন করে গড়ে নেওয়া— এ সব নিয়েই তো সঙ্গীতের সত্যিকারের শরীর তৈরি হয়। খাঁটি বলে কিছু নেই। শুধু যাত্রা আছে। এক সুর থেকে আর এক সুরে। এক দেশ থেকে আর এক দেশে। মানুষের শরীরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পরাজয় আর জেদের শব্দ বাজায়। আর ঠিক সেই জায়গাতেই সঙ্গীত রাজনীতিকে অতিক্রম করে। কারণ তখন গান নিছক ইস্তাহার নয়, তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, তা হয়ে ওঠে পরিযাণ, তা হয়ে ওঠে বর্ডার পার হওয়া মানুষের স্যুটকেস-এর ভিতরে ভাঁজ করে রাখা শেষ চিঠি।

গানের ফর্ম বদলানোও তাই বিপ্লব।

নজরুল-এর ‘মেঘলা নিশি ভোরে’ গানে আমরা দেখি পশ্চিম এশিয়ার সুর এসে বাংলা শব্দের সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব পাতাচ্ছে। সেই সুরে আছে মরুভূমির দীর্ঘশ্বাস, আবার বাংলার ভিজে মাটির গন্ধও। শচীন দেব বর্মণ যখন গানটি গাইলেন, তখন সেটি কেবল একটি বাংলা গান রইল না— তা হয়ে উঠল ভৌগোলিক সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া এক সুরযাত্রা। সলিল চৌধুরী নাকি সেই সুরে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরে প্রায় একই সুররেখার আবহ থেকে লতা মঙ্গেশকর-কে দিয়ে গাওয়ালেন “রোজ অকেলি আয়ে’। গুলজ়ারের কথায়।

এখানেই সঙ্গীতের আসল রহস্য। একটি সুর অন্য একটি সুরের ভিতরে গিয়ে বাসা বাঁধে। এক জন শিল্পী অন্য জনের কাছ থেকে শুধু ধার নেন না— তিনি তাকে নতুন শরীর দেন, নতুন সময় দেন, নতুন ভাষা দেন। তাই সঙ্গীতের ইতিহাস আসলে পারস্পরিক প্রভাবেরও ইতিহাস।

নদীর মতো। এক জল অন্য জলে মিশে যায়।

কেউ আলাদা করে বলতে পারে না— কোথায় মরুভূমি শেষ হল, কোথায় বাংলা শুরু হল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Revolution music

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy