ভারতের সুপ্রাচীন এবং সমৃদ্ধ এক ভাষা সাঁওতালি। নিজস্ব লিপি ছাড়া, এবং তার চেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক-আর্থনীতিক ক্ষমতায় এই ভাষাভাষীদের অংশীদারি ছাড়াও এই ভাষা নিজেকে বিস্ময়কর ভাবে টিকিয়ে রেখেছে। দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাঁওতাল মানুষদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে এই ভাষা নিয়ে আগ্রহ, চর্চা, এর লিপি তৈরি ইত্যাদি ব্যাপারে গতি এসেছে, এবং ২০০৩ সালে এটি সংবিধানের অষ্টম তফসিলে  অন্তর্ভুক্তও হয়েছে। সম্প্রতি এই ভাষার চর্চার জন্য অলচিকি লিপিতে পঠনপাঠনও শুরু হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের দাবিতে সাঁওতালদের কোনও সংগঠিত আন্দোলনের খবর পাওয়া যায় না। শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ মিশনারি বা স্থানীয় সরকারের নিজস্ব প্রয়াস, তাতে সাধারণ সাঁওতালদের উপস্থিতি তেমন ছিল না। কিছু সংগঠন সাহিত্য চর্চা এবং ভাষা স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সক্রিয় ছিল বটে, তবে সেটা লেখালিখিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

১৯৬৭ সালে আদিবাসী সোশিয়ো-এডুকেশনাল কালচারাল সোসাইটি (আসেকা) স্থাপনের পর সাঁওতালি ভাষার স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলন শুরু হয়। ওড়িশার বাসিন্দা পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মুু আবিষ্কৃত অলচিকি লিপিকে সাঁওতালি লেখার একমাত্র লিপি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা ও সাঁওতালিতে শিক্ষার দাবি নিয়ে, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গের সাঁওতালদের জনসমর্থনে, ‘আসেকা’ আন্দোলন শুরু করে। ১৯৭৯ সালে বামফ্রন্ট সরকার অলচিকি লিপিকে নীতিগত সমর্থন জানালে এই লিপি প্রচারের আলোয় আসে, ভিন্ন ভিন্ন লিপি দিয়ে সাঁওতালি চর্চার বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টাগুলির গুরুত্ব কমে।

সাঁওতালিতে শিক্ষা প্রদান ও অলচিকির মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পঠনপাঠনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার জন্য রাজ্য সরকার পবিত্র সরকারের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে। ছয় সদস্যের কমিটির দুই সাঁওতাল সদস্য ছিলেন প্রয়াত ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে ও সুবোধ হাঁসদা। গোকুল সরেন ও এই প্রবন্ধকার এক দশক ধরে বাংলা লিপিতে সাঁওতালিতে শিক্ষাদান করে চলেছিলেন, কমিশন সেই অভিজ্ঞতাও শোনে। 

২০০১ সালে কমিশনের রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়, সাঁওতাল ছাত্রছাত্রীরা সাঁওতালিতে পড়াশুনা করতে পারে, লিপি হিসাবে অলচিকির পাশাপাশি অন্যান্য লিপিও ব্যবহার করতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা সাঁওতালরা বিভিন্ন লিপিতে ভাষা চর্চা করে আসছেন, সেটা তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার, সুতরাং সেই ভাষা কেবল একটি লিপি দিয়েই লিখতে হবে— এমন সুপারিশ কোনও কমিটি বা সরকার দিতে পারে না বলে জানানো হল। কোন ভাষার জন্য কোন লিপি ব্যবহৃত হবে, সেই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষরাই নিতে পারেন। তবে অলচিকি লিপি যাতে সাঁওতালদের একমাত্র লিপি হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।

২০০৮ সালের মধ্যে অনেক বিদ্যালয়ে সাঁওতালিতে পঠনপাঠন শুরু হয়। বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলাতেই প্রায় ৪০টি বিদ্যালয়ে অলচিকি লিপিতে সাঁওতালি পড়ানো হয় এবং এ বছর দেড়শোর বেশি ছাত্রছাত্রী প্রথম বার অলচিকিতে মাধ্যমিকের উত্তর লিখেছে। ইতিপূর্বে একক বিষয় হিসাবে সাঁওতালি ভাষার পরীক্ষায় অনেকে বাংলা ও অলচিকি লিপি ব্যবহার করেছে, কিন্তু সমস্ত বিষয়ের উত্তরপত্র অলচিকি লিপিতে লেখা এ বারই প্রথম। এটি অলচিকি আন্দোলনকারীদের একটা বড় সাফল্য।

কিন্তু মাধ্যমিকের পর? উচ্চ বিদ্যালয়ে অলচিকির সর্ব ক্ষণের শিক্ষক নেই, যাঁরা পড়ান তাঁদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ নেই, সাঁওতালি পাঠ্যপুস্তকের অভাব। এত অভাবের মাঝে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক। আরও জটিল প্রশ্ন, বিভিন্ন ভাষার পাঠ্যপুস্তকগুলিকে সাঁওতালিতে তর্জমা করে সাঁওতালি পাঠ্যপুস্তক তৈরির ফলে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের গভীরতর উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে না কি? সাঁওতালির পাঠ্যপুস্তক সাঁওতালভাষীদেরই লিখতে হবে। তার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী মানুষ প্রয়োজন, যাঁরা তথ্যের ভাণ্ডার গড়তে এবং ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব রূপরেখা তৈরিতে সাহায্য করবেন।

একটা ভাষা ও লিপিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য স্বাজাত্যাভিমান জরুরি, কিন্তু সেটা যেন আমাদের সুস্থ যুক্তি-তর্কের পথকে রুদ্ধ করে না দেয়। পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের রাস্তা যেন অন্ধ গলিতে হারিয়ে না যায় তার দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। সাঁওতালি ভাষা টিকে আছে এ সমাজের গণতান্ত্রিক অনুশীলনের জোরে। লিপির সমস্যার সমাধানও গণতান্ত্রিক উপায়েই করতে হবে। আলোচনাটা আরও এই জন্য দরকার যে এ ব্যাপারে সরকারি কর্তারাই ঘোর অজ্ঞানতার অন্ধকারে। এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডের তলায় লেখা ছিল: In which answers in the non-language subjects can only be written are Bengali, English, Hindi, Nepali, Odiya, Urdu and Ol Chiki.” এর পর আর কী বলা?