রাজনীতির সবচেয়ে বড় রণাঙ্গন হয় উঠেছে এখন পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। একটানা বেড়ে চলেছে পেট্রোপণ্যের দাম। তা নিয়ে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ছে সরকার। এই মুহূর্তে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর উপায় নেই বলে সরকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারের পদক্ষেপের দিকে আঙুল তুলছে। আর বিরোধী নেতা-নেত্রীরা বলছেন, সরকার চাইলেই সুরাহা হওয়া সম্ভব। কয়েকটি রাজ্যও আংশিক সুরাহার পথ দেখিয়েও দিয়েছে ইতিমধ্যেই। আর দিনের শেষে কেন্দ্রকে চাপে ফেলে যেন এক কদম এগিয়ে গিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

পেট্রল-ডিজেলের দাম লিটারে এক টাকা কমিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ভ্যাট কমিয়ে এই বন্দোবস্ত করা হল বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন। শুধু যে পশ্চিমবঙ্গ দাম কমালো, তা কিন্তু নয়। রাজস্থান লিটারে আড়াই টাকা কমিয়েছে দাম। কর্নাটক কমিয়েছে লিটারে দু’টাকা। রাজস্থান এখন নির্বাচনোন্মুখ। জনমোহিমী হয়ে ওঠার বাধ্যবাধকতা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের। কর্নাটকের জেডিএস-কংগ্রেস জোট মন্ত্রিসভাকেও প্রমাণ করতে হচ্ছে যে, একক বৃহত্তম দল বিজেপিকে সরকার গড়তে না দিয়ে তাঁরা কর্নাটকবাসীর উপকারই করেছেন। কিন্তু বাংলার তৃণমূল সরকারের বাধ্যবাধকতা ততটা তীব্র ছিল না। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ত অন্যদের তুলনায় ঈষত্ সংযমী ভঙ্গিতে দরাজ হলেন। কিন্তু তাঁর এই পদক্ষেপটুকুই চাপ বাড়িয়ে দিল বিজেপি কথা কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে।

২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করার যাঁরা সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ দিচ্ছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। স্বাভাবিক ভাবেই পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গেও কেন্দ্রকে সবচেয়ে চড়া স্বরে আক্রমণকারীদের অন্যতম হলেন মমতাই। বিজেপি পাল্টা প্রশ্ন তুলছিল— রাজ্যগুলো পেট্রল-ডিজেলের উপরে যে কর বসিয়ে রেখেছে, তা কমাচ্ছে না কেন? রাজকোষের ক্ষতি স্বীকার করার দায় কি একা কেন্দ্রের? বিজেপি বিরোধী ঐক্য প্রচেষ্টার অন্যতম অগ্রগণ্য নেত্রী সেই প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন। এক টাকা করে দাম কমিয়ে বললেন, এ বার কেন্দ্রও দাম কমাক। এক বাণে চারটি লক্ষ্যবস্তু ভেদ করলেন মমতা।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

প্রথমত, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকে পেট্রোপণ্যের দাম কমাতে বলবে বিজেপি নেতৃত্ব— এমন জল্পনা সবে শুরু হয়েছে। সে জল্পনা সত্যে পরিণত হওয়ার আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজ্যে দাম কমিয়ে দিলেন। অর্থাত্ তিনিই পথে দেখিয়েছেন, এমনটা দাবি করার জায়গায় কিছুটা হলেও পৌঁছে গেলেন মমতা।

দ্বিতীয়ত, সদিচ্ছা থাকলে যে দাম কমানোই যায় এবং কেন্দ্রের সদিচ্ছা নেই বলেই যে দাম কমছে না, এমন একটা একটা ধারণা তৈরি করতে সফল হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

তৃতীয়ত, বিজেপিকে তথা কেন্দ্রকে মমতা চাপে ফেলে দিলেন। কারণ এখনও কেন্দ্র পেট্রোপণ্যের উপর থেকে উত্পাদন শুল্ক না কমালে আক্রমণ তীব্রতর হবে।

চতুর্থত, মমতা নিজে চাপমুক্ত হয়ে গেলেন। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো যদি আগে দাম কমিয়ে দিত এবং মমতা তার পরেই সে পদক্ষেপ করতেন, তা হলে বলা হত, বাধ্য হয়ে এই পদক্ষেপ করতে হল মমতাকে। সেই সম্ভাবনার বিনাশ ঘটিয়ে দিলেন তৃণমূল নেত্রী।

আরও পড়ুন: তেলে ১ টাকা ছাড় রাজ্যের, বিরোধীরা বলল ‘মুখরক্ষা’র চেষ্টা মমতার

আপাতত বলটা বিজেপির কোর্টে। কংগ্রেস তীব্র আক্রমণে নেমেছে, বামেরাও তাই। দেশজোড়া হরতাল হয়ে গিয়েছে। তৃণমূলও ইতিমধ্যেই বিজেপিকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে যথেষ্টই। জবাবটা এ বার বিজেপিকেই দিতে হবে। কেন এ ভাবে বাড়ছে পেট্রোপণ্যের দাম, কেনই বা ডলারের নিরিখে টাকার দাম পড়ছে, কেন এই দুর্যোগ রোধ করা যাচ্ছে না— তার জবাব দেওয়ার দায় শাসক দলেরই।

জবাব দেওয়ার বিজেপি চেষ্টা করছে না, তা নয়। কখনও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে, এই জমানায় পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গড় বাত্সরিক হার আগের জমানার চেয়ে কম। কখনও সরাসরি আঙুল তোলা হচ্ছে পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের দিকে। পেট্রোপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ২০০৮ সালে মনমোহন সিংহের সরকার বাজার থেকে ২.১৪ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল এবং মনমোহন জানিয়েছিলেন যে, ওই পদক্ষেপে সাময়িক সুরাহা হলেও পরবর্তীকালে নেতিবাচক ফল ভুগতে হবেই। বিজেপি এখন সেই প্রসঙ্গ টেনে আনছে। মনমোহনের নেওয়া ঋণের বোঝা মোদী সরকারের ঘাড়ে চেপেছে বলে জানিয়ে বিজেপি সুর চড়ানোর চেষ্টা করছে। যা কিছু বিজেপি বা কেন্দ্র বলছে, সবই যে ভুল তা নয়। কিন্তু এক দিকে মূল্যবৃদ্ধির আঁচে পুড়ছেন নাগরিক, অন্য দিকে সমবেত কলরব শুরু করে দিয়েছে বিরোধী দলগুলি। অতএব সরকারি বয়ানের ধার ক্রমশ কমছে।

আরও পড়ুন: মনমোহন না মোদী! দায় কার? পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ধুন্ধুমার লড়াই

পথ খুঁজে বার করতে শাসককেই। জনসাধারণকে রেহাই দেওয়াই রেহাই পাওয়ার একমাত্র পথ। সে পথ খুঁজে বার দায় শাসকেরই। নিতিন গডকড়ী আশার কথা শোনানোর চেষ্টা করেছেন। জৈব জ্বালানীর ব্যবহার যদি বাড়ানো যায়, পেট্রো জ্বালানীর চাহিদা তাহলে কমবে, দামও স্বাভাবিক ভাবে নামবে— এমনই এক উপায় বাতলেছেন গডকড়ী। কিন্তু পর্যাপ্ত জৈব জ্বালানীর তৈরির সংস্থান আমাদের দেশে রয়েছে কি না, থাকলেও কত বছর পরে সে পরিকাঠামোয় আমরা পৌঁছতে পারব, সে কথা খুব নির্দিষ্ট ভাবে কারও জানা নেই সম্ভবত। গডকড়ীও আলোকপাত করতে চাননি সে সবের উপরে। অর্থাত্ বিরোধী হামলার জুত্সই জবাব এখনও দিতে পারেনি সরকার। জবাব দিতে যত দেরি হবে, ক্ষতস্থান কিন্তু ততই গভীর হবে— শাসক সে কথা বুঝছেন আশা করা যায়।