ই-ব্যাঙ্কিং, মোবাইল ব্যাঙ্কিং এবং এমন আরও নানা প্রযুক্তি গ্রহণ করার সময় এসেছে সকলের, বিশেষ করে আমার তরুণ বন্ধুদের।’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, যিনি এখন ভারতে ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ে মুখ্য প্রচারক। লক্ষণীয়, তিনি দেশবাসীর প্রতি এই সম্ভাষণ করেছেন ‘টুইট’-এ। যাকে বলা চলে ‘ই-আহ্বান’।
দেশে নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে উঠেপড়ে লেগেছেন মোদী। তার মাসুল গুনতে হচ্ছে অগণিত মানুষকে। কিন্তু সে সব এখন বহুচর্চিত। তাই সেই কাসুন্দি না ঘেঁটে বরং অন্য একটা প্রশ্ন করা যাক, যে প্রশ্নটা সচরাচর শোনা যাচ্ছে না। সেটা হল, নগদ টাকার ব্যবহার কমালে কি সত্যিই দেশের উপকার হবে? নগদে লেনদেন চালানোর কি অনেক খরচ?
এটা মানতেই হবে যে, নগদ ব্যবহারের খরচ আছে, যে খরচ আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই না, খেয়ালও করি না। সত্তরটি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করে এক গবেষণা চালিয়ে আমরা দেখেছি, এই খরচের কয়েকটি ভাগ আছে। যেমন, উপভোক্তার খরচ (এটিএম ব্যবহারের মাসুল, নগদ টাকা নেওয়ার জন্য যে সময় দিতে হয় তার মূল্য ইত্যাদি), ব্যবসায়ীর খরচ (নগদ টাকা সুরক্ষিত রাখার খরচ), ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের খরচ (নগদ টাকা রক্ষণ এবং পরিবহণ, এটিএম দেখাশোনা করা) এবং সরকারের খরচ (নগদ লেনদেনের ফলে রাজস্ব ফাঁকি, নোট ছাপানোর খরচ)। 
আমরা দেখেছি, দেশে দেশে এই খরচগুলোর বিস্তর তারতম্য হয়। ভারতে তার মাত্রা খুব বেশি, এমনকী অনেক অনুন্নত দেশের চেয়েও। যেমন, কেনিয়া বা নাইজেরিয়ার তুলনায় এ দেশের মানুষ এটিএম ব্যবহারের কম সুযোগ পান। নোট বাতিলের অনেক আগেই আমরা হিসেব করেছিলাম, দিল্লির মানুষ নগদ জোগাড় করতে বছরে ৬০ লক্ষ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন, হায়দরাবাদে ১৭ লক্ষ ঘণ্টা। হায়দরাবাদে মাথাপিছু গড় সময় ব্যয় হয়েছে দিল্লির দ্বিগুণ।
এটিএম চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে বিস্তর খরচ করতে হয়। অবশ্য সাহারার দক্ষিণবর্তী আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলির তুলনায় ভারতে এই খরচ কম।
নগদের ব্যবহার কালো টাকার প্রচলনে সাহায্য করে, এর ফলে উন্নতিশীল দেশগুলিতে সরকারের রাজস্বের বড় ক্ষতি হয়। এ ক্ষেত্রেও ভারতের হাল তৃতীয় বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভাল, কিন্তু প্রচুর উন্নতির অবকাশ আছে।
অর্থাৎ সব মিলিয়ে নগদ ব্যবহারের বিস্তর খরচ আছে, যে খরচ কমাতে পারলে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। কিন্তু তাই বলে মানুষকে রাতারাতি নগদ ছেড়ে দিতে বললে সেটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার শামিল হয়। ঘোড়া মানে এ ক্ষেত্রে প্রধানত দুটো জিনিস। এক, ডিজিটাল অর্থনীতির পরিকাঠামো। দুই, গোটা ব্যবস্থায় একটা ন্যূনতম বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়টা আবার প্রথমটার উপর অনেকখানি নির্ভর করে। আর্থিক লেনদেন ব্যাপারটার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। দু’পক্ষেরই লেনদেনে বিশ্বাস থাকা দরকার। যদি কোনও একটি পক্ষও ডিজিটাল লেনদেনের জন্য প্রস্তুত না থাকে, তা হলে নগদ-হীন অর্থনীতির পরিবেশ তৈরি হবে না, কাজকারবার নগদেই চলতে থাকবে।
এ কথা তো অনস্বীকার্য যে, নগদ টাকায় সকলের স্বাভাবিক আস্থা আছে বলেই তা লেনদেন চালানোর পক্ষে খুব উপযোগী। ভারতে নগদের ব্যবহার তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েও বেশি। আমরা সেটা আমাদের সমীক্ষাতেও দেখেছি। যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকায় জিডিপি-র অনুপাতে নোট ও মুদ্রার পরিমাণ ৩.৭২ শতাংশ, ব্রাজিলে ৩.৯৩, মেক্সিকোয় ৫.৩২, আর ভারতে এই অনুপাত হল ১২.০৪ শতাংশ।
কিছু কিছু সংস্থার হিসেবে, ২০২০ সালের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের অঙ্ক দাঁড়াবে এখনকার দশগুণ। এটা অসম্ভব নয়। নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়তো এই পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে কোনও সংশয় নেই। নগদ অর্থনীতির ঐতিহ্য ও অভ্যেস এই পরিবর্তনের পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইবে। নগদের আকর্ষণ কী করে কমানো যায়, সে বিষয়ে আমাদের অনেক ভাবনাচিন্তা করা দরকার, পরিকল্পনাও।
মুশকিল হল, ভারতে ডিজিটাল পরিকাঠামোর যা হাল, তাতে নগদ অর্থনীতিকে সত্যিকারের বিদায় জানানোর মতো পরিবেশ নেই। মোবাইল ফোনের গ্রাহক একশো কোটি হলেও তার মাত্র ৩০ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট সংযোগ আছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নাগরিকের। মোবাইল সংযোগের গুণমান অনেক ক্ষেত্রেই বেশ খারাপ। তারতম্যের মাত্রাও খুব বেশি। যেমন, মোবাইল ইন্টারনেট যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের ৭০ শতাংশ শহরের মানুষ। আবার, একটি হিসেব অনুযায়ী, মেয়েদের মাত্র ১৭ শতাংশ মোবাইল ব্যবহার করেন। এখন, বাড়ির দৈনন্দিন কেনাকাটার বেশির ভাগটাই করেন মেয়েরা। এ দেশে ডিজিটাল অর্থনীতির বুনিয়াদটাই নড়বড়ে।
নগদের বিরুদ্ধে লড়াই মোদী প্রথম করছেন না। দু’বছর আগে সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বেশি দামের নোট বাতিল করা হয়। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক (ইসিবি) সম্প্রতি ৫০০ ইউরো মূল্যের ব্যাঙ্ক নোট প্রত্যাহার করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ২০২০ সালের মধ্যে কাগজের নোট প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এই দেশগুলির প্রত্যেকটিতে ডিজিটাল অর্থনীতির শক্তপোক্ত পরিকাঠামো আগে তৈরি করা হয়েছে। ঘটনা হল, এক লাফে শূন্য থেকে একে যাওয়া যায় না। এ ধরনের পরিবর্তন করতে গেলে আগে পুরো অভিযানটি সম্পর্কে ভাল করে পরিকল্পনা করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করতে হয়। তার পরে হিসেব করে এগোতে হয়, বিশেষ করে লক্ষ রাখতে হয়, সাধারণ মানুষ যাতে বিপাকে না পড়েন। জনসাধারণকে চমকে দেওয়া কোনও দায়িত্বশীল সরকারের কাজ হতে পারে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টাফ্টস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুল-এ অর্থনীতির শিক্ষক