নাক, নরুন এবং যাত্রাভঙ্গ— তিন জনে মিলে জমিয়ে দিল জাতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ। রাজনাসিকা সেই কবেই শহিদ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রাজা কিছুতেই সে কথা মানছিলেন না দু’বছর ধরে। শুধু বলছিলেন, কালো টাকার যাত্রাভঙ্গ হয়ে গিয়েছে আর সেই যাত্রাভঙ্গের সুফলেই কাটা পড়া নাসিকা নবজন্ম নিতে চলেছে। কিন্তু দু’বছরেও যখন সে নবজন্মের আভাস মাত্র মিলল না, তখন রাজা বলতে শুরু করলেন, নাকের বদলে নরুনটা যে পাওয়া গেল, সে-ই বা কম কিসে?

রাজার সে ম্রিয়মান সুর দেখে প্রতিস্পর্ধীরা স্বাভাবিক ভাবেই উল্লসিত হলেন। তাঁরা সমস্বরে বলতে লাগলেন, সবে তো নাক গিয়েছে, এ বার কানও যাবে।

নোটবন্দির দু’বছর পূর্তি হল। এই দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকার পক্ষের আচরণ কী রকম আর বিরোধীর কণ্ঠস্বরে অলঙ্কারের বহরটা কেমন, সে দিকে আলগা একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দেশের শাসকরা এখন অস্বস্তিতে। নোটবন্দির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির তারিখে দেশ জুড়ে সরব হল বিরোধী দলগুলো। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাতে যে পদক্ষেপের কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন, ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বরে এসেও বিরোধী দলগুলো সে পদক্ষেপের তুমুল সমালোচনায় সরব হল। আর সরকার শুধুমাত্র বিরোধীদের আক্রমণের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে গেল, শুধুমাত্র সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করে গেল।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের হোক বা মোদী সরকারের— যে কোনও বর্ষপূর্তিই দেশের বর্তমান শাসক দলের কাছে অত্যন্ত মহার্ঘ অবকাশ। ভারতের বর্তমান শাসকরা যে সব মাইল ফলককে নিজেদের পক্ষে ইতিবাচক বলে মনে করেন, সে সব মাইল ফলকের বর্ষপূর্তিগুলো তাঁরা মহা সমারোহে, মহা উল্লাসে, মহা আড়ম্বরে পালন করতেই পছন্দ করেন। কখনও কখনও আবার গত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া কোনও কোনও ঘটনার বর্ষপূর্তির গায়ে নিজেদের স্টিকার সেঁটে রাজনৈতিক লাভ ওঠানোর প্রয়াসের অভিযোগও ওঠে এই শাসকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু নোটবন্দির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে কোনও সমারোহের আয়োজন হল না, দু’বছর আগের পদক্ষেপটাকে আর গরিমার আলোকে দেখানোর চেষ্টা হল না।

আরও পড়ুন: নোটবন্দির দু’বছর: প্রধানমন্ত্রীকে ‘ঠগস অব হিন্দোস্তান’ বলে খোঁচা 

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসটা কি টাল খেয়ে গেল? নোটবন্দিকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল সরকার এবং বিজেপির তরফে। নোটবন্দিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দেশজোড়া আতান্তরের কথা জানা সত্ত্বেও, টাকা বদলানোর লাইনে দাঁড়িয়ে একের পর এক নাগরিকের মৃত্যুর কথা জানা সত্ত্বেও, কালো টাকার ব্যাঙ্ক-ফিরতির পথ বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও, সাধারণ্যে অসন্তোষের আঁচটা টের পাওয়া সত্ত্বেও নোটবন্দির প্রথম বর্ষপূর্তিটা ধুমধামে পালন করা হয়েছিল। কিন্তু এ বার আর সে পথে হাঁটার সাহস পেলেন না শাসক।

বিরোধী দলগুলোর অবস্থানে কিন্তু কোনও পরিবর্তন নেই। নোটবন্দির খবর পাওয়া মাত্র তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন, নোটবন্দির প্রথম বর্ষপূর্তিতে সরব হয়েছিলেন, দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আরও তীক্ষ্ণ ঠেকছে তাঁদের আক্রমণ যেন।

লক্ষণটা খুব স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। নোটবন্দি ইস্যুতে মাটির কাছাকাছি কারা রয়েছেন, হাওয়ার অভিমুখে কারা ছুটছেন, বেশ পরিষ্কার ভাবে তা বোঝা যাচ্ছে।

নোটবন্দির ফলে দেশের অর্থনীতি সাংঘাতিক ভাবে ধাক্কা খেয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে ফের এ কথা বলেছেন দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিংহ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের যে বিরল টানাপড়েন আজ দেখা যাচ্ছে, তার নেপথ্যেও নোটবন্দি-জনিত সঙ্কট, মত মনমোহনের।

বিরোধীদের এই সব অভিযোগের জুৎসই জবাব এখনও সরকার দিতে পারেনি। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি শুধু বলেছেন, নোটবন্দির ফলে দেশে ডিজিটাল লেনদেন অনেক বেড়েছে, কর আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে।

জেটলির এই প্রতিরোধটা কিন্তু বড়ই দুর্বল ঠেকল। নোটবন্দি হল কালো টাকার বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক— বলেছিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার। এই পদক্ষেপ ভারতীয় অর্থনীতিকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দেবে— দাবি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। নোটবন্দির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর উধাও। কালো টাকার সর্বনাশ প্রসঙ্গে কারও মুখে কোনও কথা নেই।

ডিজিটাল লেনদেন আর কর আদায় বাড়ানোই কি নোটবন্দির মূল লক্ষ্য ছিল? নোটবন্দি ঘোষণার দিনে বা নোটবন্দির প্রথম বর্ষপূর্তিতে তো এমনটা বলেননি! এ তো নাকের বদলে নরুন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার ভঙ্গি!

নিজের নাক কেটে কালো টাকার মালিকদের যাত্রাভঙ্গটা যদি করতে পারতেন নরেন্দ্র মোদীরা, তা হলেও গর্ব করার একটা অবকাশ হয়তো থাকত। বেশ কয়েক মাস ধরে কোটি কোটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যে সঙ্কট চলেছিল নোটবন্দির পরে,সে সঙ্কটের কথা মাথায় রেখেও সরকারকে কৃতিত্ব দেওয়া যেত। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। অতএব নোটবন্দির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে পৌঁছে কী রইল শাসকের হাতে? রইল নাক কাটা পড়ার যন্ত্রণা, রইল কালো টাকার যাত্রাভঙ্গ করতে না পারার আক্ষেপ, রইল নরুন দেখিয়ে মুখ বাঁচানোর প্রয়াস। সাধারণ নির্বাচনের দিকে ক্রমশ এগোতে থাকা দেশে এমন এক পরিস্থিতি শাসকের জন্য সুখানুভূতি বয়ে আনে না।