গরিবের আর যে অভাবই থাক, তার জন্য তৈরি করা সরকারি প্রকল্পের কোনও অভাব নেই। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিশু উন্নয়ন থেকে পেনশন, সব কিছুরই ‘যোজনা’ আছে। কিন্তু, সেই যোজনাগুলোর কুশলী হয়ে ওঠার পথে বাধাও বিস্তর। প্রথমত, যে সুবিধা যার পাওয়ার নয়, সে দিব্য সেই সুবিধা পায়, আর সুবিধাগুলো সরকার যাদের জন্য দেয়, তারা বাদ পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, গুচ্ছের চুরি হয়, জিনিসপত্র নষ্ট হয়। বলতেই পারেন, ঠিক মতো নজরদারি থাকলে এই  দুই গোত্রের সমস্যা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু, প্রকল্পগুলো চালানোর জন্য, নজরদারির জন্য যত লোকবল প্রয়োজন, যত টাকা প্রয়োজন, তার সংস্থান করাও একটা বাধা। তার পর, এমন প্রকল্পও আছে, যেখানে ভর্তুকির সুবিধা পায় মূলত অপেক্ষাকৃত সচ্ছলরা— তারা ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য বা পরিষেবা অনেক বেশি ব্যবহার করে বলে। যেমন, বিদ্যুতে ভর্তুকি।

দারিদ্র দূরীকরণের প্রকল্পের সংস্কার নিয়ে স্বভাবতই অনেক আলোচনা আছে, তর্ক আছে। যেমন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষাগুলিতে প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তরের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে ভর্তুকির টাকা সরাসরি গরিব মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আরও এক ধাপ এগিয়েও ভাবছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা সর্বজনীন ন্যূনতম আয়-ই ভবিষ্যৎ। এই ব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরকার কোনও শর্ত ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দেবে। ভারতে এখন যে নগদ হস্তান্তরের কথা হচ্ছে, তা শুধুমাত্র গরিব মানুষের জন্য। সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, গরিব মানুষকে বাছা হবে কী ভাবে? বিপিএল কার্ড ব্যবহার করে? তাতে ঠিক লোকের বাদ পড়ে যাওয়া আর ভুল লোকের ঢুকে পড়়া, দুই ধরনের সমস্যাই বিপুল। কর্নাটকের একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যাঁদের বিপিএল কার্ড থাকার কথা নয়, তেমন প্রতি তিন জনে এক জনের কাছে বিপিএল কার্ড রয়েছে, আর যাঁরা এই কার্ড পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের প্রতি ছ’জনের মধ্যে এক জনের কার্ড নেই। সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্প চালু হলে এই সমস্যা থাকবে না।

তা হলে, সমস্যা কোথায়?

প্রথম সমস্যা হল, যে কোনও সর্বজনীন প্রকল্পেই খরচ অনেক বেশি। ধরুন স্থির করা হল, আয়ের যে অঙ্কটি দেশে দারিদ্রসীমা হিসেবে চিহ্নিত, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সেই টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তা হলে আর কেউ দারিদ্রসীমার নীচে থাকবেন না। এই প্রকল্পে কত খরচ? হিসেব বলছে, জাতীয় আয়ের ১১ শতাংশ। অবশ্য, মাথাপিছু টাকার অঙ্ক কমলে প্রকল্পের ব্যয়ও কমবে।

খরচের অঙ্কটা কত বড়? তুলনা করলে বোধ হয় বুঝতে সুবিধা হবে। ৪৭ লক্ষ সরকারি কর্মী আর ৫২ লক্ষ পেনশনভোগী (সব মিলিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ০.৮ শতাংশ) মানুষের জন্য সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করতে খরচ হবে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের এক শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে মন্দ ঋণের পরিমাণ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পাঁচ শতাংশ। সরকারি হিসেবেই যাঁরা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, সেই দরিদ্র মানুষদের জন্য টাকা খরচের সময় এই অঙ্কগুলো মাথায় রাখলে গা একটু কম কড়কড় করবে।

দ্বিতীয়ত, সর্বজনীন ন্যূনতম আয়ের মতো প্রকল্পকে যদি রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ অথবা মূল্যস্ফীতির হার না বাড়িয়ে চালু করতে হয়, তবে এই প্রকল্পের টাকার সংস্থান করতে হবে করের পরিমাণ বাড়িয়ে, অথবা অন্যান্য খাতে খরচ কমিয়ে। খরচ কমানোর উপায় অবশ্যই আছে। ভর্তুকি খাতে সরকারের খরচ হয় জাতীয় আয়ের ৪.২ শতাংশ। করদাতাদের বিভিন্ন খাতে ছাড় দিতে গিয়ে সরকার জাতীয় আয়ের আরও ৬.৭ শতাংশ খোয়ায়। এই দুই খাত যোগ করলেই তা জাতীয় আয়ের প্রায় ১১ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্য একটি হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা দরিদ্র নন, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের ভর্তুকি  মিলিয়ে তাঁদের জন্য ব্যয় হয় জাতীয় আয়ের নয় শতাংশ। কাজেই, সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্প চালু করার টাকা যে ভারতে আছে, সে বিষয়ে কোনও সংশয়ই নেই। প্রশ্ন হল, মধ্যবিত্তের ভর্তুকি ছাঁটাই করার সাহস কি রাজনৈতিক নেতাদের হবে? আশাবাদী হওয়ার বিশেষ কারণ দেখছি না।

করের হার বৃদ্ধি করার কথা ভাবা যেতে পারে কি? দেশের মোট জনসংখ্যার ২.৩ শতাংশ প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, কিন্তু আয়কর দেন মাত্র এক শতাংশ মানুষ। অতএব, আয়করের মাধ্যমে ধনীদের থেকে দরিদ্রের দিকে সম্পদ বণ্টনের সম্ভাবনা ভারতে সীমিত। কৃষি ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের উপার্জন আয়করের আওতায় না আসার ফলে অবস্থা আরও সংকটজনক থেকে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরের সঙ্গে তুলনায় ভারতের নিম্ন আয়ের কথা মাথায় রেখেও বলতে হচ্ছে, এ দেশের জনসংখ্যায় করদাতাদের অনুপাত মারাত্মক রকম কম।

কিন্তু এর কোনওটাই অলঙ্ঘ্য বাধা নয়। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, করদাতাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি সংস্কার যে কোনও উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেই অতি জরুরি কাজ। পরিকাঠামো তৈরি করতে হলেও টাকা প্রয়োজন, আবার মানব সম্পদ নির্মাণ বা চরম দারিদ্র দূরীকরণের জন্যও টাকা চাই। সেই টাকার সংস্থান এই সংস্কারগুলির মাধ্যমেই হয়। রাজস্ব ক্ষেত্রে সংস্কার অতি প্রয়োজনীয়।

জনধন-আধার-মোবাইলের (জ্যাম) মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তরের কাজ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিবিধ সমস্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গরিব মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সমস্যাগুলো অস্বীকার করার নয়। কিন্তু, যে কোনও পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদে সমস্যা হয়। সেই সমস্যাগুলো অনতিক্রম্য নয়। কেউ বলতে পারেন, হাতে নগদ টাকা পেলে গরিব তা বাজে খরচ করে ফেলবে। ক্ষেত্রসমীক্ষা ও গবেষণা কিন্তু সে কথা বলছে না।

সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্পই হোক বা অন্য কোনও উন্নয়ন কর্মসূচি, তা নিয়ে আলোচনা করার সময় কতকগুলো কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন। এক, প্রত্যেকটি নীতি, কর্মসূচিরই কিছু ভাল দিক আছে, কিছু মন্দ দিকও আছে— কাজেই, শুধুমাত্র একটি সমস্যাকে তুলে ধরা অথবা কোনও একটি বিশেষ ভাল দিককে নিয়ে মাতামাতি করাই শেষ কথা নয়। কোন প্রকল্পে কতটা ভাল আর কতটা মন্দ, তার তুল্যমূল্য বিচার করতে হবে। দুই, কোনও প্রকল্পই সবার জন্য সেরা নয়। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য যে আলাদা আলাদা প্রকল্প কার্যকর হতে পারে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। আপনার হাতের নাগালে যদি বাজার থাকে, একমাত্র তবেই নগদ হস্তান্তরে আপনার লাভ। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য পণ্যে ভর্তুকিই ভাল। বস্তুত, বিহারে একটি সমীক্ষা করার সময় দেখেছিলাম, যাঁরা শহরাঞ্চলে থাকেন, তাঁরা নগদ হস্তান্তর চান, আর গ্রামাঞ্চলের মানুষ পণ্য চান।

তৃতীয় কথা হল, সব অসুখ সারিয়ে দেওয়ার মতো কোনও জাদু-দাওয়াই কারও কাছেই নেই। এক এক সমস্যার এক এক সমাধান। মেনে নিতেই হবে, সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্পই হোক বা জ্যাম-এর মাধ্যমে নগদ হস্তান্তর, একশো দিনের কাজ— এই প্রকল্পগুলো গরিব মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু দারিদ্রের সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করবে না। তার জন্য দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পেশাদারি দক্ষতা, এই সব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, যাতে দরিদ্র শ্রেণির মানুষরা উন্নয়নের সোপান বেয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন কর্মসংস্থান, যা সেই সোপান সৃষ্টি করবে। তার জন্য চাই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর অনুকূল পরিবেশ, যার মধ্যে পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উন্নতি আবশ্যক। টনিক খেলে খানিক বাড়তি শক্তি পাওয়া যায়, যার মূল্য আছে। কিন্তু তাতে রোগ সারে না। তার জন্যে চিকিৎসা চাই।

সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্পের মতো কর্মসূচিকে নিয়ে অনেকেই ভয় পান যে এই প্রকল্প এলে দারিদ্র দূরীকরণের অন্য প্রকল্পগুলো সব বন্ধ হয়ে যাবে। তা যদি না হয়, তবে এই প্রকল্পের পথে কয়েক কদম হেঁটে দেখলে ক্ষতি কী?

লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস-এ অর্থনীতির শিক্ষক