আবার বোধহয় ‘মানুষের জয়’ সূচিত হচ্ছে। ধাপে ধাপে ‘জিততে জিততে’ বোধহয় ‘গণতন্ত্র’ এ বার তার চূড়ান্ত জয়ের দিকে এগোচ্ছে। এমন ‘মহতী’ লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য কিছু ‘বলিদান’ তো দিতেই হবে। পুরুলিয়া, মালদহ বা উত্তর দিনাজপুর সেই সব ‘বলিদান’ই দিচ্ছে সম্ভবত।

গ্রাম পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠন শুরু হতেই হিংস্র আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। বোমা-গুলি-রক্তপাত-প্রাণহানির খবরে তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনীতি আবার। ঘটনাপ্রবাহটা একবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। প্রথমে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর্বে অশান্তি। ব্যাপক বোমা-গুলির মাঝে দুষ্কৃতীদের উত্সবের চিত্র। বিরোধী দলগুলির পক্ষে বিপুল সংখ্যক আসনে মনোনয়ন দাখিল করাই অসম্ভব হয়ে ওঠা। তার পরে ফের এক দফা অশান্তি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর্বে। জোর করে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানোর অভিযোগ। তৃতীয় ধাপে ভোটগ্রহণকে অবাধ ভোট লুঠের উত্সবে পরিণত করার অভিযোগ। চতুর্থ ধাপে ভোটগণনা পর্বকে প্রহসনে পরিণত করার দুর্নাম। আর সব শেষে বিরোধী দলগুলির টিকিটে নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্যদের বোর্ড গঠনের দিনে পঞ্চায়েতের দফতরেই পৌঁছতে না দেওয়ার অভিযোগ।

সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ— কোনও কিছুতেই পিছপা না হওয়ার রাজনীতির সাক্ষী হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। সব বোর্ড দখলে নেওয়ার লক্ষ্যে ঝাঁপাচ্ছে রাজ্যের শাসকদল। এত কাণ্ডের মধ্যে দিয়ে ভোট হওয়া সত্ত্বেও যে সব এলাকায় জেতা গেল না, সেই সব অঞ্চলকেও হাতের বাইরে যেতে না দেওয়ার সঙ্কল্প যেন নিয়েছে তৃণমূল। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ অন্তত তেমনই।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

কিন্তু অভিযোগ তুললেই হয় না। অভিযোগ প্রমাণ করার সক্ষমতাও থাকা জরুরি। পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে এ রাজ্যের ৩৪ শতাংশ আসনে ভোটই হল না, তাকে অস্বাভাবিক হিসেবে প্রমাণ করা গেল না সুপ্রিম কোর্টে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল সংখ্যক আসনে জয় আসলে সন্ত্রাসের কারসাজি, এ অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত সিলমোহর দিল না। আর আদালতের রায় জানতে পেরেই দিকে দিকে উল্লাস শুরু করল তৃণমূল। এই রায়কে ‘মানুষের জয়’ বা ‘গণতন্ত্রের জয়’ বলে বার বার অভিহিত করা শুরু হল।

আরও পড়ুন: মালদহে বোর্ড গঠনের লড়াইয়ে নিহত দুই, রেহাই পেল না শিশুও

মনোনয়নপত্র দাখিল, মনোনয়ন প্রত্যাহার, ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা পর্বে যা কিছু ঘটতে দেখা গিয়েছে, তা যদি ‘মানুষের জয়’-এ পৌঁছনোর পন্থা হয়, তা হলে বোর্ড গঠন পর্বে যা ঘটছে তাতেও আসলে ‘মানুষের জয়’-ই সূচিত হতে চলেছে বলে ধরে নিতে হবে। অশান্তিতে জড়িয়ে আদৌ কোনও লাভ হবে কি না, বিরোধী দলগুলিকে তা আবার ভাবতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের পৌঁছতেই দেওয়া হচ্ছে না বোর্ড গঠনের ভোটাভুটিতে, সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অঞ্চলে স্রেফ বাহুবল দেখিয়ে এবং পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বোর্ড হাতিয়ে নিচ্ছে রাজ্যের শাসকদল— এই অভিযোগ তুলে আবার আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যেতে পারে। আদালতের দরজা খোলাই রয়েছে। কিন্তু প্রশাসন বা নির্বাচন কমিশন কি আদালতে দাঁড়িয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে মান্যতা দেবে? যদি না দেয়, তা হলে কি অভিযোগ এ বারও প্রমাণ করা যাবে?

আরও পড়ুন: বোর্ড গঠন ঘিরে গুলি-বোমা পুরুলিয়ায়, হত বিজেপির দুই সমর্থক

প্রতিটি ধাপে ধাক্কা খেতে খেতে রাজ্যের পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলির পরিসর আর কতটুকু রইল, সে অত্যন্ত বড় প্রশ্ন। নাগরিকের অগ্রগতি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় নাগরিকের নিজের অংশগ্রহণের যে লক্ষ্য নিয়ে পঞ্চায়েতিরাজের প্রচলন, সে লক্ষ্যের সঙ্গে, এই পঞ্চায়েতের কোনও সম্পর্ক আদৌ রইল কি না, তা আরও বড় প্রশ্ন। কিন্তু এত রক্তপাত, এত প্রাণহানি, এত পরিবারের স্থায়ী ক্ষতির মূল্যে প্রশ্ন তোলা কী ভাবে সম্ভব, তাও ভেবে দেখা দরকার।

ভাবনা-চিন্তার সময় কিন্তু অচিরেই শাসকদলের জন্যও তৈরি হবে। গণতান্ত্রিক পথে কোনও প্রশ্ন তোলার বা কোনও সংগ্রাম করার অবকাশই যদি না থাকে, তা হলে কিন্তু একের পর এক অগণতান্ত্রিক পথ খুলতে শুরু করবে। সেটাই স্বাভাবিক। তেমনটা হলে কিন্তু ঘোর দুঃসময় আসন্ন।