তথাকথিত পরম্পরায় অনেক কিছুই থাকে, যা আদি-অনন্তকাল ধরে অনুসৃত না হতেই পারে। সব পরম্পরাকে চিরন্তন হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না, কারণ পরম্পরা মাত্রই ইতিবাচক, এমনটা ভেবে নেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। স্বাভাবিক নিয়মেই কোনও প্রথা শ্বাশত হয়ে ওঠে, কোনওটা বিলীন হয়ে যায় কালের গর্ভে, কালের কোনও সন্ধিক্ষণে পৌঁছে আবার নতুন কোনও প্রথা জন্মও নেয়। কিন্তু কালের নিয়মেই পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে যে সব তথাকথিত পরম্পরা, যা প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য ভাবেই বর্জনীয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তার পুনরুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা বা তার পক্ষে সওয়াল করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। শুধু অস্বাভাবিক নয়, তা নেতিবাচক এবং ক্ষতিকরও।

তেমনই এক নেতিবাচক, ক্ষতিকর এবং অস্বাভাবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। নিজের নির্বাচনী ক্ষেত্রে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত। শিলান্যাস অনুষ্ঠানের মঞ্চে হাজির হয়ে সাংসদের পা ধুইয়ে দিয়েছেন এক অনুগামী। তার পর সেই পাদোদক পান করেছেন। সাংসদ সাগ্রহে ঘটনাটা ঘটতে দিয়েছেন, তার পরে সে ঘটনার ভিডিয়ো সদর্পে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন।

স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে গোড্ডার সাংসদের এহেন আচরণ। প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক শিবিরে। নিশিকান্ত দুবে এমন একটি সভার সদস্য, যে সভা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইনসভা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নিশিকান্ত দুবে যে দৃষ্টান্তটির জন্ম দিলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কয়েক যোজন দূরত্বে তার অবস্থান। আনুগত্য প্রদর্শনের তাগিদে প্রকাশ্য মঞ্চে কেউ তাঁর পাদোদক পান করতে চাইলেন এবং তিনি তাতে রাজি হয়ে গেলেন! এতেই থামলেন না, অনুগামীর ‘আনুগত্য’ এবং নিজের ‘মহানতা’র প্রমাণ দিতে পাদোদক পানের ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়লেন! কোন বোধ বা কী ধরনের মানসিকতা থেকে এটা করলেন সাংসদ? প্রশ্ন উঠে গিয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু নিশিকান্ত দুবে অবিচলিত। পৌরাণিক নিদর্শন টেনে এনে তিনি বলছেন, কৃষ্ণও তো পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন সুদামার।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

কৃষ্ণ তো পরকীয়াও করেছিলেন। প্রকাশ্যে পরকীয়ার পক্ষে সওয়াল করতে পারবেন তো নিশিকান্ত দুবে?

প্রাচীন ভারতীয় পরম্পরায় লঘুর স্থান সর্বদা গুরুর চরণে। গুরুর পদস্পর্শ করে আশীর্বাদ নেওয়া, গুরুর চরণধূলিকে পবিত্র জ্ঞান করা, গুরুর পাদোদক পান করা— এ সবের প্রচলন ভারতে ছিল। পা ধুইয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার প্রচলন আজও রয়েছে। কিন্তু পাদোদক পানের প্রথা মোটামুটি পরিত্যক্ত হয়েছে। সম্মান বা আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য পা ধোওয়া জল খেতে হবে, এমন তত্ত্ব খুব যুক্তিযুক্ত নয়, স্বাস্থ্যকরও নয়। কালের নিয়মেই অতএব বিলুপ্তির পথে এগিয়েছে সে প্রথা। তবে অন্তঃসলীলা এক প্রশ্রয়ও বোধহয় সক্রিয় ছিল। ছিল বলেই প্রায় এক শতাব্দী ধরে ক্রমে ক্রমে বিলুপ্তির গর্ভে বিলীন হতে চাওয়া প্রথার প্রকাশ্য অনুশীলন সানন্দে ঘটতে দিয়েছেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক আইনপ্রণেতা। সওয়ালও করেছেন সে প্রথার পক্ষে।

আরও পড়ুন: বিজেপি সাংসদের পা ধুয়ে জল খেলেন দলীয় কর্মী, তুমুল বিতর্ক

নিশিকান্ত দুবে নিজের ভুল ঢাকতে এখন পাদোদক পানের পক্ষে সওয়াল করছেন, নাকি তিনি সত্যিই এই প্রথাকে সমর্থন করছেন, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। যদি তিনি বুঝতে পেরে থাকেন যে, তিনি ভুল করেছেন এবং সেই অস্বস্তি ঢাকতেই যদি এখন নানা সাফাই খুঁজতে থাকেন, তাহলে পরিস্থিতিটা কম বিপজ্জনক। কিন্তু যদি এমন হয় যে, নিশিকান্ত দুবে পাদোদক পানের প্রথাকে সত্যিই সমর্থন করেন, তাহলে সে সমর্থনের তাৎপর্য অনেক বেশি বিপজ্জনক। সে ক্ষেত্রে বুঝতে হবে, আমাদের আসল অগ্রগতি মোড়কে, সমাজের গভীরে গেলেই দেখা যাবে খাঁজে খাঁজে জমে রয়েছে অনেক আদিমতা।

আবার বলি, হয়তো প্রায় এক শতাব্দী বা হয়তো তারও বেশি সময় ধরে পাদোদক পানের প্রথাকে বর্জন করে আসছে আমাদের সমাজ। গোড্ডার একটা ঘটনা এই দীর্ঘ বর্জনকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দেবে, এমন নয়। এই ঘটনাকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতেই পারি। কিন্তু প্রথমত অনুভূতিতে প্রবল ধাক্কা দেয় এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাটুকুও। শতাব্দীকাল ধরে তিলে তিলে অর্জিত প্রগতির সংহার ঘটে যায় যেন এক লহমায়। প্রগতিশীল হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, মনে হয় এক ধাক্কায় একশো বছর পিছিয়ে গেলাম। দ্বিতীয়ত, জঘন্য এক প্রথার অনুশীলনটা ঘটল এমন এক ব্যক্তির হাত ধরে, যিনি ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্যতম নিয়ন্তা। অতএব, তাৎপর্য আরও গুরুতর। শুধু বিরোধী শিবির নয়, শাসক শিবির থেকেও এ ঘটনার নিন্দা হওয়া উচিত ছিল। নিশিকান্ত দুবে শাসকদলের সাংসদ বলে দেশের শাসকরা এ ঘটনার নিন্দা করবেন না, বিষয়টা যদি এরকম হয়, তাহলে তাৎপর্যটা শুধু রাজনৈতিক আঙিনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজেও একটা বার্তা যায় যে, দেশের শাসকরা পাদোদক পানের মতো প্রথার বিরোধী নন। তাতে সামাজিক বিপদ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শাসক যদি এটুকু না বোঝেন অথবা রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতাবশত না বোঝার ভান করেন, তাহলে ফলাফলটা মঙ্গলজনক হবে না।