এক বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। ২০১৪’র ১৬ মার্চ ছিয়াশি বছর বয়সে নিজের জন্মস্থান ঢাকায় বর্তমান কালের অন্যতম সেরা বাঙালি ভারতবিদ্যাবিশারদ, ফ্রান্স নিবাসী কমলেশ্বর ভট্টাচার্য প্রয়াত হন। ঢাকায় কমলেশ্বরের প্রয়াণ একটি ঘটনা মাত্র। ঘটনাটির কথা আমি জানতে পারলাম খুব সম্প্রতি, তাইল্যান্ডে সদ্য অনুষ্ঠিত বিশ্ব সংস্কৃত সম্মেলন ফেরত কয়েক জন ছাত্রছাত্রীর কাছে। তাঁরাও কেউ এই ঘটনাটা জানতেন না। আসলে, আমি ইন্টারনেট, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ভোক্তা নই। নির্ভর করি সাবেকি দেশি সংবাদপত্রের উপর। যত দূর খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, এ পার বাংলায় একটি সংবাদপত্রে এক চিলতে উল্লেখ ছাড়া আর কোনও সংবাদপত্রে ঘটনাটা খবর হিসেবে বেরোয়নি, কোনও বিশদ প্রয়াণলেখ তো দূরস্থান। উপরোক্ত উল্লেখটি আমার নজরে পড়েনি। গত বছর সেপ্টেম্বরে এক মাস ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলা অ্যাকা়ডেমিতে নানা আলোচনাসভায় অংশ নিয়েছি, আড্ডা হয়েছে, কোনও বন্ধুর মুখে এই মৃত্যুসংবাদ শুনিনি। একটু বিষণ্ণ মনেই তাঁর সদ্য পুনর্মুদ্রিত বইটির পাতা ওলটাচ্ছিলাম। পাতার মধ্য দিয়ে যেন বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনের অনুরাগী কমলেশ্বরের পরিচিত গলাটি শুনলাম, বিচলিত হতে মানা করলেন। সবই তো ক্ষণিক, পঞ্চ উপাদানে নির্মিত দেহের এখন কোনও ব্যবহারিক প্রয়োজন নেই, অতএব সাপেক্ষতা নেই। তাই তাঁর চলে যাওয়ার ঘটনা আজকের বঙ্গদেশের সংস্কৃতি ও সাধনার পরিসরে তেমন কোনও খবর হয়ে ওঠেনি, হয়ে ওঠার প্রত্যাশাটাই অলীক।
১৯৭০-এর দশকে, আমার কর্মজীবনের প্রারম্ভে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের আড্ডায় দু’এক জন অগ্রজ সহকর্মীর মুখে মাঝে মাঝে এক জন কমলেশ্বর ভট্টাচার্যের নাম শুনতাম, বিদ্যাচর্চার নিষ্ঠা ও ব্যাপ্তির আদর্শ রূপে তিনি মান্য,  এমন কথা কেউ কেউ বলতেন। দেশভাগের পর হুগলির উত্তরপাড়ার বাসিন্দা কমলেশ্বর অতি সামান্য অবস্থা থেকে ১৯৫০-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বারাণসীতে কিছু দিন ধরে সংস্কৃত ভাষার নিবিড় পাঠ নেবার পর ছাত্রবৃত্তি নিয়ে ইতিহাসে গবেষণার জন্য প্যারিসে যান, অচিরেই ভারততত্ত্ববিদ লুই রোনু-র  বিদ্যাবংশের উজ্জ্বল রত্ন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ১৯৩১-এ কম্বোজের সহস্রাধিক শিলালিপি ও মূর্তিকে বিশ্লেষণ করে প্রাচীন কম্বোজ (আধুনিক কামপুচিয়া বা কম্বোডিয়া) দেশে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাস ও চরিত্র বিচার নিয়ে ফরাসিতে লেখা গবেষণা সন্দর্ভটি প্রকাশমাত্রই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সভ্যতার উপরে প্রামাণিক গ্রন্থ রূপে সর্বত্র অভিনন্দিত হয়। বিদ্যাচর্চায় সন্তোষের কোনও স্থান কমলেশ্বরের মনে ছিল না। পতঞ্জলির ‘অথ শব্দানুশাসনম্’ কথাটি তাঁর প্রিয় ছিল। খেমর লিপি ও ভাষা আয়ত্ত করে কম্বোডীয় শিলালিপির পাঠে শব্দার্থ বিচার নিয়ে ত্রিশ বছর ধরে তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ লেখেন, ‘লেকোল ফ্রঁস্যাজ দেক্সত্রিম-ওরিওঁত’ নামে বিখ্যাত প্রাচ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বুলেটিনে সেগুলি নিয়মিত প্রকাশিত হয়, পরে প্রবন্ধসংগ্রহ রূপেও ছাপা হয়। সঙ্গে সঙ্গে চলে কুইদেস  প্রমুখ পূর্বতন পণ্ডিতদের লেখ পাঠ  ও সম্পাদন। একাধিক খণ্ডে সংকলিত সেই সব সংগ্রহও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোনও গবেষকের অবশ্যপাঠ্য।

‘অনুশাসন’-এর অর্থ বিধি, নিয়ম ও শাসনবাক্য। যজ্ঞে শব্দ উচ্চারণে সামান্য ভুলের কারণে অসুরদের বিপর্যয় হয়েছিল, এই কথাবস্তু পতঞ্জলি তাঁর মহাভাষ্যের গোড়াতেই জানিয়েছিলেন। এ হেন সংস্কৃত ভাষার কাঠামোয় দেশজ শব্দের স্থিতিতে ‘দ্বীপময়’ এশিয়াতে সংস্কৃতি ও শাসনের কী অবয়ব কোন স্তরে কেমন আকার নিয়েছিল, তারই বিশ্বস্ত আর্কাইভ গড়ে তোলা কমলেশ্বরের প্রাথমিক অন্বেষা  ছিল। বহুজাতিক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত সংস্কৃতি, ধর্ম ও শাসনের উচ্চতর পরিমণ্ডলে সংস্কৃত ভাষার প্রসারক্ষেত্রকে শেলডন পোলক ‘Sanskrit Cosmopolis’ আখ্যা দিয়েছেন। এই মণ্ডলে সংস্কৃত ভাষার মান্য আবরণে অন্য বহু সংস্কৃতি কথা বলেছে। সেই প্রক্রিয়ার নানা আকর কমলেশ্বরের ঐতিহাসিক ও শাব্দিক গবেষণায় ছড়িয়ে আছে।

কমলেশ্বর রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। নিজস্ব গবেষণার ফাঁকে ফাঁকে তিনি রবীন্দ্রনাথের একাধিক গল্প ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন,  অনূদিত গল্পসংগ্রহটির একাধিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসচৈতন্যে বুদ্ধের বিশিষ্ট স্থান ছিল। যে আনন্দময়, মঙ্গলময়, শান্ত ও সহিষ্ণু ভারতের স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তার ঐতিহাসিক ধ্যানমূর্তি বুদ্ধ। ১৯০৫ সালের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় চারুচন্দ্র বসুর অনূদিত ‘ধম্মপদ’-এর উপর আলোচনায় তাঁর নিজের ইতিহাসবোধ ব্যাখ্যা করার সময় বাংলার তরুণ গবেষকদের কাছে বৌদ্ধ শাস্ত্র, দর্শন ও চিন্তা বিচার ও অনুবাদ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ আন্তরিক আবেদন করেছিলেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি পণ্ডিতরা গত দশকে বৌদ্ধ ধর্ম, দর্শন ও পুথি গবেষণার এক সজীব পরম্পরা গড়ে তুলেছিলেন। বিধুশেখর ভট্টাচার্য, বেণীমাধব বড়ুয়া, প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও অনন্তলাল ঠাকুর সেই পরম্পরার উজ্জ্বল দীপ। ওই আহ্বান ও পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন কমলেশ্বর। ওই সারস্বত সাধন-পথের অন্যতম পথিক তিনি নিজেও।

যেমন খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যমিক  দার্শনিক বৌদ্ধ নাগার্জুনের লেখা একটা ছোট সংস্কৃত পুথি আছে। বিদঘুটে নাম: ‘বিগ্রহ ব্যাবর্তনী’। বিগ্রহের পারিভাষিক অর্থ বাদ বা তর্ক, ব্যাবর্তনের মানে প্রতিপক্ষীয় তর্কজালকে ছিন্নভিন্ন করা। নামের জুজু-র ভয়কে কাটিয়ে রাহুল সাংকৃত্যায়ন আবিষ্কৃত এই পুথিটির কয়েকটি পাতা ওল্টালেই ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্ব ও বৈচারিক পদ্ধতির ইতিহাসে রচনাটির গুরুত্ব বোঝা যায়। নাগার্জুনের বিখ্যাত রচনা ‘মূলমধ্যমককারিকা’-এর  বিরুদ্ধে তত্‍কালীন নৈয়ায়িক প্রমাণবাদীরা একরাশ আপত্তি তোলেন। এই ছোট পুস্তিকায় ওই প্রমাণবাদীদের আপত্তিগুলিকে পূর্বপক্ষ হিসেবে নাগার্জুন নিপুণ ভাবে সাজান, একে একে বিচার ও খণ্ডন করে নিজের বৈতণ্ডিক আলোচনাপদ্ধতির পূর্ণ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করেন। পুথির আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের মতো দেবদত্তদের নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের নানা উদাহরণ আছে, সরস উক্তি আছে, আর আছে সেই বহুবিতর্কিত আত্মঘোষণাটি: ‘নাস্তি চ মম প্রতিজ্ঞা’। এ হেন আকর্ষক পুথির জনস্টন ও কুন্স্ট্ প্রকাশিত একটি পুরনো পাঠকে কমলেশ্বর শোধন করেন। ওই শোধিত পাঠের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ টিপ্পনি, ভূমিকা ও প্রাঞ্জল অনুবাদ যোগ করে পুস্তিকাটির আধুনিক পাঠ তিনি ১৯৮৯ সালে ছাপান। পাঠটির চারটি সংস্করণ নিঃশেষিত হয়েছে। টিপ্পনিতে কমলেশ্বর দেখিয়েছেন, কী ভাবে ভারতের জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাসে বাদ-বিতর্কের একটি বিশ্বস্ত প্রভাতী রূপ এই পুস্তিকায় ধরা পড়েছে, কী ভাবেই বা বৈয়াকরণ পতঞ্জলির মহাভাষ্যের শব্দ নির্বাচন ও উপস্থাপনার দ্বারা নাগার্জুন প্রভাবিত হয়েছিলেন। কমলেশ্বরের ভাবনায় নাগার্জুন নিছক বৈতণ্ডিক নন, বরং নৈঃশব্দ্যের সাধক, ভাষা-প্রকাশের শেষসীমা দেখিয়া এক অনিকেত নৈঃশব্দ্যের অনুসন্ধানী তিনি। এর পরেও কমলেশ্বর একাধিক ন্যায়গ্রন্থ সম্পাদনা ও অনুবাদ করেছেন। শুনেছি যে, মহানৈয়ায়িক গঙ্গেশের উপর তাঁর সম্পাদিত যজ্ঞদত্ত উপাধ্যায়ের টীকাগ্রন্থটি এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসে যন্ত্রস্থ, কোনও এক দিন বেরোবে।

কোনও সন্দেহ নেই যে, কমলেশ্বর ‘ঘোর’ পণ্ডিত। কিন্তু ততঃ কিম্, তাতে কী? বাঙালির সারস্বত সাধনায় নিছক পুথি সম্পাদনের ঘের ছাড়িয়ে বৌদ্ধ দর্শন আলোচনার আর একটি খাত  ছিল। ১৯৪০-এর দশকে বটকৃষ্ণ ঘোষের ‘বিজ্ঞানবাদ’ নিয়ে নিবন্ধসমূহ বা ১৯৫৫ সালে ছাপা অনন্তকুমার ভট্টাচার্যের ‘বৈভাষিক দর্শন’ আদৌ কোনও প্রাচীন দার্শনিক মতের চর্বিতচর্বণ নয়, বরং বৌদ্ধ দর্শনতত্ত্বের অন্তর্লীন কুলজি বিচার ও তাত্পর্য বিশ্লেষণে প্রাক্তনদের মতগুলি প্রয়োজনে নাকচ করে তাঁরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে হাজির করেছেন। ঠিক সেই খাতেই লেখা কমলেশ্বর ভট্টাচার্যের ‘Atman-Brahman in Ancient Buddhism’ (১৯৭৩/২০১৫)। এই সন্দর্ভে আত্মবাদী ও নৈরাত্মবাদীর দা-কাটা  দার্শনিকবর্গে বৌদ্ধ ধর্ম ও জ্ঞানতত্ত্ব বিচারের প্রচলিত ছককে তিনি একেবারে অস্বীকার করেছেন। বিতর্কিত গ্রন্থ সন্দেহ নেই। কিন্তু এই রচনার একাধিক পরিশিষ্টে তিনি ভিন্ন ভিন্ন প্রতর্কে প্রাসঙ্গিক বৌদ্ধ ধারণা বর্গগুলির অনুপুঙ্খ বিচার করে নিজের তাত্‍পর্যকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই প্রয়াসটি যে-কোনও ইতিহাসবিদের অশেষ শ্রদ্ধা অর্জন করবে।

১৯৯৪-৯৫ সালে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে মাঝে মাঝে কমলেশ্বর ভট্টাচার্য পূর্বসূরিদের বাংলা লেখা পড়তে আসতেন, পড়ার ফাঁকে ক্যান্টিনে আমার মতো অভাজনকে চা খাওয়াতেন। ব্যাকরণচিন্তার অন্বয়ে দর্শন ও ইতিহাসের সম্বন্ধ নিয়ে তিনি অনর্গল কথা বলতেন, প্রায় একতরফাই, আমি চুপ করে শুনতাম। বুঝতাম যে আমি উপলক্ষ মাত্র। সে দিনের পাঠকে তিনি আর এক বার যেন ঝালিয়ে নিচ্ছেন, পাঠ তোলা তো যে কোনও দর্শনজিজ্ঞাসুর দৈনন্দিন অভ্যাস। মনে পড়ত যে, ইউরোপে নানা বিদ্যায়তনের মধ্যে ‘কোলেজ দে ফ্রঁস’-তে সংস্কৃত চর্চার জন্য অধ্যাপকদের পদ প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় ওই প্রাচীন পদ থেকে জঁ ফিলিওজা অবসর নেন। প্রায় সর্ববাদীসম্মত রূপে কমলেশ্বরই ওই পদে নির্বাচিত হন। পরে ফরাসি সরকার পদটি বিলুপ্ত করে, কিন্তু তাঁকে ‘সোঁথ নাশিওনাল দ্য লা রোশেন্স সোঁতিফিকে’-এর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক, পরে অধিকর্তা করা হয়।

জানি যে,  দেশি না বিদেশি, ফরাসি না ভারতীয় নাগরিক, গ্লোবাল না বাঙাল— এই প্রশ্নটি বিদ্যাসাধক কমলেশ্বরের কাছে অবান্তর ছিল। তাঁর মতে, ব্যবহারিক জগতে সার্বিক আপেক্ষিকতাই মান্য, ‘অস্তি-নাস্তি’-র দ্বন্দ্বে যে কোনও বর্গই একপেশে। তবে ‘ধম্মপদ’ তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল, বুদ্ধবচনটি তিনি জানতেন, ওটিই তাঁর সারা জীবনের শীলব্রত, ‘পূর্তকারেরা নিয়ন্ত্রিত করেন জলকে, তীরনির্মাতা গঠন করেন বাণের ফলাকে, সূত্রধার  তৈরি করেন কাঠকে, আর পণ্ডিতরা নিয়মিত তৈরি করেন নিজেকে।’