E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: সত্যের পক্ষে

বর্তমান সময়ে যাঁরা এই পেশায় আসছেন, তাঁদের অনেকের মধ্যেই ভালবাসা রয়েছে। কিন্তু বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকার তাগিদ।

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ০৭:১৮

স্বাতী ভট্টাচার্যের লেখা ‘সংবাদের পুনরুদ্ধার’ (২২-৫) একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। তথ্য ও উদাহরণসমৃদ্ধ এই বলিষ্ঠ লেখাটি মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে এক জোরালো বার্তা বহন করে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় সংবাদমাধ্যমকে। সুস্থ জনমত গঠন এবং সমাজের দর্পণ হিসাবে এর কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা’ শব্দবন্ধটি যেন এক মরীচিকা। সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা কর্পোরেট শক্তির প্রভাববলয়ে চলে গিয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের শাসকের ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

অতীতে যাঁরা সাংবাদিকতা পেশায় আসতেন, তাঁদের মূল চালিকাশক্তি ছিল সততা, নিষ্ঠা এবং ভালবাসা। তাঁদের বলিষ্ঠ, তথ্যসমৃদ্ধ ও নির্ভীক কলম সরকারের অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত। সাধারণ পাঠক সেই লেখায় সমৃদ্ধ হতেন, আর দুর্নীতিপরায়ণ শাসককুল থাকত তটস্থ। মনে পড়ে, বরুণ সেনগুপ্তের ক্ষুরধার লেখা যে দিন আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হত, সে দিন তার চাহিদা থাকত তুঙ্গে। গৌরকিশোর ঘোষের মতো সাংবাদিকদের আপসহীন লেখনী আজও ইতিহাসের দলিল। জরুরি অবস্থার পর ইন্দিরা গান্ধীর পতন থেকে দেশ, রাজ্যের একাধিক পটপরিবর্তনে সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

বর্তমান সময়ে যাঁরা এই পেশায় আসছেন, তাঁদের অনেকের মধ্যেই ভালবাসা রয়েছে। কিন্তু বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবিকার তাগিদ। এই কঠোর বাস্তবতায় অনেক সময় সততা, নিষ্ঠা এবং তথ্যের নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিতে হয়। এই আপসের প্রক্রিয়ায় এক জন সাংবাদিককে প্রতিনিয়ত নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। সংসারের দায়বদ্ধতা ও জীবনের প্রয়োজন তাঁদের অনেক সময় এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য করে। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রমী সাংবাদিক রয়েছেন, যাঁরা প্রশাসনের লাল চোখ বা রাজনৈতিক চাপকে তোয়াক্কা না করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরাই আজ সমাজের পথপ্রদর্শক এবং জনগণের চোখে আদর্শ সাংবাদিক।

গণতন্ত্রে যদি বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও জনকল্যাণের পথ রুদ্ধ হতে বাধ্য। শাসক দল সব সময় দেশবাসীর স্বার্থে আইন প্রণয়ন করে না; অনেক সময় দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার ও সামগ্রিক উন্নয়নের পরিপন্থী। এই পরিস্থিতিতে ঠিক তথ্য ও সত্য সংবাদ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের পবিত্র কর্তব্য। তা না হলে দেশ ও দেশবাসীর অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, যার অজস্র উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসে ছড়িয়ে রয়েছে।

স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল ধরে সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে সত্যের জয়গান গেয়ে এসেছেন। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপট যেন অনেকটাই ম্লান। মনে রাখা প্রয়োজন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দেশের উদার, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা এই সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।

গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর

গণতন্ত্রের শর্ত

গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধুমাত্র সরকারের বক্তব্য প্রচার করা নয়, বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাও। সাংবাদিকের প্রশ্ন অস্বস্তিকর হতে পারে, কঠিনও হতে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া বা প্রশ্নকর্তাকে আক্রমণ করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়। বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে সমালোচনা ক্রমশ অসহিষ্ণুতার মুখে পড়ছে।

ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যম ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ— বহু ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতা রাষ্ট্রক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এখন সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ প্রশাসনঘনিষ্ঠ প্রচারে ব্যস্ত। টেলিভিশনের বহু চ্যানেল কার্যত প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

বিতর্কের জায়গা দখল করেছে চিৎকার, তথ্যের জায়গা নিয়েছে আবেগ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম-স্বাধীনতা সূচকে ভারতের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যেরও প্রতিফলন। যখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, প্রশ্ন তুললেই ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়, তখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সীমিত হয় না, নাগরিকের জানার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকার, বিরোধী দল, বিচারব্যবস্থা— সকলকেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ প্রশ্নহীন ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের দিকেই এগোয়। গণতন্ত্রের শক্তি করতালিতে নয়, প্রশ্ন করার অধিকারে। আর সেই অধিকার রক্ষা করতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কোনও বিকল্প নেই।

প্রতাপ চন্দ্র দাস, নবদ্বীপ, নদিয়া

দায়িত্ব ভাগ

‘পরিবারের দায়িত্বই বাধা মহিলাদের কর্মজীবনে, দাবি সমীক্ষায়’ (১৮-৫) প্রতিবেদন বিষয়ে আমার কিছু মতামত আছে। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর অনেক নারী এই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন এবং কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অথচ একটি সন্তানের দায়িত্ব মা-বাবা উভয়েরই সমান। তাই কর্মক্ষেত্রে সাময়িক অসুবিধা বা পেশাগত ক্ষতির দায়ও দু’জনেরই সমান ভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত।

অনেক পরিবারে বয়স্ক মা-বাবার দেখাশোনার দায়িত্বও মহিলাদের কাঁধে এসে পড়ে। সেই কারণে বহু নারীকে কর্মজীবন থেকে সরে যেতে হয়। কিন্তু সব দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর আবার নতুন করে কর্মজগতে ফিরে আসা সহজ নয়। বয়স এবং নানা সামাজিক বাস্তবতা তখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক জন মধ্যবয়স্কা নারী হিসাবে আমার মনে হয়, আজকের দিনে নারী-পুরুষ উভয়ের উপার্জন সংসার ও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তব সত্যটি আমাদের নিজেদের বুঝতে হবে এবং সমাজকেও তা বুঝতে সাহায্য করতে হবে।

আইভি লাহিড়ী, কলকাতা-৩০

জয়ের কারণ

‘হারজিতের হিসাবনিকাশ’ (২০-৫) শীর্ষক শুভময় মৈত্রের প্রবন্ধটির প্রসঙ্গে কিছু কথা। রাজনৈতিক দলগুলি তাদের জয়-পরাজয় নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করবেই, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, যে দল যখন হেরেছে, তখনই ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ নতুন কিছু নয়।

তবে এ বারের নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দলটি আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। কৌশলগত দিক থেকেও বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে বিজেপি নিজেদের শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কর্মীরাও প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। তৃণমূল থেকে শুভেন্দু অধিকারী-সহ কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দলে এনে বিজেপি হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নকে আরও জোরালো ভাবে সামনে এনেছে। অন্য দিকে, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কথাও অস্বীকার করা যায় না। বামেরা ধারাবাহিক আন্দোলন করলেও বহু ভোটারের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক সমীকরণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বিজেপি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে।

এখন দেখার, মানুষের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে দলটি কতটা সফল হয়।

স্বপন আদিত্য কুমার বিশ্বাস, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Press media

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy