শামিম আহমেদের ‘তিনি রাষ্ট্র তিনিই মহা ভারত’ (রবিবাসরীয়, ২-৯) পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। মহাভারতের কাহিনি অনুসরণ করলে দেখা যায়, সেই সময় আর্যাবর্তে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল মূলত দু’টি অক্ষে বিভক্ত ছিল। এক দিকে ছিলেন প্রবল পরাক্রান্ত মগধরাজ জরাসন্ধ ও তাঁর মিত্রগোষ্ঠী। যাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর জামাতা কংস, চেদিরাজ শিশুপাল, সৌভপতি শাল্ব, মহাবীর রুক্মী, পুন্ড্রবর্ধনের অধিপতি পৌণ্ড্রক বাসুদেব, প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা নরকাসুর ইত্যাদি। অন্য পক্ষে ছিলেন যাদব কৃষ্ণ গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ কৃষ্ণ ও পাণ্ডবপক্ষ। জরাসন্ধ ছিলেন আর্যাবর্তের সর্বাধিক প্রভাবশালী রাজা। আর্যাবর্তের রাজনীতিতে অপেক্ষাকৃত নবীন ও তরুণ কৃষ্ণ সেই সময় নিজের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হতে শুরু করেন। পাণ্ডব ও কৌরবদের জ্ঞাতিবিরোধের মধ্যে প্রবেশ করে তিনি পাশে পেয়ে যান পাণ্ডবপক্ষকে, যাঁরা পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন কৃষ্ণের পরম বশংবদ। নিজ প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, কৌশল, সমরনীতি ও কূটনীতির সফল প্রয়োগে একে একে তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করেন কৃষ্ণ। যে কোনও কালের প্রেক্ষাপটে, যে কোনও রাজনৈতিক নেতার পক্ষে যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেখানে তিনি কতটা ন্যায় আর কতটা অন্যায়ের আশ্রয় নিয়েছেন তা তর্কসাপেক্ষ। তবে এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকতে পারে না, কৃষ্ণ সে সময়ে হয়ে উঠেছিলেন ‘কিং মেকার’। আর যে হেতু পাণ্ডবপক্ষ কৃষ্ণের বশংবদ, তাই কৃষ্ণ প্রয়াসী ছিলেন যুধিষ্ঠিরকে আর্যাবর্তের একচ্ছত্র সম্রাটরূপে অধিষ্ঠিত করতে।

তবে কৃষ্ণ শুধুমাত্র তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিপাতিত করে ক্ষান্ত হননি, তিনি ভারতভূমি থেকে শক্তিশালী অনার্যদেরও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন— ব্রাহ্মণ্যশক্তি ও তার অনুগামী আর্য ক্ষত্রিয়দের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। ঘটোৎকচ বধের পর পাণ্ডবরা শোকাহত হয়ে পড়লেও কৃষ্ণ খুশি হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “অর্জুন তোমাদের হিতের জন্য আমি মহাবীর জরাসন্ধ, শিশুপাল এবং ব্যাধজাতীয় একলব্যকে বধ করেছি বা করিয়েছি। হিড়িম্ব, কির্মির, বক, অলায়ুধ এবং ঘটোৎকচকেও নিপাতিত করিয়েছি— একৈকশো নিহতাঃ সর্ব এতে। জরাসন্ধ, শিশুপাল, একলব্যরা দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করলে আজ এত সহজে যুদ্ধ করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব হত না। আর কর্ণ যদি শক্তি দ্বারা ঘটোৎকচকে বধ না করতেন, তবে আমিই তাকে বধ করতাম। কিন্তু তোমাদের প্রীতির জন্য আমি পূর্বে ওকে বধ করিনি। কারণ এ রাক্ষসটাও ব্রাহ্মণদ্বেষী, যজ্ঞবিরোধী, ধর্মলোপী, পাপাত্মা ছিল।” অথচ মহাভারতে এমন কোনও ঘটনা আমরা দেখতে পাই না, যার ভিত্তিতে বলা যায় ঘটোৎকচ ব্রাহ্মণদ্বেষী, যজ্ঞবিরোধী, ধর্মলোপী, পাপাত্মা। কৃষ্ণের মূল উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী অনার্যদের নিপাতিত করে নিজের প্রাধান্য নিষ্কণ্টক করা।

কিন্তু মহাভারতকার সর্ব ক্ষেত্রেই সমতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন বোধ হয়। তাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের উত্তরকালে কৃষ্ণ অবিসংবাদিত রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পরও অন্তর্কলহে জর্জরিত যাদবকুল ৩৫ বছর পরই ধ্বংস হয়। আর কৃষ্ণও মৃত্যুবরণ করেন এক অনার্য সাধারণ ব্যাধের শরনিক্ষেপে। এ হয়তো এক রূপক। কারণ, ইতিহাসও তো আমাদের এই শিক্ষাই দেয়— যত বড় একনায়কই থাকুন না কেন, তাঁর পতন অনিবার্য। আর সেই পতনের মূল কান্ডারি হয়ে থাকে সাধারণ মানুষ।

শুভ্রজিৎ রায়

টেম্পল স্ট্রিট, জলপাইগুড়ি

 

জরাসন্ধবধ

শামিমের রচনাটিতে কৃষ্ণ বলছেন ‘‘শিবের অনুগ্রহপ্রাপ্ত জরাসন্ধের অধীনে ছিয়াশি জন রাজা রয়েছেন। কেবল চোদ্দো জন রাজা তাঁর বশে নেই।’’ আর জরাসন্ধবধের পর ‘‘জরাসন্ধের অধীন ছিয়াশি জন রাজা যুধিষ্ঠিরকে কর দিতে সম্মত হলেন। আর কোনও বড় বাধা রইল না।’’ এতে মনে হতে পারে যেন ওই ৮৬ জন রাজা জরাসন্ধের অনুগামী ছিলেন এবং ১৪ জন অবাধ্য। এখানে একটু বিশদ হওয়ার প্রয়োজন আছে।

বস্তুত কৃষ্ণই এই তথ্য যুধিষ্ঠিরকে জানান যে জরাসন্ধ ৮৬ জন রাজাকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন। আরও ১৪ জন রাজাকে বন্দি করতে পারলে ১০০ জন হবে। তখন এঁদের তিনি শিবের উদ্দেশে বলি দেবেন। কৃষ্ণ জানতেন এই বলি দেওয়ার ঘটনাটি যতই নিন্দনীয় হোক; যদি জরাসন্ধ তা সংঘটিত করতে পারেন তবে তিনি আরও ক্ষমতাশালী, আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবেন। সমগ্র আর্যাবর্ত, ভক্তিতে না হোক ভয়ে বশ্যতা স্বীকার করে নেবে জরাসন্ধের। সামরিক ক্ষমতায় জরাসন্ধকে হারানো সম্ভব নয় বলে দ্বন্দ্বযুদ্ধের পরিকল্পনা করেন কৃষ্ণ। মানবচরিত্র খুব ভাল বুঝতেন বলেই কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে এ-ও বলেন যে জরাসন্ধ বাহুবলে দর্পিত; অর্জুন বা কৃষ্ণ নয়, ভীমকেই তিনি মল্লযুদ্ধে আহ্বান করবেন।

এখানে আর একটা প্রশ্ন ওঠে, জরাসন্ধবধ গুপ্তহত্যা কি না? অশ্বত্থামা যে ভাবে ঘুমন্ত নিরস্ত্র পাণ্ডব পুত্রদের, ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রমুখের হত্যা করেছিলেন তার সঙ্গে জরাসন্ধ নিধনের তুলনা চলে না। কিন্তু অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে জরাসন্ধবধের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা-ও অনস্বীকার্য। অদ্বার দিয়ে তিনমহল পেরিয়ে উপবাসী জরাসন্ধের কাছে পৌঁছে কৃষ্ণ নিজেদের সত্য পরিচয়ই দিয়েছিলেন। যুক্তিও দিয়েছিলেন যে, মিত্রের গৃহে দ্বার দিয়ে আর শত্রুগৃহে অদ্বার দিয়ে প্রবেশ সমীচীন।

যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের বাধা দূর করার জন্যেই যে তাঁদের আগমন— এই মূল কথাটা না বলে, কৃষ্ণ এক নৈতিক দায়িত্ব পালনের কথা তুললেন। বললেন, ৮৬ জন রাজাকে এ ভাবে বন্দি করে বলি দেওয়া পাপকর্ম ও ক্ষত্রিয়ধর্ম- বিরোধী। হয় সেই রাজাদের মুক্তি দিতে হবে, নয়তো জরাসন্ধের মৃত্যু অনিবার্য। জরাসন্ধের কাছে ক্ষত্রিয়ধর্ম পৃথক। তিনি বললেন: যে বিজিত তাকে নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো যা ইচ্ছা করা যায়। বিশেষত দেবতার উদ্দেশে বলি দেবেন বলে যাঁদের বন্দি করেছেন, ভয় পেয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া অসম্ভব। এর পর কৃষ্ণের অভ্রান্ত অনুমান অনুযায়ী ভীমকেই বেছে নিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী।

১৪ দিন অবিশ্রান্ত যুদ্ধের পর পতন ঘটল তাঁর। ওই ৮৬ জন রাজা কৃতজ্ঞচিত্তে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে সর্ববিধ সহায়তা করতে প্রতিশ্রুত হলেন। জরাসন্ধবধকে পাপকর্ম বন্ধের প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কৃষ্ণের চূড়ান্ত রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।

অর্পণ চক্রবর্তী

কলকাতা-৪০

 

বৈশ্যকন্যা?

শামিম আহমেদ লিখেছেন, কৃষ্ণের প্রপিতামহী এবং কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের পিতামহী ছিলেন বৈশ্যকন্যা। কৃষ্ণের প্রপিতামহী ছিলেন কার্তবীর্যার্জুনের স্ত্রী, আর ব্যাসদেবের পিতামহী, অর্থাৎ পরাশর মুনির মা ছিলেন বশিষ্ঠর পুত্রবধূ অদৃশ্যন্তী। তাঁরা বৈশ্যকন্যা ছিলেন শুনিনি।

সন্দীপন সেন

কলকাতা-৫

 

লেখকের উত্তর: শ্রীকৃষ্ণের প্রপিতামহ ছিলেন যদুবংশীয় রাজা দেবমীঢ়, যিনি শূরের পিতা ও বসুদেবের পিতামহ। (সূত্র: মহাভারত, ৭/১১৯/৬, ৭/১৪৪/৬০৩০)। দেবমীঢ়ের এক জন স্ত্রী ক্ষত্রিয়কন্যা এবং অন্য স্ত্রী ছিলেন বৈশ্যকন্যা। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে জন্মান শূরসেন এবং অন্য স্ত্রীর সন্তান হলেন পর্জন্য। বশিষ্ঠপুত্র শক্ত্রির বিবাহ হয় বৈশ্য চিত্রমুখের কন্যা অদৃশ্যন্তীর সঙ্গে। ব্যাসপিতা পরাশর হলেন শক্ত্রি-অদৃশ্যন্তীর পুত্র। (মহাভারত, অনুশাসনপর্ব, ৫৩/১৭; পৃষ্ঠা ৬৯২, দ্য জার্নাল অব দ্য গঙ্গানাথ ঝা রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ভলিউম ২৬, ১৯৭০)।

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।

ভ্রম সংশোধন

শামিম আহমেদের ‘তিনি রাষ্ট্র তিনিই মহা ভারত’ (রবিবাসরীয়, ২-৯) নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ‘‘জরাসন্ধের আর দুই অনুগত নৃপতি হংস ও ডিম্বককে তত দিনে ইহজগৎ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন কৃষ্ণ।’’ কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর জন্য কৃষ্ণ প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী নন। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।