এখন অনেক রাত। ‘দেশের সবচেয়ে বড় উৎসব’— লোকসভা নির্বাচন ২০১৯-এ সামান্য এক জন আধিকারিকের দায়িত্ব যথাসাধ্য পালন করে বাড়ি ফেরার চেষ্টায় ট্রেনে বসে আছি। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন সবে স্মৃতি তৈরি হচ্ছে, তখন দেখতাম ভোট নিয়ে ফেরার পর বাবার ফর্সা পিঠ জুড়ে লাল ঘামাচি, তিন দিনের টানা বিশ্রাম। সেই ট্র্যাডিশন আজও অব্যাহত। প্রচণ্ড গরমে আড়াই দিনের অমানুষিক পরিশ্রম। ভোটকর্মীদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেলেও, কষ্টভোগ প্রায় একই রকম।

বাইশ বছরের কর্মজীবনে আমারও ১৫-১৬ বার এই কষ্টভোগ করা হয়ে গেল। এ বছর ভোটপ্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ করছি। আমার দুই বন্ধু এবং এক বান্ধবী দীর্ঘ দিন যথার্থই যথেষ্ট অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও পাঁচ-ছ’দিন নির্বাচন কমিশনের অফিস এবং সরকারি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেও নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাননি। অন্য দিকে কয়েক জন বন্ধু, ভাই, সহকর্মী, দাদা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত চেনাশোনা এবং অন্য কোনও প্রভাব খাটিয়ে ভোট প্রক্রিয়া থেকে নিজের নামটি কাটিয়ে নিয়ে দিব্যি সুখে আছেন। এদের কয়েক জন পরিচিত রাজনৈতিক নেতার প্রভাব খাটিয়ে বা চাটুকারিতা করে নাম বাদ দিয়েছেন। এমনকি নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কয়েক জন কর্মী টাকার বিনিময়ে নাম কেটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন— এমন কানাঘুষোও শুনছি।

আমরা যারা বোকা, রোদে গরমে কষ্ট সহ্য করে ‘উৎসব’ পালন করছি। আর চালাকরা ঘরে বসে ফেসবুক- হোয়াটসঅ্যাপ-টুইটারে ‘গণতন্ত্র-স্বাধীনতা-নাগরিক অধিকার-দায়িত্ব-সচেতনতা’ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বাণী দিয়ে দেশসেবা করছেন! এই সব মানুেষর উদ্দেশে, আর এক মানুষের কথা শোনাই। ইনি বর্ধমানের একটি গ্রামীণ পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান। দু’মাস পর চাকরি-জীবন থেকে অবসর নেবেন। আমার বুথে ইনি ছিলেন সেকেন্ড পোলিং অফিসার। আমাদের দলের চার জনের মধ্যে প্রথম ডিসিআরসি-তে পৌঁছেছিলেন উনিই। ভাইয়ের মতো সকলকে আগলে রাখলেন, সারা দিন কাজ করলেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। মৃদু হেসে বললেন, ‘‘কাটাব কেন ভোটের ডিউটি? সরকার আমাকে ভরসা করে দায়িত্ব দিয়েছে, পালন করব না? সামনের ভোটে তো আর ডাকবে না, ভাই।’’

নির্বাচনে কী ফলাফল হবে তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। যে নেতাই জিতুন, আমি জানি, আমার দেশ আসলে এই সব ‘বোকা’ মানুষের দেশ, যাঁরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফাটলধরা মেঝেতে অবলীলায় গামছা পেতে ঘুমিয়ে নেন গণতন্ত্রের উৎসবে তাঁর অবদান রেখে গর্বিত হতে। ক্লান্ত শরীরে গভীর রাতের অপরিচ্ছন্ন প্যাসেঞ্জার ট্রেনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আপনাদের মতো ‘বোকা সাধারণ’ কিন্তু আসলে অসাধারণ মানুষদের জন্য গর্বিত হই। জানি প্রিয় ভারতবর্ষ টিভি বা খবরের কাগজ আলো করে থাকা কোনও নেতা বা নেত্রীর দেশ নয়। আপনার মতো অসংখ্য ‘বোকা’ কিন্তু ‘ভাল’মানুষের দেশ।

জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী

সহ-শিক্ষক, পলাশন এম এম হাইস্কুল, বর্ধমান

সাধনা লাইব্রেরি 

ব্রিটিশ রাজত্বকালে অবিভক্ত নদিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রধান কেন্দ্র কৃষ্ণনগরের সাধনা লাইব্রেরি আজ অবহেলায় ধ্বংসের পথে। এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যপূর্ণ গ্রন্থাগারটি ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন অনন্তহরি মিত্র, আর নামকরণ করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। 

অনন্তহরি যখন দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন, তৎকালীন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি সুপার ভূপেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কে জেলের ভিতর খুন করার অপরাধে তাঁকে ও প্রমোদ চৌধুরীকে ১৯২৬-এর ২৮ সেপ্টেম্বর ফাঁসি দেয় ব্রিটিশ সরকার। 

এই গ্রন্থাগার বিভিন্ন সময়ে নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র ব্যবহার করেছেন। সরোজিনী নাইডু ও বীরেন্দ্র শাসমলও যখন কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন, এই লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে অবিভক্ত নদিয়ায় এই সাধনা লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করেই প্রথম রাজনৈতিক মামলা রুজু হয় (‘হাই স্ট্রিট রায়টিং কেস’ ১৯২৯)। 

গ্রন্থাগারটি আর দু’বছর পরেই শতবর্ষ অতিক্রম করবে। এটি আমাদের ইতিহাসের ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিহ্ন। এটি যেন ধ্বংস না হয়, সকলেরই সচেষ্ট হওয়া উচিত।

গৌরীশংকর সরকার

গোলাপটি, নদিয়া 

গ্রন্থাগারে

আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকার পোষিত একটি গ্রন্থাগারের কর্মী। এই গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ১১০ দমদম উত্তর বিধানসভার চার্জ অফিসে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। তিনি গ্রন্থাগারে আসতে পারছেন না। ফলে, কোনও কাজকর্ম ঠিকমতো হচ্ছে না। বেশ কিছু বই ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো খাতায় লিপিবদ্ধ না হওয়ায় পাঠক-পাঠিকা এবং কর্মপ্রার্থী বেকার যুবক-যুবতীরা বইগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না।

তা ছাড়া আমাদের গ্রন্থাগারগুলোতে কর্মচারী সংখ্যা দু’জন। গ্রন্থাগারিকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির জন্য প্রয়োজনে একটিও ছুটি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ছুটি নিলেই গ্রন্থাগার বন্ধ হয়ে যাবে। 

এ ছাড়া গ্রন্থাগারগুলোতে রাজ্য সরকারের জনশিক্ষা প্রসার ও গ্রন্থাগার পরিষেবা বিভাগের উদ্যোগে ‘বই ধরো বই পড়ো’ প্রকল্প চলছে। আমাদের এখানে সেটা গ্রন্থাগারিকের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না। 

আমাদের গ্রন্থাগারিক অন্য আরও দু’টি গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের তিনিই প্রধান। তিনি ছাড়া কোনও কাজকর্ম করা সম্ভব নয়। নির্বাচন একটি দীর্ঘ দিনব্যাপী কাজ। প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নির্বাচনী কাজে এত দিনের জন্য ব্যবহার করলে, প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন।

সুপর্ণা চক্রবর্তী

শক্তিসঙ্ঘ পাঠাগার, নিউ ব্যারাকপুর 

জগদীশ গুপ্ত

‘তাঁর লেখা স্বস্তি দেয় না’ (রবিবাসরীয়, ১৩-৪) পড়ে খুশি ও ঋদ্ধ হলাম। প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, লেখক জগদীশ গুপ্তের শেষ জীবন কেটেছে দারিদ্রে। ঠিকই, কিন্তু একটা কথা জানাই, স্বর্গীয় ক্ষিতীশ চন্দ্র গুপ্ত, যিনি সম্পর্কে জগদীশ গুপ্তের ভাই, তিনি তাঁর কলকাতার নিজস্ব বাড়িতে জগদীশবাবুর পাকাপাকি ভাবে থাকার বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন। জগদীশবাবু কুষ্ঠিয়া থেকে শিয়ালদহের মেসবাড়িতে উঠেছেন শুনে, উনি নিজে গিয়ে ওঁকে ওঁর বাড়িতে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লেখকের আত্মসম্মানবোধ এতটাই ছিল যে, ভাইয়ের অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। 

মৃত্যুর কয়েক মাস আগে জগদীশ গুপ্ত ভাইয়ের ১৬ পরাশর রোড বাড়িতে এসে উঠেছিলেন রুগ্‌ণ স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য; কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ওই বাড়িতেই উনি ১৯৫৭ সালের ১৩ এপ্রিল পরলোকগমন করেন।

প্রবন্ধে আরও লেখা হয়েছে, নিঃসন্তান জগদীশ গুপ্ত ‘একটি মেয়েকে’ সন্তানস্নেহে পালন করেছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন সুকুমারী। ‘একটি মেয়ে’ বলে উল্লেখ করলে পাঠকরা প্রকৃত ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন না। মেয়েটি জগদীশ গুপ্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী, সলিলা গুপ্ত। বিয়ের পর তিনি সলিলা গুহ হয়েছেন এবং আজও তিনি জীবিত। 

দক্ষিণ কলকাতার চন্দ্র মণ্ডল লেনে বসবাস করেন। 

সলিলা গুপ্তের যখন মাত্র ৯ মাস বয়স, তখন তাঁর মা মারা যান। জগদীশ গুপ্তের স্ত্রী স্বর্গীয়া চারুবালা গুপ্ত তাঁকে বেশ কিছু কাল সন্তানস্নেহে পালন করেন। পরে অবশ্য তিনি তাঁর বাবার কাছে চলে আসেন এবং যৌথ পরিবারের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় তাঁর দেখভালের অভাব ঘটেনি।

জগদীশ গুপ্ত সম্পর্কে আমার দাদু হতেন। এই সামান্য সংযোজন করার স্পর্ধা দেখালাম লেখকের সঙ্গে আমার নিকটাত্মীয়তার সুবাদে।

অরুণ গুপ্ত

কলকাতা-৮৪

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 

কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।