কুমার রাণার ‘এক দিনমজুরের মার্ক্স’ (৫-৫) প্রবন্ধের জন্য ধন্যবাদ। ভারত প্রসঙ্গে মার্ক্সের চিন্তার যে অংশ নিবন্ধকার উদ্ধৃত করেছেন— ‘‘[ভারতীয়রা] ...আত্মঅবনতির পরাকাষ্ঠারূপে ভক্তি বিগলিত হয়ে বানর কানুমান (হনুমান) ও গাভী সব্বলার (কপিলা) পদতলে হাঁটু গেড়ে বসে।’’— তা পাঠ করে পাঠকের মনে এই দার্শনিক সম্পর্কে এক বিরূপ ধারণা গড়ে উঠতে পারে— মার্ক্স বোধ হয় ভারতীয়দের নিয়ে শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপই করেছেন।

‘নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন’ পত্রিকায় মার্ক্সের তিনটি রচনায় (দ্য ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া, দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি— ইটস হিস্টরি অ্যান্ড রেজ়াল্ট, দ্য ফিউচার রেজ়াল্টস অব ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) ভারত প্রসঙ্গে মার্ক্সের এক বিশেষ পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। ইউরোপীয়ান এনলাইটেনমেন্টের দ্বারা প্রভাবিত মার্ক্স ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের দ্বৈত রূপের কথা বলেন— ধ্বংসাত্মক এবং পুনরুজ্জীবনমূলক। ভারতে বহু শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠিত গ্রামে গোষ্ঠীজীবনকে শিথিল ও তার আর্থিক ভিত্তিকে চূর্ণ করে ইংরেজরা, মার্ক্সের মতে, অজ্ঞাতসারেই ইতিহাসের কাজ সম্পন্ন করেছিল। পরে মার্ক্স নিজেই এই প্রবন্ধগুলিতে প্রকাশিত মতের বিরোধিতা করেন। বিশেষত, ‘এথনোলজিকাল নোটবুকস’-এ মার্ক্স দেখিয়েছেন সমাজ পরিবর্তনে অনুঘটক হিসাবে কাজ না করে, ঔপনিবেশিক শাসন সমাজ পরিবর্তনের ধারাকেই বিকৃত ও পঙ্গু করে।

তাঁর ‘এইট্টিন্‌থ ব্রুমেয়ার’-এ সমসাময়িক ঘটনার চরিত্র উদ্ঘাটনে মার্ক্স যেমন দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, সেই একই দক্ষতায় সিপাহি বিদ্রোহের চরিত্র বিশ্লেষণ করে তিনি এর মধ্যে ভারতবাসীর জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পান।

তাঁর দ্য জার্মান ইডিয়োলজি গ্রন্থে ভারতের জাতিভেদ প্রথা প্রসঙ্গে আলোচনায় সঠিক ভাবেই এই প্রথাকে শ্রম বিভাজনের ফল হিসাবে চিহ্নিত করেন। ক্যাপিটাল গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে ঔপনিবেশিক শোষণের পূর্ণ রূপই তুলে ধরেন মার্ক্স— ভারত থেকে প্রতি বছরে ব্রিটেনে চলে যেত ৫০ লক্ষ পাউন্ড। দাদাভাই নৌরজির ড্রেন থিয়োরি-র সঙ্গে মার্ক্সের মতের সাযুজ্য লক্ষণীয়।

আজকের একমেরু বিশ্বে যখন কেউ কেউ ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’র নিদান দিচ্ছেন, তখনও মার্ক্স সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত একটি মজার কথা হল, সদর দরজা দিয়ে মার্ক্সকে বার করে দিলে তিনি পিছনের জানালা দিয়ে ঢুকে আসবেন। তাঁর পভার্টি অব ফিলসফি গ্রন্থে মার্ক্স দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী উৎপাদনী সম্পর্ক কোনও অনড়, প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, তাকে পাল্টানো যায়। তাঁর ‘প্রিমিটিভ অ্যাকুমুলেশন’ তত্ত্বও এখনও প্রাসঙ্গিক। কৃষককে তার জমি থেকে উৎখাত করেই পুঁজির উদ্ভব। আজও ভারতবর্ষ-সহ বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাদী উন্নয়নের স্বার্থে কৃষক উচ্ছেদ চলছে। মানুষের বন্ধন মুক্তির ও সমৃদ্ধ জীবন গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবিচল বলেই মার্ক্সবাদ আজও সজীব।

শিবাজী ভাদুড়ী

সাঁত্রাগাছি, হাওড়া

সিপিএম এখন

সন্দীপন চক্রবর্তীর ‘নব্বই দিনে নিঃশব্দ বিপ্লব’ (২৮-৪) শীর্ষক প্রবন্ধে যে ভাবে সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলিলের সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। রোজ়া লুক্সেমবার্গ বলেছিলেন, পুঁজিবাদ সব সময় বিকশিত হয়ে সমাজবাদের সুস্থ-স্বাভাবিক পথেই অগ্রসর হয় না, কখনও কখনও তা বর্বরতার পথেও হাঁটতে পারে। বামপন্থী শক্তির দুর্বলতার কারণে সারা দেশে ‘ক্রোনি ক্যাপিটাল’ এবং তার সঙ্গে অতিরিক্ত আমাদের রাজ্যে ‘লুম্পেন ক্যাপিটাল’-এর দাপাদাপি রোজ়ার এই মতকেই তুলে ধরছে।

ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির অভ্যুদয় দেশের ঐক্য ও সংহতির পক্ষে এক গুরুতর বিপদ হিসেবে হাজির হয়েছে। তাই সিপিএম বলে চলেছে, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে সমবেত করে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করা আশু কর্তব্য। ২২তম পার্টি কংগ্রেসে সিপিএম তা পালনে সুনির্দিষ্ট দিশা দেখাতে পেরেছে।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পর্যন্ত পার্টিতে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই জারি ছিল। নেতৃত্বের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য দেখা দেয়। কিন্তু এগুলো সবই তো পার্টিতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের উজ্জ্বল উদাহরণ। মত থাকলেই মতপার্থক্য থাকে। যাদের কোনও মতই নেই, ‘যখন যেমন তখন তেমন’ অবস্থান, তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এ সব প্রশ্ন ওঠেই না।

‘অবশেষে সুবুদ্ধি’ (সম্পাদক সমীপেষু, ৩০-৪) শীর্ষক চিঠিতে লেখা হয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করার কথা বলায় সৈফুদ্দিন চৌধুরীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, অথচ সিপিআইএম নিজেরাই আজ সেই কথা বলছে। প্রথমত, সৈফুদ্দিন চৌধুরীকে পার্টি বহিষ্কার করেনি। কিন্তু পার্টিতে গণতন্ত্র নেই বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন— এমন তথ্য পত্রলেখক কোথা থেকে পেলেন জানলে উপকৃত হব। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সৈফুদ্দিন চৌধুরী নিজেই পার্টির কাছে সম্মানজনক বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন, এবং পার্টি তা মেনে নেয়। যে প্রসঙ্গে এই মতপার্থক্য তীব্র হয়, তা হল ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত প্লেনামে পার্টি কর্মসূচি সময়োপযোগী করার বিষয়টি। ওই বিশেষ অধিবেশনে সমীর পূততুণ্ড-সৈফুদ্দিন চৌধুরী অনেকগুলি সংশোধনী আনেন, যা গৃহীত হয়নি। এই কারণেই তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।

যে সময়ে বিজেপি বিরোধিতায় কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে পার্টির আপত্তির কথা তোলা হয়েছে, সেই সময়ে কংগ্রেস ও বিজেপির পারস্পরিক অবস্থান, আর আজকের পরিস্থিতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও গুজরাত দাঙ্গার পরবর্তী সময়ে, আজ সারা দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি তার দাঁত নখ বার করে হিংস্রতার শিখরে পৌঁছে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। সারা দেশ জুড়ে গেরুয়াবাহিনীর তাণ্ডব চলছে। এখন তাদের শত্রু শুধু মুসলিম খ্রিস্টান দলিত কমিউনিস্টরা নয়, সমস্ত যুক্তিবাদী মানুষ।

প্রতিবাদী চরিত্র এন এম কালবুর্গি, গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশ আক্রান্ত ও নিহত। অমর্ত্য সেন ইরফান হাবিব, রোমিলা থাপার-সহ বিশিষ্ট জনেদের অনেকেই মানসিক ভাবে আক্রান্ত। গবেষক ছাত্র রোহিত ভেমুলা থেকে মুথুকৃষ্ণাণের আত্মহত্যা ঘটেছে। ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রকে ধ্বংস করে জাতীয়তাবাদের এককেন্দ্রিক ধারণাকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই উদ্দেশ্যে চেষ্টা চলছে ইতিহাসকে বিকৃত করার। পরিপ্রেক্ষিত বাদ দিয়ে কোনও সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হয় কি?

স্বপন সিন‌্হা

বনগাঁ, উত্তর ২৪ পরগনা

 

সুন্দরিণী

‘মধুরিণী’, ‘সুন্দরিণী’— প্রয়োগ দু’টি কোথাও দেখা যায় না, কোনও অভিধানেও নেই। অথচ একটি সরকারি প্রকল্পের নাম ‘সুন্দরিণী’, যেখানে সুন্দরবনের মধু-ঘি-ডিম-বাসমতী চাল কেনাবেচার ব্যবস্থা আছে। ৩/৩/২০১৬-তে আলিপুরে ‘সুন্দরিণী বিপণি’র উদ্বোধন হয়। ২৭/৯/২০১৬-তে ১০০ আসনের যে দু’টি কাঠের জলযানের উদ্বোধন হয়েছিল তাদের নাম ‘এম ভি মধুরিণী’ ও ‘এম ভি সুন্দরিণী’। খুদে পড়ুয়ারা পরীক্ষায় ‘মধুর-মধুরিণী’ ‘সুন্দর-সুন্দরিণী’ লিখে বসলে স্যরেরা নম্বর দেবেন?

সুব্রত চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা-১৫০

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়

ভ্রম সংশোধন

• ‘জঙ্গলমহলে হার দুই সভাধিপতির’ সংবাদে (১৯-৫, পৃ ৬) প্রকাশিত হয়েছে পুরুলিয়ার বিদায়ী সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতোর ছেলে বলরামপুর পঞ্চায়েত সমিতির বিদায়ী সহ-সভাপতি সুদীপ মাহাতোও হেরেছেন। তা নয়। সুদীপবাবু আড়াইশোরও বেশি ব্যবধানে জিতেছেন।

• ‘জঙ্গলমহল বিরূপ কেন’ (১৯-৫, পৃ ১) শীর্ষক প্রতিবেদনে চূড়ামণি মাহাতোকে প্রাক্তন মন্ত্রী লেখা হয়েছে। তিনি রাজ্যের বর্তমান অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী।

অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটিগুলির জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।