2 ‘নতুন বাঙালি’ (৩০-১২) নিবন্ধে জহর সরকার বলেছেন, নতুন প্রজন্মের বাঙালি তার ভাষা ও সংস্কৃতির কদর করে না। বিগত বিশ বছরে পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ থেকে অনুপ্রবেশ নিয়ে যে ধারাবাহিকতায় আলোচনা ও বিতর্ক হয়, তার সিকি ভাগ আলোচনাও হয় না ভিনরাজ্য থেকে, বিশেষ করে হিন্দিভাষী প্রদেশগুলি থেকে, জীবিকার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে ছুটে আসা মানুষগুলোকে নিয়ে। অনেকেই পাল্টা বলবেন, বাঙালিও বাইরের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে জীবিকার সন্ধানে। তবে সেটা আলোচনার ভরকেন্দ্র থেকে আমাদের সরিয়ে নিয়ে যাবে। পরিস্থিতি এতটাই বাঙালিদের পক্ষে প্রতিকূল যে, রাজনীতির কারবারিরাও এখন আর ঢাকঢাক গুড়গুড় করছেন না। ছটে ছুটিই হোক বা গঙ্গাসাগর মেলায় সরকারি পৃষ্ঠপোষণা, অসংগঠিত এবং স্বল্পশিক্ষিত বাঙালির যেন নিজভূমে পরবাস। তাই এই প্রজন্মের বাঙালি দেখে আর ঠেকে শিখছে, সরকারি চাকরির প্রত্যাশা করে লাভ নেই। নিজেদের রোজগার ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিজেদেরকেই করতে হবে।

বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে এরা। অদূরদর্শী ইউনিয়ন রাজনীতি সংগঠিত ক্ষেত্রের স্বার্থ সুরক্ষিত করেছে ঠিকই, তবে অসংগঠিত কর্মীদের কথা ভাবেনি। এরাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ। এরাই নতুন মধ্যবিত্ত, নতুন বাঙালি। পাড়ায় পাড়ায় খাবারের দোকান, শাড়ির দোকান খুলেছে এরা। এই প্রজন্মের শিক্ষিত বাঙালির ভাবনাচিন্তা পাল্টেছে। এরা আর ব্যবসাকে অপমানজনক বা অপরাধ ভাবে না। অটো-টোটো চালানো বা মেথরের কাজকেও বাঙালি আর অসম্মানের ভাবে না। বিশ্বায়িত অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে চায় এরা। 

পশ্চিমবঙ্গে বৃহৎ পুঁজির বিনিয়োগ কেন আসছে না, তা নিয়ে নতুন বাঙালির কোনও আক্ষেপ নেই। দিবারাত্র কাজ করতে চায় এরা। এরাই নতুন যুগের রানার। এরা মল কালচার, স্মার্টফোন, ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, মোবাইল রিচার্জ, ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত। এরা পাড়ার মোড়ে বা রকে আড্ডা দেয় না। কাজ আর কামাই নিয়েই এদের যাবতীয় ভাবনা। বাঙালি অলস, কর্মবিমুখ, আড্ডাপ্রিয়— এই অপবাদ তারা মুছে দিয়েছে। কোনও আপত্তি আছে কি কারও, যদি এদের ডিনারে বিরিয়ানি বা হাত-রুটি আসে, বা সান্ধ্য-আড্ডায় চা-বিস্কুট, অমলেটের জায়গা নেয় জল বা সোডা? 

প্রবন্ধকার অভিযোগ করেছেন, নতুন প্রজন্মের বাঙালি তার ভাষা ও সংস্কৃতির কদর করে না। কথাটা সত্য না অসত্য, এই সময়ে দাঁড়িয়ে বলা যাবে না। বাঙালি এখন অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। আগ্রাসনই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ পন্থা, এমনটাই বলা হয়। তাই নতুন প্রজন্মের বাঙালি কিছুটা অত্যুৎসাহী হয়েই যেন হিন্দি সংস্কৃতি আমদানি করছে কি না, তার জবাব সময় দেবে। সে বুঝে গিয়েছে, এই বিশ্বায়িত বাংলায় একটাই ভাষা। তার নাম হিন্দি। তাই স্বচ্ছন্দে হিন্দিতে কথা বলা রপ্ত করছে সে। বেঁচে থাকার তাগিদে। অবাঙালিরা তাদের কথায় বাংলা টান ধরে ফেললেও, তাতে এই নতুন বাঙালির কিছু যায় আসে কি? কল সেন্টার, ব্যাঙ্ক, শপিং মল, অ্যাপ ক্যাব, হকার স্টল, জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, আমাজ়ন-এর হয়ে লাস্ট মাইল জব— এদের কাজ বন্ধ হবে কি?

বাঙালি সময়ের সঙ্গে চলতেই স্বচ্ছন্দ। যেমন কলি, তেমনি চলি। ইংরেজ আমলেও যা ছিল সত্য, এখনও তাই। তখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজি শিখে নিত, ইংরেজদের অধীনে কেরানিবৃত্তি করার দুর্মর তাগিদে। সেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে, তার থাকত কৃপণের আসক্তি, প্রেমিকের প্রীতি নয়, এমনটাই বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দায় বাঙালি এদের উপর চাপিয়েছিল কি? ইতিহাস কী বলে? নবজাগরণের নায়কদের জন্য আসন তবে পাতা হবে কোথায়? 

রাস্তার দোকান থেকে, ছোট ব্যবসা থেকে নিজেদের ভাগ্যই শুধু এরা বদলায়নি, আন্দোলনের রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিবর্তন'-এর ভগীরথ এরাই। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান রাজনীতির প্যারাডাইম শিফট এখানেই। বাম রাজনীতির আশ্রয় ছিল সংগঠিত ক্ষেত্র। বর্তমান শাসক অসংগঠিত ক্ষেত্রে তার শিকড় ছড়িয়ে যাচ্ছে। এর পরেও যদি ডিএ-র দাবি না মেটে বা পে-কমিশন কেন বিলম্বিত হচ্ছে, এই দাবি ওঠে, বুঝতে খুব অসুবিধা হবে কি ক্রমশ আরও সংখ্যালঘু হচ্ছে সংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা?

কলকাতায় বাঙালি সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। লেখক নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই অনুভব করেছেন, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ-সহ বাংলার সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব নিয়ে অবশিষ্ট ভারতের কোনও মাথাব্যথা নেই। মুক্তিবেগের খোঁজে যে সমস্ত বাবা-মা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেছেন, সচেতন ভাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্পর্শ এড়িয়ে চলতে চাইছেন, তাঁদের বিরূপ সমালোচনা না করে, তাঁদের পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। নতুন বাঙালিরা সর্বভারতীয় স্তরে অবশিষ্ট ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতার উন্মুক্ত ক্ষেত্রে শিং-এ শিং দিতে চায়। হিন্দি আর ইংরেজিকেই অবলম্বন করে বাঙালির বিজয়রথ অপ্রতিরোধ্য রাখতে চায়। এদের কাছে আশা করা অন্যায়, এরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হবে। ভাল লাগছে এটা ভেবে যে, এরা নিজের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে পুরোমাত্রায় সচেতন। তাই সীমিত সামর্থ্যে লক্ষ্যপূরণে মরিয়া এরা। সব দিক বজায় রাখা সম্ভব নয়। এক দিকে নিজের জীবনকেও জাগতিক সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যাব, আবার একই সঙ্গে নিজের কৃষ্টি আর সংস্কৃতিরও নিরলস সেবা করে যাব— দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।

বাঙালির এই নতুন প্রজন্ম ‘সংস্কৃতিমান বাঙালি’ হওয়ার আদেখলেপনা যে দেখায় না, এটাই তাদের নির্ভেজাল সততা। জীবনানন্দের কবিতাপাঠে বা রবীন্দ্রসঙ্গীতে এদের কোনও আগ্রহ না থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়? জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে চলছে দুরন্ত প্রতিযোগিতা। লেখকের মতে, নিজেদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি নিয়ে এরা আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে। কথাটা একেবারেই ঠিক নয়। এদের লক্ষ্য ‘সব পেতে হবে’। লক্ষ্যের অভিমুখ নিয়ে এদের নিজের মধ্যে কোনও দোলাচল নেই। এরা জানে ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির বাহকরা ঠিকই বাঁচিয়ে রাখবে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। নতুন বাঙালির এই চিন্তাভাবনার স্বচ্ছতা সত্যিই কুর্নিশযোগ্য।

পার্থ প্রতিম চৌধুরী
কোন্নগর, হুগলি

সূক্ষ্ম আবেগ নয়

2 বাঙালি বা যে কোনও জাতিকেই কোনও নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে বিচার করা শোভন হবে না। একটি জাতির স্বভাব বা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য এবং সময়বিশেষে তার পরিবর্তনের পিছনে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক কারণাবলির গুরুত্ব অপরিসীম। বেঁচে থাকার তাগিদে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যদি নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-বিচারের বিষয়ে যথেষ্ট মনযোগী না থেকে অপরাপর সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট হয়, তবে কি তাদের দোষ দেওয়া যায়? জৈবিক ধর্মের প্রথম মন্ত্রই যেখানে নিজেকে বাঁচানোর, তখন সূক্ষ্মতর চিন্তায় ভাবাবেগাপ্লুত হয়ে পিছনে পড়ে থাকা শুধু বোকামিই নয়, আত্মঘাতও বটে! নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে সকলেই গর্বিত হতে চায়। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি সময়বিশেষে এর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষিত হলে জীবিকার বাজার যে সীমিত ও সঙ্কুচিত হবে, তাতে তো দ্বিমত নেই। সে তুলনায় ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিতরা বহুগুণ বড় পরিসর পাবে। সারা দেশে ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকরির যে ক্লিষ্ট অবস্থা, তাতে শিক্ষিত কর্মক্ষম যুবশ্রেণির বহুলাংশকেই জীবিকার জন্য ভিন্নতর পথ বেছে নিতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এটা বোঝে এবং এ কারণেই নানাবিধ ছোটখাটো স্বনির্ভরতা প্রকল্পে এবং বিভিন্ন ব্যতিক্রমী পেশা অবলম্বন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। যা কিনা অদূর অতীতে কেউ ভাবতে পারত না। এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ যে, বাঙালি ছেলেমেয়েরা আজকাল কাজের কৌলীন্যকে বিচার্য বিষয় না করে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজের গুণগত মানকেই বিচার করছে।
শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য
কলকাতা-৫৫