‘আরো কত ছোটো হব ঈশ্বর’ (২-৬) নিবন্ধে বিভাস চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‘...শাসক বিদ্বজ্জনদের কেয়ারই করে না,...।’’ কেয়ার করবে কেন? শাসক জানে, বিদ্বজ্জনদের ক্ষমতা সীমিত। তাঁরা রাজনীতিগত ভাবে অস্পষ্ট এবং সে কারণে দুর্বল। দলীয়তা এড়াতে বিদ্বজ্জন তথা বুদ্ধিজীবীরা তথাকথিত নিরপেক্ষতার কথা বলেন, রাজনীতি, সংগঠন ইত্যাদি বিষয় এড়িয়ে চলেন। এ-ও ঠিক, শাসকের রেজিমেন্টেড সত্তার সামনে তাঁদের অসহায়তাই ফুটে ওঠে। বিরোধী কোনও স্বরকে নস্যাৎ করতে, দল এবং প্রশাসনকে সুকৌশলে ব্যবহার করে শাসকেরা। কাজেই শাসক বনাম মেধাজীবীদের লড়াই অসম প্রকৃতির হতে বাধ্য।

এ রাজ্যের সিভিল সোসাইটির আন্দোলন যে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না তার কারণ কী? কারণ, রাজনীতি, সংগঠন সম্পর্কে আন্দোলনকারীদের অনীহা, ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেই তাঁরা অভ্যস্ত। গ্রাম-শহরের প্রতি প্রান্তে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ুক, এমন কথা কি তাঁরা ভাবেন? মনে হয় না। তার ওপর শাসকের সঙ্গে আছেন সরকার পক্ষের মেধাজীবীরা। তাঁরা শাসকের গুণ গাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক। আর শাসকবিরোধী মেধাজীবীরা কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদে সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ করলেই নানা কূট প্রশ্ন এসে সে প্রয়াসটিতে যে জল ঢেলে দেয়, বিভাসবাবু এ অভিজ্ঞতার কথা নিজেই লিখেছেন।

সংস্কৃতি-চর্চা প্রসঙ্গে আসা যাক। কবিতা, গান, নাটক নিয়ে আমাদের গর্ব আছে, কিন্তু সমাজে তার প্রভাব কতটুকু? এ সব তো নিছকই ভদ্রলোক-সমাজের শৌখিন কালচারের বিষয়, শিক্ষিতদের সংস্কৃতি সম্পর্কে নিচুতলার মানুষের কোনও আগ্রহও নেই। তাঁরা চটুল নাচগান, নীল ছবি, পরব-পুজো ইত্যাদিতে মজে থাকেন। ভদ্রলোক জীবনের কালচার নিম্নবর্গের জনজীবন থেকে শত যোজন দূরে, দুইয়ের কোনও যোগ নেই। কম লেখাপড়া জানা মানুষ শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়েন না, রবীন্দ্রসঙ্গীতে মজেন না, অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখেন না। এ সময়ের ভদ্রলোক শ্রেণিও অনেকাংশে সিরিয়াস সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তা মূলত উপভোক্তা-সমাজ বলেই পরিচিত, বিনোদনসর্বস্ব কালচারে মজে থাকাটাই ধ্যানজ্ঞান।

ফিলিস্তিনের পয়গম্বরতুল্য কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা শুনতে সমাজের হাজার হাজার মানুষ দামাস্কাস বা কায়রোতে জড়ো হন, এ রাজ্যে কি এমন সমাবেশ সম্ভব? যদিও এমন সমাবেশ অতীতে এ রাজ্যেও হয়েছে। কবি উৎপলকুমার বসু তাঁর বইতে লিখেছেন দিনহাটার কথা, যে শহরে এক বার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা শুনতে টিকিট কেটে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার লোক। কবিতার আসরে এ সময়ে মানুষের এমন ঢল নামানো যদি সম্ভব হত, উটকো সংস্কৃতির মাতব্বরদের যোগ্য জবাব দেওয়া যেত। রাজনীতিগত ভাবেই এর মোকাবিলা করতে হবে, নয়তো গোল্লায় যাওয়া সংস্কৃতির দাপট কমবে না। সমস্যাটি আদতে রাজনৈতিক, এ কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

শিবাশিস দত্ত  কলকাতা-৮৪

 

কে বলেছে?

বিভাসবাবুর প্রবন্ধের মূল বিযয়বস্তু শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে কোনও বিতর্কে যেতে চাই না, কারণ উনি বড় মাপের মানুষ। কিন্তু ওই প্রবন্ধের প্রথম দিকে বিভাসবাবু লিখেছেন, ‘‘তাঁর (অর্থাৎ শঙ্খবাবুর) একটি প্রশংসাসূচক মন্তব্য বা বাক্য থিয়েটারের বিজ্ঞাপনে প্রকাশ করতে পারলে ধন্য বোধ করেছে নাট্যদলগুলি।’’ বিভাসবাবুকে কে বলেছেন যে পশ্চিমবাংলার সকল নাট্যদল তাদের প্রযোজনা সম্পর্কে শঙ্খবাবু বা অন্য কোনও জনের একটা প্রশংসাসূচক মন্তব্যের আশায় বসে আছে! এটির দরকার হয় কলকাতার কিছু নাট্যদলের। যাদের নাটকের জোর নেই, দলগত অভিনয়ে নেই মুনশিয়ানা, আছে শুধু প্রচারের ঢক্কানিনাদ। এক জন অভিনেতাকে নিয়ে কুড়িটা নাট্যদলকে টানাটানি করতে হয়, কারণ তাদের নিজেদের দলের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এতটাই নড়বড়ে যে তাঁদের উপর ভরসা করে প্রযোজনা নামানো যায় না। কোনও রকমে নতুন নাটকের দশটা মঞ্চায়ন হলেই পরের প্রযোজনা নামাতে হয়। তাই বিজ্ঞাপন ছাপতে, হলে দর্শক টানতে তাদের লাগে প্রতিষ্ঠিত মানুষের প্রশংসাসূচক মন্তব্য, যাতে প্রযোজনা কয়েকটা দিন চালানো যায়, দিল্লিকে খুশি করে নানা রকম আর্থিক সহায়তা আদায় করা য়ায়।

কিন্তু আমরা যাঁরা কলকাতার বাইরে থেকে নাট্যচর্চা করি, সেই মফস্সলের নাট্যদলের নাটকের যে জোর, নিজেদের সংস্থার অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে দলগত অভিনয়ের যে উচ্চ মান, তা দিয়ে বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বছরে চল্লিশটা প্রযোজনা মঞ্চস্থ করি, নানা রকম অসুবিধার কারণে আরও খানদশেক ‘শো’ ছেড়ে দিতে হয়। আমাদের কিন্তু বিখ্যাত মানুষদের প্রশংসাসূচক মন্তব্য খুঁজতে হয় না, সংবাদপত্রের সহযোগিতাও লাগে না। প্রযোজনার গুণেই দর্শকরা ভিড় করে নাটক দেখতে আসেন।

অনির্বাণ চক্রবর্তী  কলেজ রোড, হুগলি

 

হারল কেন

‘জঙ্গলমহল বিরূপ কেন’ (১৯-৫) প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনে ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া জেলার পশ্চিম প্রান্তে জঙ্গলমহল এলাকায় তৃণমূলের বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: এই সরকারের রাজত্বে জঙ্গলমহলে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও তৃণমূল হারল কেন? বিজেপির এত বাড়বাড়ন্ত কী করে হল? তৃণমূলের এই পরাজয়ের মূল কান্ডারি কিন্তু বিজেপি নয়। তৃণমূল হেরেছে নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নেতানেত্রীদের উচ্চ অহং, আকণ্ঠ দুর্নীতি, জেলায় শিক্ষিত ও যোগ্য ছেলেমেয়ে থাকতেও তাঁদের বঞ্চিত করে মেদিনীপুর বাঁকুড়া বীরভূম থেকে অযোগ্য ছেলেমেয়েকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এনে চাকরিতে নিয়োগ করা, স্থানীয় শিক্ষিত বেকারদের খেপিয়ে তোলা, কুর্মালি সমাজকে স্বীকৃতি দিয়েও তাঁদের দাবি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা— এই সব কারণে। এক শ্রেণির ভোটাররা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘নেগেটিভ’ ভোট দিয়েছেন। বিজেপির কৃতিত্ব নেই।

তপন কুমার বিদ  বেগুনকোদর, পুরুলিয়া

 

তাঁদের ভাষা

জঙ্গলমহলের আদিম জনগোষ্ঠীই হল সংখ্যাগরিষ্ঠ, ফলে এঁদের ভোটেই সরকারের পট পরিবর্তন হয়, যা অতি সম্প্রতি পঞ্চায়েত ভোটে ঘটে গিয়েছে। শোষণ প্রতিরোধের শক্তি এঁদের নেই বললেই চলে, তাই চুপচাপ এঁরা মার খান। গোপনে ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই প্রতিবাদ করেন। এই জনগোষ্ঠীগুলির নিজ নিজ ভাষা আছে, কিন্তু আজ সেগুলি বিপন্ন, অবহেলিত। এঁদের ধর্মীয় স্থানগুলিও আজ মুছে যেতে বসেছে, সেই সব জায়গায় গড়ে উঠেছে বড় বড় অট্টালিকা। সাহিত্য, নৃত্য, সঙ্গীত, কাব্য, নাটক— সবই এঁদের আছে। কিন্তু সরকারের স্বীকৃতি নেই। আজ পর্যন্ত কোনও জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ বঙ্গভূষণ, বঙ্গবিভূষণ বা এই ধরনের কোনও পুরস্কার পাননি। অতি সম্প্রতি সাঁওতালি ভাষার বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার এক জন অ-সাঁওতাল বঙ্গভাষী ভদ্রলোককে দেওয়া হয়েছে। পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের ৮০ শতাংশ মানুষই হলেন কুর্মি মাহাতো এবং এঁদের কুর্মালি ভাষা অতি সমৃদ্ধ। এই ভাষার উন্নতির জন্য আন্দোলন দীর্ঘ দিনের, কিন্তু কোনও ফল হয়নি।

জ্যোতি লাল মাহাত  পারা, পুরুলিয়া

 

সেরা শব্দ

২০১৭ সালের সেরা শব্দ যদি হয় ‘আধার’ (‘মিত্রোঁ’ এবং আরও কিছু শব্দকে পিছনে ফেলে), তবে ২০১৮-র পশ্চিমবঙ্গে সেরা বাংলা শব্দ নিশ্চয় ‘উন্নয়ন’!

তন্ময় মুখোপাধ্যায়  বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়