‘হোমো ফেরোশাস’

অমূল্য মস্তিষ্ক-সম্পদের ব্যবহার মনুষ্যজাতির মৃত্যুকে বিলম্বিত করে আয়ুষ্কাল প্রলম্বিত করে চলেছে, আর তারই ফলে আজ আমরা অভূতপূর্ব জন-বিস্ফোরণের সম্মুখীন। উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রে প্রায় ১৬০-১৭০ কোটি মানুষ বসবাস করছি এবং বিপুল ভাবে বৃদ্ধি লাভ করে চলেছি। এই জনগোষ্ঠীর চাপে প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত নিঃশেষিত হচ্ছে।

উপযুক্ত প্রতিপালকহীন কোটি কোটি মানবসন্তান শৈশবে দোকানে গৃহস্থগৃহে কলকারখানায় শ্রমদানে বাধ্য হয় এবং কালক্রমে জঠরের জ্বালায় ও যৌনতাড়নায় মারমুখী হয়ে ওঠে। জীবিকার জন্য চুরি ডাকাতি তোলাবাজি জাতীয় লুটমারিতে বাধ্য হয় এবং পরিশেষে ধান্দাবাজ রাজনীতিকদের খপ্পরে পতিত হয়ে ব্যবহৃত হয় ও লুম্পেন নামে অভিহিত হয়। এদের সঙ্গে অভিযোজন ঘটাতে সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষকেও অমানবিক হয়ে পড়তে দেখা যায়।

এই অবস্থায় উপনীত হয়ে বিশ্বের প্রাণিকুলের মধ্যে জীবনসংগ্রামের যে তীব্রতা দেখা যায় এবং যোগ্যতমের উদ্‌বর্তন ঘটে, সেই সময় প্রায় সমাগত। এ-স্থলে ‘যোগ্যতম’ তারাই, যারা ছলে-বলে-কৌশলে জীবন-জীবিকার উপাদান সংগ্রহে সক্ষম। এই পথগুলি আমাদের প্রচলিত মানবিক মূল্যবোধগুলির পরিপন্থী, কারণ, ওই মূল্যবোধগুলি সমাজের বিকাশধারার যে পর্যায়ে রচিত হয়েছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিত বর্তমানে অনুপস্থিত। এখানে মাতা বা পিতা সন্তানকে অনায়াসে হত্যা করে— বিপরীত ঘটনা তো অহরহ ঘটেই চলেছে। খুন-ধর্ষণ ক্রমবর্ধমান। এ-সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে প্রচারমাধ্যম তারস্বরে আর্তনাদ জুড়লেও সাধারণ মানুষ এখন অভ্যস্ত, সংবাদ শিরোনাম দর্শনে চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যায় না। চিন্তা করতেও ভয় হয়, বিবেক-বর্জিত এক নররূপী প্রজাতির আবির্ভাব হয়তো অত্যাসন্ন। বিজ্ঞানীকুল এই অপরাধীদের জিন ম্যাপিং-এ হয়তো গুরু-মস্তিষ্কের পরিবর্তন লক্ষ করবেন। নব প্রজাতির নামকরণ কি ‘হোমো ফেরোশাস’ (Homo Ferocious)’ হবে?

অনিলকিশোর ভট্টাচার্য

বুনোকালিতলা, হুগলি

ধর্ম বুঝতে

অরিন্দম চক্রবর্তীর ‘ধর্মরক্ষার মানেটা বুঝতে হবে’ (১০-১) শীর্ষক নিবন্ধের প্রেক্ষিতে কৃষ্ণ ঘোষের চিঠিটি (‘ধর্মরক্ষা’, সম্পাদক সমীপেষু, ২৩-১) পড়ে মনে হল, অরিন্দমবাবু ধর্মের, বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে ধর্মাচরণের নৈতিক দিকটিকে যে ভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, চিঠি-লেখক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অবসানকামী বলে নিজেকে দাবি করতে গিয়ে তার সূক্ষ্মতা অনুধাবন করতে পারেননি। ‘প্রকৃত ধার্মিক’ আর ‘প্রকৃত চোর’ এই দুটিকে তিনি কীভাবে এক মানদণ্ডে বসালেন তাও বোধগম্য হল না। নৈতিকতার যে পঞ্চমহাব্রতের কথা বলা হয়, ‘অস্তেয়’ তার মধ্যে অন্যতম, সুতরাং ‘চৌর্যবৃত্তিকেও রক্ষা করা যায়’— এই যুক্তি কখনওই দাঁড়ায় না, যতই ‘প্রকৃত’ বিশেষণটির মানদণ্ডকে প্রসারিত করা যাক না কেন। তাই অরিন্দমবাবুর ধর্মদর্শিতায় টাল খেয়েছে বলে লেখক যে অভিযোগ করেছেন,
তা সারবত্তাহীন।

অরিন্দমবাবুর নিবন্ধে প্রাধান্য পেয়েছে পরমতসহিষ্ণুতা, অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, যা কোনও ধারণা উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়াকে বিরোধিতা করে। বিধর্মীরা আমার ধর্মকে আঘাত করছে— এই উন্মাদনা থেকে দূরে থাকতেও পরামর্শ রয়েছে নিবন্ধে। বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনকে আমরা স্মরণ করতে পারি, যিনি ধর্মের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দান, শীল এবং ক্ষমা, এই তিনটি গুণের অনুশীলনের কথা বলেছেন। এই আদর্শের কথাই তো প্রতিফলিত হয়েছে অরিন্দমবাবুর নিবন্ধে। এর মধ্যে পত্রলেখক বাকছলনা খুঁজে পেলেন কীভাবে? ধর্মবিরোধী হলে কি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির পক্ষে তা মঙ্গলজনক হত?

অধার্মিক হলে যে পৃথিবী আরও বেশি বাসযোগ্য হবে তার তো নিশ্চয়তা নেই। তাই ধর্মরক্ষা করতে গেলে অন্য ধর্ম, সংস্কৃতি, ধর্মতত্ত্বকে জানার আগ্রহ থাকতে হবে এবং নিজের ধর্মের মানুষের অন্যায়কে সমালোচনা করতে হবে।

পত্রলেখক এ-ও বোঝাতে চেয়েছেন, দর্শনশাস্ত্র হল— যে কোনও বিষয়কে জটিল ভাবে ভাবার বিলাসিতা। দর্শনের ছাত্র হিসাবে এটুকু বলতে পারি, বিষয়ের গভীরে গিয়ে চিন্তার জটিল সুতোগুলোকে জট ছাড়িয়ে বিষয়টির প্রকৃতিকে যতটা সম্ভব ভাল ভাবে উপলব্ধি করার চর্চাই দর্শনশাস্ত্র, জটিলতা বাড়ানো নয়।

পূর্বায়ন ঝা

গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, মালদহ

 

‘সংস্কৃতি’

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার (‘ভাষাচার্য সুনীতিকুমার’, পত্রিকা, ৩০-১২) প্রতিক্রিয়ায় বেশ কয়েকটি পত্র প্রকাশিত হয়েছে (৪-১), যেগুলির মধ্যে দেবীদাস মণ্ডলের বক্তব্যটি (‘ইংরাজি culture অর্থে বাংলা ভাষায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি এখন বহুল ব্যবহৃত। এটি সুনীতিকুমারের অবদান’) সম্ভবত সম্পূর্ণ ভাবে ঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে সুনীতিকুমার স্বয়ং তাঁর সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস বইতে (প্রকাশক: জিজ্ঞাসা, কলকাতা, চতুর্থ প্রকাশ, জানুয়ারি ২০০৩, পৃষ্ঠা ৭) ‘সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে (এটি বাংলা ১৩৫৩ সালে ‘সোনারবাংলা’ শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয়) যা লিখেছেন তা এই রকম:

‘কৃষ্টি’ শব্দটিকে অর্থের দিক থেকে culture-এর প্রতিরূপ শব্দ মনে করে বাংলায় ব্যবহার করা হতে থাকে বোধহয় গত তিরিশ বছরের ভিতরে। রবীন্দ্রনাথ ‘কৃষ্টি’ শব্দটি সম্বন্ধে একটু অস্বস্তিতে ছিলেন...

‘...সংস্কৃতি শব্দটি culture বা civilisation অর্থে আমি পাই প্রথমে ১৯২২ সালে প্যারিসে আমার এক মহারাষ্ট্রীয় বন্ধুর কাছে। culture-এর বেশ ভালো প্রতিশব্দ বলে শব্দটি আমার মনে লাগে। আমার বন্ধু শব্দটি পেয়ে আমার আনন্দ দেখে একটু বিস্মিত হন— তিনি বললেন যে তাঁরা তো বহুকাল ধরে মারাঠী ভাষায় ঐ শব্দ ব্যবহার করে আসছেন। ১৯২২ সালে দেশে ফিরে এসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করি। ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তিনি আগে থাকতেই এই শব্দটি পেয়েছিলেন কিনা জানি না— সম্ভবতঃ শব্দটি তাঁর অবিদিত ছিল না। তবে আমার বেশ মনে আছে culture এর প্রতিশব্দ হিসাবে ‘সংস্কৃতি’ শব্দ সম্বন্ধে তিনি তাঁর পূর্ণ অনুমোদন জ্ঞাপন করেন, ‘কৃষ্টি’ শব্দ আর ব্যবহার করা ঠিক হয় না, এ কথাও বলেন।’

এই অনুচ্ছেদটি থেকে বড় জোর সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে যে ভাষাচার্য ‘সংস্কৃতি’ শব্দটিকে মরাঠি থেকে চয়ন করে এনেছিলেন। কিন্তু যে শব্দটি বাংলা ভাষায় সুনীতিকুমারের মৌলিক অবদান হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে, তা হল ‘সরণি’। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক তাঁর নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি, ১৯৬০ দশকের
প্রথম দিকে, রাস্তা বোঝাতে তৎকালীন প্রচলিত ইংরিজি শব্দ road, street প্রভৃতির পরিবর্তে সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত ‘সড়ক’, ‘মার্গ’, ‘পথ’ ইত্যাদিকে গ্রহণ না করে, ‘সরণি’ শব্দটি পশ্চিমবঙ্গে প্রচলন করে।

অরিন্দম ঘোষ

আত্রেলে-আউট, নাগপুর

 

রূপশ্রী

‘রূপশ্রীর ফাঁদে’ (৩-২) একটি সুচিন্তিত সম্পাদকীয়। মেয়েদের শিক্ষা সহায়তায় কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বের দরবারে অভিনন্দিত, কিন্তু সেই অগ্রগামী মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ না দিয়ে ১৮ বছর হলেই বিয়েতে সরকারি উৎসাহ বা সহায়তা দেওয়ার যে ভাবনা রূপশ্রী প্রকল্পে নিহিত, তা পশ্চাৎপদ মানসিকতার পরিচয়। সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়াবার জন্য রূপশ্রী অনুদান মেয়েদের দুর্বল করবার একটি পথ। প্রায় পণের তুল্য এই অনুদান মেয়েদের পক্ষে সম্মানের নয়, এতে আঠারো বছর বয়স হলেই পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের চাপ আসবে। কন্যাশ্রীর সুবাদে চোখ খুলে যাওয়ার পর, মেয়েরাই রূপশ্রী ফিরিয়ে দিক, এ যে মেয়েদের অবমাননা।

আনন্দময়ী মুখোপাধ্যায় ‍

কলকাতা-৭৪