সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমরেড, নবযুগ আনলে না?’ (১-১২) শীর্ষক নিবন্ধ পড়ে মনে হল, বাম আমলে বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিস্তারে যথেষ্ট হয়নি, অথবা সরকারি ঘেরাটোপে বিজ্ঞান আন্দোলনকে বেঁধে ফেলায় গণবৈজ্ঞানিক চেতনা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি— তিনি যদি এইটুকুই বলতেন, বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের কারণ থাকত না। কিন্তু তিনি জুড়ে দিয়েছেন বিজেপির (এবং সাম্প্রদায়িকতার) উত্থানের বিষয়টি, যেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। এটা সম্ভবত অতিসরলীকরণ যে শুধু বিজ্ঞান-শিক্ষার বিস্তার সাম্প্রদায়িকতা আটকাতে পারে। 

হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে কট্টরতম নেতা যিনি, সেই গোলওয়ালকার ছিলেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এসসি এবং বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র। আরএসএস-এর চতুর্থ সরসঙ্ঘচালক রাজেন্দ্র সিংহ ছিলেন সিভি রামনের ছাত্র এবং ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌতবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান। মুরলী মনোহর জোশী ভৌতবিজ্ঞানে ডক্টরেট এবং ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষক। ইসরো-র ২০০৩ থেকে ২০০৯-এর প্রধান, ‘চন্দ্রযান-১’-এর নায়ক মাধবন নায়ার, কেরল বিজেপির অন্যতম নেতা। এ ছাড়াও বিজ্ঞান শাখায় উচ্চশিক্ষিত এবং বিজেপি-আরএসএস-এর উচ্চপদ আলো করে আছেন, এই ধরনের মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। 

যদি বিজ্ঞান শিক্ষাই বিজেপি রোখার দাওয়াই হত, তা হলে জেএনইউ-তে এবিভিপি-র সমর্থন সব থেকে বেশি ‘সায়েন্স স্কুল’ কেন? (কেন এই রকম, তার একটা গভীর পর্যালোচনা করেছেন সীমন্তি কৃষ্ণণ 'The Wire'-এর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬-র সংখ্যায়)। আর এও সত্য, সাম্প্রদায়িক চেতনা, বা মেরুকরণ সব থেকে বেশি প্রভাবিত করে বিজ্ঞান-শিক্ষিত শহরের মধ্যবিত্তকে। তুলনায়, গ্রামীণ মানুষ, তাঁরা যতই কুসংস্কারচ্ছন্ন হোন, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করা কঠিন। ভাতের লড়াইটা রোজ লড়তে হয় তাঁদের, ধর্মের লড়াই লড়বেন তাঁরা কখন? 

আজ দিল্লিতে যে কৃষকরা গলা ফাটাচ্ছেন ‘‘অযোধ্যা চাই না, ঋণ মকুব চাই’’, তাঁদের বেশির ভাগের হাতেই সুতো, আঙুলে সস্তা আংটি, গলায় মাদুলি আছে। সন্দেহ নেই, এটা বিজ্ঞানচেতনার অভাব, এবং এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম দরকার। 

কিন্তু এইটা বিশ্বাস করা খুব শক্ত, যে জনৈক আইআইএসসি-র অঙ্কের অধ্যাপক নানা কাগজে এই সকল কৃষকদের মুন্ডুপাত, আর মোদী সরকারের স্তুতি করছেন— তিনি বিজ্ঞানমনস্ক বলে অসাম্প্রদায়িক বা বিজেপি বিরোধী। 

অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত

কলকাতা-১০২

কমরেডের মন্ত্র

মার্ক্সবাদ সর্বশক্তিমান, এ ধরনের আপ্তবাক্যের ঘোষণা কিংবা প্রচারের ঝোঁকটাই তো অবৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞান তো ফলিত কোনও বিষয়, যা যুক্তি এবং একান্ত ভাবে প্রমাণনির্ভর— বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্ব বা বিষয়কে বোঝাতে কোনও সিলমোহর লাগে না। বামপন্থীরা এ যুক্তি অস্বীকার করবেন কেমন করে?

বাম আমলের মফস্সলের এক যুবকের কথা বলি। কারখানায় কাজ করতেন, আবার পুরোহিতগিরিও করতেন। আশির দশকের মাঝামাঝি। এক বার এক বামপন্থী যুবকের বিয়েতে পুরোহিত হয়ে হাজির হলেন। বর বিয়ের পিঁড়িতে বসে পুরোহিতকে বললেন, ‘‘আমি কিন্তু মন্ত্র পড়ব না। আপনি আপনার মতো মন্ত্র বলে যান। আমাকে মন্ত্র বলতে বাধ্য করবেন না।’’ পুরোহিত আত্মবিশ্বাস-সহ বলেন, ‘‘বুঝেছি। চিন্তা করবেন না, আমিও সিটু করি। এ হাতে কত কমরেডের বিয়ের অনুষ্ঠান পার করলাম।’’ গড় বাম মানসিকতা এমন দ্বৈততার চরিত্র মেনেই গড়ে উঠেছে।

কুসংস্কার তো ইউরোপ-আমেরিকার এক শ্রেণির লোকের মধ্যেও আছে, আমরা তবে সমস্যায় এমন জেরবার হই কেন? কারণ, সে সব দেশে এ সমস্যা থাকলেও, বিজ্ঞান এবং কুসংস্কার একই মনে অবস্থান করে না।

শিবাশিস দত্ত

কলকাতা-৮৪

 

কিছু অভিজ্ঞতা

দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক বিজ্ঞান আন্দোলনের অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতে পারি, আমাদের মতো হাজার হাজার মুক্তমনা-বিজ্ঞানমনস্ক-ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের মনের কথা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেছেন। 

আমরা যারা বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ও আন্দোলনে তার প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছি, পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি শাসক বামপন্থীদের কাছ থেকে। সামান্য নীরব সমর্থন তো দূরের কথা, সরব বিরোধিতাই পেয়েছি।

মনে পড়ে, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের থানায় কালীপুজো হবে কেন সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন (পরে এ ব্যাপারে তাঁর নীরবতায় অবাক হই), তার কিছু দিনের মধ্যে, নব্বইয়ে দশকের শেষ দিকে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অনুদানে চলা বিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজোর মতো যে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই রাজ্যের এক প্রধান শিক্ষিকা। যা ছিল যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা তথা দেশের সংবিধানের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা। বিরোধিতা এসেছিল নানান পক্ষ থেকে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তৎকালীন স্থানীয় বামপন্থী সাংসদ প্রধান শিক্ষিকার সেই কাজের বিরোধিতা করে খবরের কাগজে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তা হতাশাজনক। 

আমাদেরই এক শিক্ষক বন্ধু-দম্পতি ভিন্ন ধর্মে বিবাহ করায়, তাঁদের জীবনসংশয় হয়েছিল সমাজের নীতিপুলিশদের খবরদারিতে। নীতিপুলিশদের মধ্যে তাঁদেরই সহকর্মী বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনের কিছু মানুষও ছিলেন।

আমরা দেখেছি, পার্টি কমরেডরা কী ভাবে পার্টি অফিসে বসে বস্তুবাদের চর্চা না করে, ভোট আর বস্তুগত সম্পদ ও অর্থ আমদানির কৌশল রচনা করেছেন। গণ-সংযোগের অছিলায় ধর্মের আঙিনায় ভিড়ে গিয়ে জনগণকে পাল্টানোর বদলে নিজেরাই পাল্টে গিয়েছেন ভাববাদী আমজনতা হয়ে। 

বস্তুবাদকে আদর্শ করে যে কোনও যুক্তিবাদী আন্দোলন করতে গেলে, ওঁদের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে, আমারা উল্লম্ফন দিচ্ছি, ঘোড়ার আগে গাড়ি বেঁধে চালাতে চাইছি ইত্যাদি। যেন কুসংস্কার দূর হওয়ার নির্দিষ্ট দিনের অমোঘ পঞ্জিকাটা ওঁদের বগলদাবা আছে। শিক্ষা এলে নাকি আপনা থেকেই যাবতীয় কুসংস্কার দূর হয়ে যাবে। ওঁদের বোঝানোই গেল না, কুসংস্কার ও অন্ধত্ব দূর হওয়ার নামই শিক্ষা। 

এখন জানতে ইচ্ছা করে, কমরেডরা কী শিক্ষা দিলেন সাড়ে তিন দশক ধরে যে, ওয়ান ফাইন মর্নিং প্রায় সবাই লাল পতাকা ছেড়ে সবুজ গেরুয়া ধরে নিল? 

কমরেড, এখন কিন্তু আপনাদের চোখে সেই উল্লম্ফন দেওয়া ব্রাত্য মানুষগুলোই লাল পতাকার স্বপ্ন বুকে লালন করে চলেছি।

সাধন বিশ্বাস

কলকাতা-১২২