ঘণ্টায় ঘণ্টায় অসামাজিক, আপাত-বেআইনি উক্তির নব নব নমুনা
নকলটাই হয়ে দাঁড়ায় আসল
গণতান্ত্রিক সরকারের মুখ্য আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলি কোথা থেকে কত টাকা পাচ্ছে তা দেশবাসীর জানার দরকার কী?
Modi and Yogi

চলছে: নির্বাচনী জনসভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। আলিগড়, ১৪ এপ্রিল ২০১৯। পিটিআই

আবদুল করিম তেলগিকে মনে পড়ে? গত শতকের শেষ দিকে এই কীর্তিমান পুরুষ কিছু বাতিল মুদ্রণযন্ত্র জোগাড় করে দেশ জুড়ে আনুমানিক ৩০,০০০ কোটি টাকার জাল স্ট্যাম্প পেপারের কারবার ফাঁদেন। বলা বাহুল্য, প্রশাসনের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও গাফিলতি বিনা এটা সম্ভব হত না। বিপুল অঙ্কের রাজস্ব খোয়া যায়; আরও বড় কথা, প্রশ্ন ওঠে এই জাল কাগজে যত দলিল লেখা হয়েছে, সেগুলি কি বৈধ ও আইনগ্রাহ্য? বৈধতাদান করতেই হল, নইলে প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা বসে যেত। ফলে একটা বিরাট অনাচার কার্যত স্বীকৃতি পেল, গেঁথে রইল রাষ্ট্রযন্ত্রের গায়ে।

এই ঘটনার শিক্ষা— কোনও অনাচার যথেষ্ট ব্যাপক ও দীর্ঘায়িত হলে আর দূর করার উপায় থাকে না, মেনে নিতে হয়। নদীর জল উল্টো খাতে বয় না। ভাবুন গোয়েবেল্‌স-এর উক্তি: অবিরাম যদি আওড়ানো হয় একটা চতুষ্কোণ আসলে গোল, লোকে তা শেষতক মেনে নেবে। এটা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। গণতন্ত্রের প্রবক্তা এব্রাহাম লিঙ্কনের কথাটা বরং স্বস্তিকর: কিছু লোককে সব সময় আর সব লোককে কিছু সময় ঠকানো যায়, সব লোককে সব সময় যায় না। তা না-ই বা গেল। কিছু লোকেরও চৈতন্য হতে হতে মিথ্যাটা শক্ত শিকড় গেড়ে ফেলে, আর নির্মূল করা যায় না। নকলটা হয়ে দাঁড়ায় প্রবল ভাবে আসল। 

এত দার্শনিক চিন্তা মাথায় গিজগিজ করছে চরম বাস্তবের প্রভাবে। ভোটের বাজারে নানা চটকদার প্রচার, উত্তেজক তথ্যের পসরা বিকোচ্ছে, তার আসল-নকল নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে প্রচুর। একটা সমস্যাও কিন্তু নির্মূল হচ্ছে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হবে এমন ভরসা নেই। যদি কোনওটার হয়, তত দিনে নির্বাচনের পালা সাঙ্গ হবে, যাদের ফায়দা লোটার ছিল তারা লুটের মাল গুছিয়ে আরও বলবান হবে। অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়ে পড়বে, কেবল দুষ্কর নয়, অবান্তর। এ কথা না মেনে উপায় থাকবে না যে— নকলটাই আসল।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

ঘণ্টায়-ঘণ্টায় শোনা যাচ্ছে নির্বাচনী বক্তাদের অসামাজিক, আপাত-বেআইনি উক্তির কোনও নতুন নজরকাড়া নমুনা। এ ব্যাপারে যে-কোনও বড় দলের খতিয়ান আনাড়ি নাগরিকের দৃষ্টিতে লজ্জাকর; কিন্তু বিশেষ করে একটি ঘরানার ওস্তাদরা নিজেদের রেকর্ড রোজ নিজেরাই ভাঙছেন, বিতর্কে টেনে আনছেন দেশের সবচেয়ে সম্মানিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে। দশ বছর আগেও এমন কথা বলতেন দলের নিচুতলার কর্মীরা, নেতারা অন্তত জনসমক্ষে তা অস্বীকার করতেন, দুঃখপ্রকাশও করতেন। আজ শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে পথিকৃৎ।

নির্বাচন কর্তারা অবশ্যই বসে নেই, তাঁরা বিধিবদ্ধ পথে এগোচ্ছেন। অভিযোগের তদন্ত করছেন, অভিযুক্তের বয়ান তলব করছেন, তেমন বুঝলে ভর্ৎসনাও করছেন। মুশকিল এই, সেই ফাঁকে অনাচারগুলো রক্তবীজের মতো বেড়ে যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য ষোলো আনা সিদ্ধ হচ্ছে; ভর্ৎসনাটা শোনাচ্ছে ক্ষীণ ও নিষ্ফল। এই লেখা লিখতে-লিখতে জানলাম, অবশেষে দুই ক্ষমতাবান নেতা-নেত্রীর দু’তিন দিন প্রচারে নামায় নিষেধ জারি হয়েছে। হয়তো এমন বিলম্বিত ও সংযত পদক্ষেপ আরও দু’একটা হবে। এত দিন বাতাসে যত বিষ ছড়িয়েছে, এর ফলে তা কতটা প্রশমিত হয় দেখা যাক।

সম্প্রদায়বিশেষকে প্রাণে ও ভাতে মারার হুমকি, অন্য বহু জনগোষ্ঠীর মনে আতঙ্ক সঞ্চার, সামরিক বাহিনীর বেআইনি ও অনৈতিক উল্লেখ— আর সব বিষয় বাদ দিলাম, কেবল এই ক’টি খাতে যা বার্তা রটাবার অবশ্যই রটে গিয়েছে। ইতিমধ্যে এক দফা নির্বাচন শেষ হয়েছে, বাকি ছয় দফাও ক্রমে চুকেবুকে যাবে। তার পর কমিশনের আক্ষেপ, আইনের দণ্ড, জনমানসে প্রতিক্রিয়া, সব হবে অবান্তর, আসল-নকল একাকার। লাভবান পক্ষের বাড়া ভাতে ছাইয়ের ছিটেও পড়বে না। বরং নবলব্ধ ক্ষমতায় তারা আরও উঠে পড়ে লাগবে, মসৃণ পথে অবশিষ্ট দু’চারটে বাধা দূর করতে— আইন পাল্টে, প্রতিষ্ঠান ধসিয়ে, হুমকি-উস্কানি-বাগাড়ম্বরের আরও কড়া ককটেলে জনতাকে বুঁদ করে। 

শুধু তো কথায় নয়, এই কালক্ষেপের ফলে অনেক বাস্তব অনাচার মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে। সদ্য উন্মোচিত এক টিভি চ্যানেল (যা আসলে নাকি চ্যানেলই নয়) মাপা শব্দে বিলম্বিত নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে রমরমিয়ে চলছে। যে নির্বাচনী বন্ডের বিরুদ্ধে কমিশন পর্যন্ত সরব, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে হয়তো এক দিন যার বিলুপ্তি ঘটবে, তাও বহাল রইল ফল ঘোষণার দিন পেরিয়ে। এমন অবস্থায় ব্যক্তিবিশেষের আচরণ আক্ষরিক অর্থে বেপরোয়া হয়ে উঠবে, আশ্চর্য কী। আইনি শপথ নিয়ে ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী তথ্য পেশ করে লজ্জা ভয় দূরে থাক, একটা দায়সারা ব্যাখ্যার প্রয়োজনও কেউ বোধ করছে না।

আর একটু পিছিয়ে দেখা যাক। গত পাঁচ বছরে শাসক পক্ষের তরফে কতকগুলি অভূতপূর্ব প্রস্তাব করা হয়েছে। এমন আইন প্রস্তাব হয়েছে যাতে কেবল অন্যকে পাঠানো বার্তা নয়, আমাদের নিজের ঘরে যে তথ্য বা নথি আছে, কতকগুলি সংস্থার সেজোকর্তারাও তাতে সহজে হানা দিতে পারবেন। ভীতিপ্রদ, বিতর্কিত রাষ্ট্রদ্রোহ-আইন আরও জোরদার হবে বলে ঘোষণা হয়েছে। নাগরিক পঞ্জির বলি হিসাবে বহু সাচ্চা নাগরিক চালচুলো হারাতে বসেছেন। এই নির্বাচনের মুহূর্তেও বন ও পরিবেশ মন্ত্রকে এক নতুন আইনের মুসাবিদা হচ্ছে যার ফলে অরণ্য ধ্বংস করে, সেখানকার জনজাতিদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে, দেশভর বনাঞ্চলে নেমে আসতে পারে প্রায় নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী শাসন ও কর্পোরেট লুণ্ঠন। 

তালিকা দীর্ঘ করব না। কিন্তু একটা সূক্ষ্মতর বিষয়ের কথা বলতেই হয়, তা হল তথ্য সরবরাহে শাসকগোষ্ঠীর তীব্র অনীহা। যে আর্থসামাজিক সমীক্ষার জন্য ভারতের জগৎজোড়া খ্যাতি, তা হয় চেপে দেওয়া হচ্ছে, নয় মূলেই আটকে দেওয়া হচ্ছে। পরিবর্তে প্রক্ষিপ্ত হচ্ছে কিছু খাপছাড়া ব্যাখ্যাহীন তথ্যের টুকরো, আর বান ডাকছে তথ্যমুক্ত দাবি, কুযুক্তি আর বাক্যবিস্তারের। 

এটা পণ্ডিতদের কচকচি ভাবলে মস্ত ভুল হবে। এই তথ্য-পরিসংখ্যান আমাদের আর্থিক ও নাগরিক কল্যাণের রক্ষাকবচ, শত বিচ্যুতি সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর যে উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে তার অপরিহার্য শর্ত। তার বদলে ‘উত্তর-সত্যযুগ’ চালু হলে আমাদের বোঝার উপায় থাকবে না দেশের কী হাল, শাসকগোষ্ঠী কেন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার ফলই বা কী। এক কথায়, শাসকের 

মুখের কথা আর জোরজবরদস্তির চাপে আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়ব। নাগরিকদের অন্ধকারে রাখলে সরকারমাত্রের স্বস্তি, কিন্তু আগে তা কখনও এত প্রকট হয়নি। সেই সঙ্গে তথ্যের অধিকার আইন নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা দিন-দিন বাড়ছে। গণতান্ত্রিক সরকারের মুখ্য আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছেন, রাজনৈতিক দলগুলি কোথা থেকে কত টাকা পাচ্ছে তা দেশবাসীর জানার দরকার কী?                                                   

(চলবে)

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমেরিটাস অধ্যাপক

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত