বাজপেয়ীজির অস্থিকলস নিয়ে দেশ জুড়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও উন্মাদনার মাঝে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে। সিক্ত চোখে, করজোড়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পঞ্চাশটা দিন চেয়েছিলেন নোট বাতিলের সাফল্য দেখাবার জন্য। না পারলে তিনি নাকি রাস্তার মোড়ে দাঁড়াবেন। কুড়ি মাস ধরে নোট গুনে ক্লান্ত রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অবশেষে জানাল, দশ হাজার কোটি ছাড়া বাকি সব টাকাই ‘এসেছে ফিরিয়া’। দেশের কোটি কোটি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের চোখে ছিল পঞ্চাশ দিনের মায়া-অঞ্জন। এ বার তারাই রাজা, বড়লোকদের ঘুম উড়েছে। সাম্যবাদের স্বপ্নে তারা মেনে নিয়েছিল অবর্ণনীয় কষ্ট। এখন প্রশ্ন: কোন মন্ত্রবলে সব কালো টাকা সাদা হল, আর কাদের কালো টাকা রং বদলাল?

কাক্কেশ্বর ভেবেই অস্থির, নোট বাতিল নামক অশ্বডিম্বটি প্রসবের জন্য রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের খরচ হল কুড়ি হাজার কোটি টাকা, দেশের সম্পদ সৃষ্টি কমল অন্তত আড়াই লক্ষ কোটি টাকা, হারাল অন্তত একশোটি প্রাণ, পনেরো কোটি মানুষের জীবিকায় আঘাত এল, গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতিতে সেই অভিঘাত এখনও কাটল না। তা হলে হাতে কী রইল? দেশ ক্যাশলেস হয়েছে, আর রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক বলছে বাজারে নগদ টাকার জোগান নোটবন্দির আগের চেয়েও বেশি: এ হিসেব কে মেলাবে?

দেশের আর্থিক বৃদ্ধি নিয়ে চলছে কারিকুরি, ভিত্তিবর্ষ উল্টে-পাল্টে যদি সাফল্যের কীর্তি দাঁড় করানো যায়! তার মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে একটি সরকারি তথ্য। দেখা যাচ্ছে, নতুন ভিত্তিবর্ষের নিরিখেও মৌনী প্রধানমন্ত্রীর আমলে দশ বছরে দেশের গড় বৃদ্ধির হার স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সব চেয়ে বেশি (৮.১ শতাংশ): মুখর প্রধানমন্ত্রীর আমল তার চেয়ে এখনও অনেক পিছিয়ে (৭.৩ শতাংশ)। নোট বাতিল আর জিএসটি-র জোড়া ধাক্কায় বৃদ্ধিতে এখনও ভাটার টান কাটেনি, অথচ তার মধ্যেই গত তিন মাসে ৮.২ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে বলে আস্ফালন চলছে। এই ৮.২ শতাংশের হিসেবটা কেমন, সহজ ভাবে দেখা যাক। ধরা যাক, এক ছাত্র একটি পরীক্ষায় ৫৫ পেল, পরের পরীক্ষায় পেল ৪০, তার পরের পরীক্ষায় পেল ৬০, এবং তার পর দাবি করল যে তার ৫০ শতাংশ উন্নতি ঘটেছে। এ অনেকটা সেই রকম। গত বছর এই সময়ে নোটবন্দির ধাক্কায় আর অজানা জিএসটি-র আতঙ্কে মুখ থুবড়ে-পড়া অবস্থার সঙ্গে এ বছরের একটু স্বাভাবিক হওয়া পরিস্থিতিকে তুলনা করলে দৃষ্টিহীনকে পদ্মলোচন মনে হতেই পারে।

কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদে লাগাম, এ সবই যখন ভূতের ফাঁকির মতো মিলিয়ে গেল, তখন হইচই শুরু হল আয়কর আদায় নিয়ে। হায়, সেখানেও মৌনী আমলে শেষ চার বছরে বৃদ্ধির হার (বছরে গড়ে ১৭ শতাংশ)— মুখর আমলের চার বছরের থেকে এগিয়ে (বছরে গড়ে ১১ শতাংশ)।

ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ মৌনী আমলে ২ লক্ষ কোটিতে পৌঁছেছিল, চার বছরে তা ১০ লক্ষ কোটি ছুঁয়েছে। ও দিকে প্রতি বছর কমবেশি বারো হাজার কৃষকের আত্মহত্যার মিছিল অব্যাহত। বছরে দুই কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি গলায় আটকে ত্রিশঙ্কুর মতো। তাই পকোড়ার দোকান, ওলা, উবর, সুইগি, সব কিছুকেই মুখর আমলের সুশাসনের ফল হিসেবে দাবি করতে হচ্ছে।

ডলার-এর তুলনায় টাকার দাম আগের আমলে যখন ৬০ পেরোয়, তখন তিনি মৌনী প্রধানমন্ত্রীকে তুলোধোনা করেছিলেন। আজকে কিন্তু তা ৭০ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। মৌনী প্রধানমন্ত্রীর সময়ে অশোধিত তেলের দাম যখন ব্যারেল-প্রতি ১১০ ডলার পেরিয়েছিল, তখনও পেট্রলের দাম ছিল ৭০ টাকার নীচে। এ দিকে মুখর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পেট্রলের দাম ৮০ পেরিয়েছে, যেখানে অশোধিত তেল ব্যারেল-প্রতি ৭০ ডলার। সরকারের নাকি কিছুই করার নেই। এ হল বাজার অর্থনীতি। বাজার অর্থনীতি বোধ হয় এ-ও বোঝে যে কর্নাটক ভোটের আগে এক মাস দাম বাড়ানো যায় না! 

এত মুখরতা সত্ত্বেও তিনি চার বছরে সাংবাদিকদের ছায়া মাড়াননি। তবে বসেছেন জনতার সামনে নাটমঞ্চে, যেখানে কার প্রশ্ন, কী প্রশ্ন, তাঁর কী উত্তর, উত্তরের ইংরেজি তর্জমা, সব তৈরি থাকে। সে দিন তো সিঙ্গাপুরে এক কাণ্ডই হল। ওই রকম এক আসরে তিনি একটা উত্তর পুরোটা না বলেই থেমে গেলেন। কিন্তু অনুবাদককে থামায় কে, তিনি তো স্ক্রিপ্ট পড়ে গেলেন আদ্যোপান্ত, সেই ভীমবধ নাটকের প্রম্পটারের মতো। সে এক লেজেগোবরে পরিস্থিতি।

তার মধ্যে এল কেরলের বন্যা। যতই হোক, বিরোধী-শাসিত রাজ্য— কতই বা দেওয়া যায় তার জন্য। নানা দিকে এত খরচ, সর্দার পটেলের মূর্তি ৩০০০ কোটি, শিবাজির মূর্তি ৩৫০০ কোটি, আগামী বছর কুম্ভমেলায় ৪২০০ কোটি, চার বছরে সরকারি প্রচারে ৪৩০০ কোটি, বিভিন্ন দেশে গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের বুকে জড়িয়ে ধরতে ১৫০০ কোটি— এত খরচের ধাক্কা সামলে কেরলের জন্য ৫০০ কোটিই না অনেক? এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ জাপান থেকে নেওয়া যায় গুজরাতে বুলেট ট্রেন চালাতে, কিন্তু কেরলের বন্যায় ৭০০ কোটি টাকা বিদেশি ত্রাণ নিলেই নাকি দেশের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে: এ ক্ষেত্রে মৌনী আমলের ২০০৪ সালের সিদ্ধান্তই শিরোধার্য।

সত্যি, এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে যেখানে মানুষ পিটিয়ে মেরে মন্ত্রীর সংবর্ধনা জোটে। কাগজের প্লেন বানাবার অভিজ্ঞতা না থাকলেও যুদ্ধবিমান বানানো যায়। যে মাঠে আজ গরু চরছে, সেখানে কোনও এক দিন বিশ্ববিদ্যালয় হবে, এই ভরসা ও ফুর্তিতেই ভারত সেরার তকমা দেওয়া হয়। কিংবা, দেশের ৫০ হাজার পেট্রল পাম্পে তাঁর ছবি-শোভিত হোর্ডিং লাগাতে হুলিয়া জারি হয়।

চার বছর ধরে ‘অচ্ছে দিন’-এর এই সব টুকিটাকি দৃশ্যকল্প দেখতে দেখতে এসে গেল ভোট। লোকসভা আর বিধানসভার ভোট এক সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে দেওয়ার একটা ধুয়ো উঠছিল, কিন্তু ভারী মুশকিল, নির্বাচন কমিশন তাতেও আপাতত জল ঢেলেছে।

২০১৪ সালে বিজেপির মূল জয় যে রাজ্যগুলি থেকে এসেছে, সেগুলি হল উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়। ২১১টি আসনের মধ্যে জয় এসেছে ১৮৯ আসনে। কিন্তু তার পর লোকসভার যে ২৩টি উপনির্বাচন হয়েছে, তাতে বিজেপি জিতেছে ৪টিতে, হারিয়েছে ৬টি আসন, একটি ছাড়া সবগুলোই নিজেদের রাজ্যে। রাজ্যগুলির মধ্যে গুজরাত কান ঘেঁষে রক্ষা পেয়েছে, বহু নাটকের পরও কর্নাটক থেকেছে অধরা। বিহার, গোয়া এবং উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্যে ভোটে হেরেও পিছনের দরজা দিয়ে সরকার গড়া গিয়েছে। তবে উত্তরপ্রদেশে জয় এসেছে নিরঙ্কুশ।
নিন্দুকেরা বলছেন, এটাই নোটবন্দির উদ্দেশ্য আর বিধেয় ছিল।

সামনে ভোট তিনটি রাজ্যে। তার মধ্যে রাজস্থান টলোমলো, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ়ে লড়াই জোরদার। ছয়টি রাজ্যে যা পরিস্থিতি, তাতে উত্তরপ্রদেশে যদি বিরোধী জোট দানা বাঁধে, তা হলে ১৮৯ কমে চলে যেতে পারে ১০০-র কাছাকাছি। শরিকদের পরিস্থিতিও কেমন গোলমেলে। চন্দ্রবাবু আপাতত অর্ধচন্দ্র দেখিয়েছেন। শিবসেনার মতিগতি বোঝা শিবেরও অসাধ্য। বিহারে অশান্তি বাড়ছে। ফলে গদি বাঁচানোর লড়াই বেশ তীব্র। 

গদি হারানোর ভয় চেপে বসলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই হল— উদয়ন পণ্ডিতদের ধরপাকড় শুরু করা। এই সব গোলমেলে লোকদের একটা পোশাকি নাম দেওয়া গিয়েছে: ‘আরবান নকশাল’। সরকারি উকিল ভরা আদালতে দাঁড়িয়ে বলে ফেলেছে, ফ্যাসি-বিরোধী কাজকর্ম করছিল এরা, তাই এদের জেলে পোরা হোক। তাই তো। আদালতে কি মিথ্যে বলা যায়?

কিন্তু পিকচার আভি বাকি হ্যায়। যত ভোট কাছে আসবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাড়বে আজগুবি গল্প, আর আস্তিন থেকে বেরোবে নানা রকম তাস: গরু, পাকিস্তান, রামমন্দির, গরমাগরম এনআরসি,  চুপচাপ দাঙ্গা। এই ককটেল অনেক বৈতরণি পার করেছে। এ বারও যে হবে না, কে বলতে পারে?

শুধু পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভেবে দেখতে পারে, কোনও সুযোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান জানাতে ‘জুমলাশ্রী’ খেতাবটা চালু করা যায় কি না।