সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ঘোল ও দুগ্ধ

Michael Phelps
মাইকেল ফেল্পস। ফাইল চিত্র।

মাইকেল ফেল্পস একটি হাঙরের সহিত সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামিবেন, তাঁহারা পাশাপাশি সাঁতার কাটিবেন এবং দেখা যাইবে কে জেতে, ইহা লইয়া প্রবল বিজ্ঞাপন দিল একটি বিখ্যাত টিভি চ্যানেল। লক্ষ লক্ষ মানুষ মহা লগ্নে টিভি খুলিয়া বসিলেন। এক ঘণ্টা ধরিয়া হাঙর বিষয়ে বহু তথ্য ফেল্পসকে জানানো হইল এবং তিনি চক্ষু গোলাকার করিয়া সকলই শুনিলেন। একেবারে শেষে বুঝা যাইল, ফেল্পস সাঁতারের রেস করিবেন বটে, কিন্তু সত্যকারের হাঙরের সহিত নহে, কম্পিউটারে নির্মিত হাঙরের ছবির সহিত, যে একটি বাস্তব হাঙরের ন্যায়ই ব্যবহার করিবে, অর্থাৎ হাঙরের দ্রুতি অনুযায়ীই সন্তরণ করিবে। উদ্যোক্তারা বলিলেন, সত্য হাঙরকে নামাইবার চিন্তা অলীক, বিপজ্জনক। তদুপরি হাঙর সরলরেখা ধরিয়া সাঁতার কাটে না। আর, এই হাঙরটি কম্পিউটারে নির্মিত হইলেও, ইহাতেও বুঝা যাইতেছে, সত্যই এমন প্রতিযোগিতা হইলে ফেল্পস হারিতেন, কারণ তিনি হাঙরটির নিকট পরাজিতই হইলেন। কিন্তু দর্শকরা বেজায় চটিলেন। বহু দর্শক বলিলেন, তাঁহাদের ঠকানো হইল। পরে ফেল্পস বলিলেন, এক সপ্তাহ ধরিয়া প্রতিযোগিতার বিভিন্ন অগ্রিম প্রচারবার্তায় স্পষ্ট বলা হইয়াছিল সত্যকারের হাঙরের সহিত প্রতিযোগিতা হইবে না, দর্শকরাই মন দিয়া শুনেন নাই। কিন্তু দর্শকদের অনেকের মত, তাহা হয়তো বলা হইয়াছিল এমনই ‘ইতি গজ’ ধরনে, যাহাতে কিছুই স্পষ্ট বুঝা যায় নাই।

ইহার পূর্বে বিনোদনের জন্য মানুষের সহিত চিতাবাঘ,  উটপাখি, জেব্রা ও জিরাফের রেস হইয়াছে। কোনও মানুষই চিতাকে হারাইতে পারিবে না জানিয়াও লোকে সেই দৌড় দেখিতে গিয়াছেন। কিন্তু তাহা বলিয়া সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য গুলাইয়া দিয়া তাঁহাদের ফাঁকি দেওয়া হয় নাই। কিন্তু মজা হইল, এক দিন নিশ্চিত এমন আসিবে, বা বলা যায় হয়তো এখনই আসিয়া পড়িয়াছে, যখন এই তফাত না বলিয়া দিলে ধরিবার আর কোনও উপায় থাকিবে না। হলিউড সিনেমায় যখন বসুন্ধরা চুরমার হইয়া প্রলয় নামিয়া আসে, বা টেরোড্যাকটিলরা খাঁচা হইতে ছাড়া পাইয়া জুরাসিক দ্বীপের দর্শকদের ধরিয়া লইয়া যায়, কিংবা জ্বলন্ত বিমান আছড়াইয়া পড়ে জনবসতির উপর, তখন সত্যের সহিত তাহার কোনও পার্থক্যই বুঝা যায় কি? নেহাত চলচ্ছবি বলিয়া অামরা জানি যে এইগুলি মনগড়া ও নির্ঘাত কোনও উপায়ে নির্মাণ করা হইয়াছে। ইহা যদি না বলিয়া দেওয়া হইত, এবং যথাযথ ভাবে সকল কারিকুরি করিয়া দেখানো হইত, অবশ্যই মনে হইত, ফেল্পস হাঙরের সহিতই সাঁতরাইলেন, কেবল শেষে যখন মানুষ ও হাঙর জড়াজড়ি করিয়া ছবি তুলিতেছেন, দর্শকেরা প্রবল ভ্রু কোঁচকাইতেন। কিন্তু সেই দিন হয়তো দূরে নাই, যখন এইগুলি এমনই বাস্তবানুগ হইয়া উঠিবে এবং বিনোদন-কারবারিরা এমনই মিথ্যাপরায়ণ হইয়া উঠিবেন, ‘ইতি গজ’ বলিবার প্রয়োজনটুকুও বোধ করিবেন না।

যদি এই ‘পোস্ট ট্রুথ’-এর জমানায় খাঁটি সত্য লইয়া বিশেষ শুচিবায়ু ছাড়িয়া দেওয়া যায়, তবে এই গ্রাফিক্স বা অন্য কারিকুরি সম্পূর্ণ ভিন্ন দিগন্ত খুলিয়া দিতে পারে। হয়তো কোনও প্রখ্যাত অভিনেতার ভাবভঙ্গি নড়াচড়া উচ্চারণ মুদ্রাদোষ সকলই কম্পিউটারে ফেলিয়া মুখস্থ করাইয়া দেওয়া হইল। এই বার সেই অভিনেতাকে ‘নির্মাণ’ করিতে আর অসুবিধাই হইবে না। তিনি মারা যাইবার পরেও তাঁহাকে দিয়া দিব্য অভিনয় করাইয়া লওয়া চলিবে। ইতিপূর্বেই এম টিভি-র অনুষ্ঠানে, কম্পিউটার গ্রাফিক্সে নির্মিত চলচ্চিত্র-চরিত্রকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার দেওয়া হইয়াছে। হয়তো আগামী দশ বৎসর পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার ছবিতে প্রমথেশ বড়ুয়া তৃতীয় দৃশ্যে প্রবেশ করিবেন। ভাবিয়া দেখিলে, যে অভিনেতাকে আমরা পরদায় দেখি, তাঁহার পরচুলা, কনট্যাক্ট লেন্স, পরিচালকের নির্দেশানুযায়ী তাঁহার আচরণ, রচয়িতার বাক্য অনুযায়ী তাঁহার সংলাপ, গান গাহিবার সময় তাঁহার মুখে অন্যের কণ্ঠস্বর— সব মিলাইয়া তিনি কি ‘নির্মিত’ই নহেন? তবে নির্মাণের প্লাবন এক বার আসিয়া পড়িলে, সংবাদ পরিবেশনে যে অবিশ্বাস্য চমক ও মিথ্যামোদের রমরমা হইবে, তাহা মানুষের জীবন-মরণ নির্ধারণ করিবে। হয়তো বিধ্বংসী  দাঙ্গা থামিবার পরে জানা যাইল, যে ঘটনাটি ইহার মূল স্ফুলিঙ্গ, তাহা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, কম্পিউটার-নির্মিত, এবং সত্য বলিয়া সংবাদ চ্যানেলে প্রচারিত। তখন মানুষ হয়তো বলিবে, দাও ফিরিয়া সেই আমোদহীন অরণ্য, লও এ হাঙর-দংশন!

 

যৎকিঞ্চিৎ

বাপ-মা নাম রাখার সময় মহৎ দেখে শব্দ বাছেন। কিন্তু, নীতীশ কুমারের নামটি কে রেখেছিলেন? ওর অর্থ, নীতির ঈশ্বর। যে কোনও নীতিকে যখন-তখন মাইলটাক ছুড়ে ফেলাই রাজ-নীতি, বা ‘নীতিহীনতা’ও দিব্যি নীতি, নিজ কাজে বারংবার এই প্রচারের ধক অবশ্য ঈশ্বর ছাড়া আর কার থাকবে? অবশ্য নামটাকে একটু ঘুরিয়েপেঁচিয়ে নীতি+ইইইশ বলেও লেখা যায়, সন্ধির নিয়মে শুধু কিঞ্চিৎ ঘোটালা ঘটে। তা, সন্ধির কোন নিয়মটা তিনিই বা মানছেন? 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন