নির্বাচনে জয়ী দলের মনোনীত নেতা হওয়াই প্রধানমন্ত্রী হইবার একমাত্র পূর্বশর্ত নহে। অন্য— জরুরিতর শর্তটি হইল, প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষিত হইতে হইবে। পুঁথিগত শিক্ষা না থাকিলেও চলে— অক্সফোর্ডের ডিফিল অথবা গোটা দুনিয়ায় সমাদৃত একাধিক বইয়ের লেখক হওয়ার প্রয়োজন নাই, কিন্তু দেশের সব মানুষের হিতাহিত চিন্তা করিবার জন্য যে শিক্ষা জরুরি, প্রধানমন্ত্রীকে তাহার অধিকারী হইতেই হইবে। নরেন্দ্র মোদী প্রমাণ করিয়া চলিতেছেন, তিনি সেই পূর্বশর্ত পূরণ করিতে ব্যর্থ। বস্তুত, পাঁচটি বৎসর প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসিবার পরও তিনি শিখেন নাই। তাহার সাম্প্রতিকতম প্রমাণটি মিলিল গুজরাতের পাটানে। নির্বাচনী জনসভায় তিনি জানাইলেন, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রগুলি তিনি দীপাবলির জন্য বাঁচাইয়া রাখিবেন না। অর্থাৎ, প্রয়োজনে অথবা নিতান্ত অপ্রয়োজনেই সেই অস্ত্র তিনি পাকিস্তানের উপর প্রয়োগ করিতে রাজি। আন্তর্জাতিক মঞ্চে দুই যুযুধান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন অবধি যে কথা উচ্চারণ করিবার পূর্বে থামিয়া গিয়াছেন, নরেন্দ্র মোদী তাহা অবলীলায় বলিলেন। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের একমাত্র কর্তব্য যে তাহা প্রয়োগ না করা— এমনকি, সেই কথাও না বলা, কারণ দুইটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র পরস্পরের বিরুদ্ধে এই শক্তি প্রয়োগ করিলে ধ্বংস অনিবার্য, যাহা ‘মিউচুয়ালি অ্যাশিয়োর্ড ডেস্ট্রাকশন’ হিসাবে পরিচিত— এই কথাটি জানিয়া রাখা প্রধানমন্ত্রীর অবশ্যকর্তব্য। নরেন্দ্র মোদী সম্ভবত জানেন না, অথবা জানিয়াও ভোটের জনসভায় বাজার গরম করিতেছিলেন। কোন সম্ভাবনাটি বিপজ্জনকতর, স্থির করা দুষ্কর। তবে, যে নেতার এইটুকু বাক্‌সংযম নাই যে তিনি পারমাণবিক আক্রমণের কথা বলিবার পূর্বেও থামিতে পারেন না, ভারত নামক দেশটির প্রধানমন্ত্রী হইবার যোগ্যতা তাঁহার আছে কি?

নরেন্দ্র মোদী নিজের সমর্থকদের জানেন বলিয়া অনুমান করা চলে। তিনি জানেন, যাঁহাদের সম্মুখে ছাতি চাপড়াইয়া তিনি এমন ভয়ঙ্কর একটি মনোবাঞ্ছার কথা ঘোষণা করিলেন, সেই শ্রোতাদের মধ্যে সম্ভবত এক জনেরও মনে প্রশ্ন জাগিবে না যে সত্যই পারমাণবিক যুদ্ধ হইলে তাহার ফলাফল কী হইবে। তাঁহারা জানিতে চাহিবেন না, সীমান্তের উভয় পার্শ্বে থাকা অগণিত মানুষ সেই পারমাণবিক ভবিষ্যতে মরিলে সেই মৃত্যু কতখানি মর্মান্তিক হইবে, আর বাঁচিলে তাহা মৃত্যুরও অধিক যন্ত্রণার হইবে কি না। মোদী জানেন, পরমাণু অস্ত্রের কথা শুনিয়া তাঁহার ভক্তদের মনে বিধ্বস্ত হিরোশিমার ছবি ভাসিয়া উঠিবে না, মাশরুম মেঘের মারণ-সম্ভাবনা তাঁহাদের কাঁপাইয়া দিবে না। যাঁহারা শান্তির স্বার্থেই পরমাণু-শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যাঁহারা ‘মিউচুয়াল অ্যাশিয়োর্ড ডেস্ট্রাকশন’-এর অনিবার্যতার কথা মনে করাইয়া বলেন যে উভয় পক্ষের হাতেই অস্ত্র থাকিলে কেহ তাহা প্রয়োগ করিবে না, তাঁহাদের অবস্থানে খামতি কোথায়, নরেন্দ্র মোদী ও তাঁহার ভক্তরা চক্ষে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছেন। পরমাণু অস্ত্র র‌্যাশনালিটি বা যুক্তিগ্রাহ্যতার দাবি করে। কোনও এক মেগ্যালোম্যানিয়াক ও তাঁহার বিচারশক্তিহীন ভক্তদের ‘গণতন্ত্র’-এ পরমাণু অস্ত্র থাকিলে তাহা দেশকে কোন আত্মঘাতের পথে লইয়া যাইতে পারে, নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ সেই সম্ভাবনাটি দেখাইয়া দিল। ভরসা শুধু প্রকৃত গণতন্ত্রের। বাঁচাইলে, তাহাই বাঁচাইবে।