সঙ্গীতশিল্পের পক্ষে ব্রেক্সিটের পরিণাম শুভ হইবে না— টুইটারে অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন সুরকার হাওয়ার্ড গুডাল। ষোলো লক্ষ ভিউ, সাড়ে আট হাজার রিটুইট এবং উনিশ হাজার লাইক-এ অভূতপূর্ব সমর্থন মিলিয়াছিল। বিপ্রতীপে, ব্রেক্সিট-সমর্থক এমপি নাডিন ডরিস কারণ দর্শাইতে বলিয়াছিলেন গুডালকে। সঙ্গীত ক্ষেত্রে বহু কর্মীই স্থায়ী নহেন। সুতরাং, ঠাঁইনাড়া হইবার পূর্বে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ভূখণ্ডকেই বাছিয়া লইতে চাহিবেন তাঁহারা, জানাইয়াছেন গুডাল। উদাহরণ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ইউথ অর্কেস্ট্রা জানাইয়া দিয়াছে, তাঁহাদের প্রশাসনিক দল লন্ডন হইতে স্থানান্তরিত হইয়া ঘাঁটিতে বানাইতেছে ইতালির ফেরারা শহরকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থসাহায্য গ্রহণ করিয়া তাহার বাহিরের ভূখণ্ডে মূল কেন্দ্র নির্মাণ অসম্ভব। বস্তুত, ইউরোপের অভ্যন্তরে স্বাধীন চলাচলের সুযোগটি বন্ধ হইলে ব্রিটেনে সঙ্গীত স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটিতেই পারে। তখন প্রতিটি সঙ্গীত সম্মেলনের হেতু ভিসার বন্দোবস্ত করিতে হইবে ব্রিটেনবাসী সঙ্গীতকারগণকে। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড হইতে ব্রিটেনে পাঠরত কিংবা কর্মরত সঙ্গীত-ব্যক্তিত্বেরাও সঙ্কটে পড়িবে।

শিল্পীদের দেশান্তরী হওয়া নূতন নহে। বহু শতাব্দী পূর্বে ‘বর্বর’দের আক্রমণে পতন ঘটিয়াছিল পশ্চিমের রোমান সাম্রাজ্যের। ফলস্বরূপ, সেই স্থানের সকল পণ্ডিত পলায়ন করিয়া পশ্চিম এশিয়ার কনস্ট্যান্টিনোপল-এ আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইহাতে শিল্প-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হইয়াছিল এশিয়া। অন্ধকারে নিমজ্জিত হইয়াছিল ইউরোপ। গত শতাব্দীর তিনের দশকে গটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে গোঁসা হইয়াছিল নাৎসি রাষ্ট্রশক্তির। ১৯৩৩ সালে কোপ পড়িয়াছিল তাহাদের ‘ইহুদি পদার্থবিদ্যা’র উপরে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিত্যাগে বাধ্য হইয়াছিলেন ম্যাক্স বর্ন, ভিক্টর গোল্ডস্মিট, জেমস ফ্র্যাঙ্ক, ইউগেল উইগনার, লিয়ো সিলার্ড-সহ বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী। ত্রয়োদশ শতকে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বাংলা আক্রান্ত হইলে দাক্ষিণাত্যে গমন করিয়াছিলেন পণ্ডিতগণ। দুইটি ক্ষেত্রেই বিকশিত হইয়াছিল বিদ্বানদের বাছিয়া লওয়া নূতন স্থান। অপরপক্ষে, পুরাতন স্থলগুলি পুনরায় স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হইতে অতিক্রান্ত হইয়াছিল বহু যুগ। অতএব, ইতিহাস বলিবে, সঙ্গীতশিল্পীদের দেশত্যাগে ব্রিটেন বিপন্ন হইতে পারে এবং সমৃদ্ধ হইবার অতুল সম্ভাবনা অবশিষ্ট ইউরোপের।

চিরাচরিত হইলেও কিছুই চিরস্থায়ী নহে। ভ্রম হইতে শিক্ষা লইতে হয়। ‘পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক’ শব্দবন্ধ তৎসূত্রেই প্রাপ্ত। শিল্পী যাহা সৃষ্টি করিয়া থাকেন, তাহা সমগ্র জগতের জন্য। যিনি রসজ্ঞ, তিনিই সেই সৃষ্টি গ্রহণ করিতে সক্ষম। পঞ্জাব কিংবা তামিলনাড়ু নিবাসী গায়কের রবীন্দ্রসঙ্গীতের দক্ষ শিল্পী হইয়া উঠিতে বাধে না। সেই সঙ্গীতে কথা রহিয়াছে। অর্কেস্ট্রার ন্যায় যেই সব মাধ্যমে কেবলই সুর বর্তমান, সেই স্থলে সীমান্তের ধারণাটি একেবারেই নাই। বাঙালি এবং আইরিশ ব্যক্তির হৃদয়ে একই রকমের তুফান তুলিতে পারে বেঠোফেনের সুরের মূর্চ্ছনা। ‘আমরা করব জয়’ কিংবা ‘ইন্টারন্যাশনাল’-এর ন্যায় সঙ্গীতের বিশ্বজনীন আবেদনের কারণে বহু ভাষায় অনূদিত হইয়া জগৎব্যাপী ছড়াইয়া পড়িয়াছে সেই সকল গান। শাসক এবং শাসনের পরিবর্তনে শিল্পীরা ঠাঁইনাড়া হইয়াছেন, ইহা সত্য। কিন্তু সেই সত্য রূঢ়, কটূ। সুতরাং, তাঁহাকে কোনও মতেই দেশ-কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ করা চলিবে না। অতীত এই শিক্ষাই দেয়— শিল্পীর ভবিতব্য পলায়ন হইলে, তাহা অমঙ্গলের।