২২৭ জন প্রার্থীর মধ্যে মহিলা ছিলেন মাত্র ৫ জন। কেউ জেতেননি। আওয়ান কন্যাক (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি) একটা লড়াই দিয়েছিলেন। শেষে হেরে যান। ‘ন্যাশনাল পিপলস পার্টি’র দু’জন মহিলা প্রার্থীই চতুর্থ হয়েছেন। ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র একমাত্র মহিলা প্রার্থী তৃতীয় স্থানে আছেন, আর ‘ইনডিপেন্ডেন্ট’ হিসাবে এক মহিলা প্রার্থী পঞ্চম স্থানে। রাজ্যের শাসক দল ‘নাগা পিপলস ফ্রন্ট’ এবং ‘কংগ্রেস’ কোনও মহিলা প্রার্থীই দেয়নি। ফলে ১৯৬৩ সাল থেকে যা হয়ে আসছে, এ বারেও তা-ই হল। নাগাল্যান্ডের বিধানসভা এই ২০১৮-র নির্বাচনের পরও মহিলাশূন্য। ভারতের আর কোনও রাজ্যে এমন দৃষ্টান্ত নেই। ‘নাগা মাদার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর (এনএমএ) প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী সানো ভামুজো বলেছেন, “ঘটনা খুব দুঃখজনক।... তবে নাগাল্যান্ডে নারীর সমানাধিকার অর্জনের লড়াই জারি থাকবে।” বলা হয়তো যায়, করা মুশকিল।

মহিলাদের শাসনকাজে অংশগ্রহণের নিরিখে এ দেশের স্থান বিশ্বে ১৪৮তম, আজও। পঞ্চায়েতে মেয়েদের প্রভূত সাফল্য দেখেও উচ্চতর প্রশাসন তাঁদের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ দিতে পারেনি। তবু মহিলাদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রয়োজন মৌখিক ভাবে অন্তত কোনও দলই অস্বীকার করে না। নাগাল্যান্ড এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম। গত বছর এনপিএফ সরকার রাজ্যে (দীর্ঘ ১৩ বছর পরে) পুরনির্বাচন করাবেন বলে ঠিক করেন। মেয়েদের ৩৩ শতাংশ আসনে প্রার্থী করার কথাও হয়। এর পিছনে এনএমএ-র বড় ভূমিকা ছিল। যে নাগাল্যান্ড আগে ড্রাগের বিরুদ্ধে, মদের বিরুদ্ধে লড়েছে, মহিলা বিষয়ক প্রশ্নে সে বরাবর চুপচাপ। এই সংগঠন অন্তত মেয়েদের সমস্যা, তাঁদের রাজনৈতিক, সামাজিক অধিকারের বিষয়গুলো সামনে আনতে পেরেছে। কিন্তু পুরনির্বাচনে সংরক্ষণের দাবি উঠতেই রাজ্য একেবারে জ্বলে উঠল। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, ভাঙচুর করে বীভৎস কাণ্ড বাধানো হল। খানকয়েক খুন হয়ে গেল। নির্বাচন বাতিল হল। এই রাজ্যে গ্রামের পঞ্চায়েতেও মহিলারা সদস্য হতে পারেন না। কেবল ‘গ্রামোন্নয়ন বোর্ড’-এ মেয়েদের ২৫ শতাংশ সংরক্ষণ আছে। আর আছেন একমাত্র মহিলা প্রধান, নাম টোখেলি কিকোন, যিনি পর-পর তিন বার, তিন জন পুরুষ প্রার্থীকে পরাজিত করে ডিমাপুরের নাহারবাড়ি পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তাঁর আগে পরে আর কোনও মহিলা প্রার্থী নেই। আটান্ন বছর বয়স্কা এই মহিলাকেও বহু বার বলতে হয়েছে, “আমাকে সব সময় ভয় দেখানো হয়।” ১৬টি নাগা জনজাতির (রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ) সমন্বয়ে গঠিত ‘নাগা হোহো’র সভাপতি কায়দা করে বলে রেখেছেন, “সময় নিশ্চয় পরিবর্তিত হয়েছে। তবু রাজনীতি আজও অর্থ ও পেশিশক্তির অধীনে। এই দুর্নীতির জগতে মেয়েরা করবে কী?”

অথচ এই রাজ্যে ৭৬ শতাংশ মহিলা সাক্ষর (জাতীয় গড় ৬৫ শতাংশ)। সরকারি চাকরিতে ২৪ শতাংশ মহিলা, বেসরকারি ক্ষেত্রে একশো জনে কাজ করেন ৪৯ জন। বাজারে দোকানে অফিসে পথে সর্বত্র মেয়েদের অবাধ গতি। কিন্তু সমাজে ও রাজনীতিতে নাগা মেয়েদের সমানাধিকার তো দূর অস্ত, পারিবারিক সম্পত্তির অধিকার পর্যন্ত নেই। কোনও মহিলা নিজেও যদি জমি বা বাড়ি কেনেন, বিবাহ করলেই তা চলে যাবে বাবা, ভাইদের হাতে। বিবাহবিচ্ছেদ হলে সম্পত্তি, সন্তান, সবের উপর স্বামীর অধিকার থাকবে। পরিবারের মধ্যেও তাঁদের যথার্থ সম্মান নেই। ধর্মে, সমাজে কোথাও নাগা নারীর অধিকার নেই। রাজনীতিতেও না। প্রশাসনে এক জনও মহিলা নেই। এমন অবস্থায় মেয়েদের জন্য সুবিচার চাইবে কে? ১৯৭৭ সালে এক মহিলা লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন বটে, তবে পঞ্চান্ন বছরের ইতিহাসে ওই শুরু, ওই শেষ।

সংবিধানের ৩৭১(এ) নং ধারার বলে এই রাজ্য বিশেষ অধিকার ভোগ করার সুবিধা পেয়েছে। এই ধারা স্বীকার করে নিয়েছে, যে ভারতের প্রশাসন নাগাদের ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, রীতিনীতি, বিচারব্যবস্থা বা প্রশাসন, কোথাও হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ফলে এই সব ক্ষেত্রে বেলাগাম পিতৃতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। শিলংয়ের ছাত্রী আমেলা পোংগেন বলেছেন, “আমরা অনেক পথ পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু সেইখানে পৌঁছইনি, যেখানে অপমান ও নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।”

পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, জঙ্গল, বৃষ্টি নাগাল্যান্ডের মানুষকে জীবনধারণের জন্য প্রথম থেকেই তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে ছুড়ে দিয়েছে। প্রকৃতির সম্পদ সীমিত, তাকে ছিনিয়ে আনতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে। এই লড়াইয়ের মানসিকতা নারীর প্রকৃতির সঙ্গে যায় না বলেই কি নাগারা নেতৃত্বে মেয়েদের মানতে পারেন না? নারী পরের ঘরে গেলে কষ্টে অর্জন করা সম্পদ বেহাত হবে বলেই কি তাঁকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়? আসলে কি এক বিপুল অসহায়তাই নাগা সমাজকে নারীর অধিকারের প্রশ্নে এতটা পিছিয়ে রেখেছে? কে তুলে ধরবে সেই অর্ধেক আকাশের যন্ত্রণার কথা? কে চাইবে প্রতিকার? পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা, লোকসভা, কোথাও যে সমাজের এই অর্ধাংশের কোনও প্রতিনিধিই নেই!