মানুষ পাচার প্রতিরোধে নূতন আইনের প্রস্তাব পেশ হইবে সংসদে। মনুষ্য পাচার (প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন) আইনের খসড়ায় কয়েকটি বিশেষত্ব লক্ষণীয়। এক, পাচার-বিরোধী কাজের পরিধিকে বিস্তৃত এবং সুনির্দিষ্ট করিবার প্রস্তাব। ভিক্ষা করাইতে, বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োগ করিতে, বিবাহের উদ্দেশ্যে— এমন নানা কারণে মানুষ পাচার ও কেনাবেচা হইয়া থাকে। তাহার সবগুলিকেই এই আইনের পরিধিতে আনা হইয়াছে। ইতিপূর্বে যৌনকর্মের জন্য নারী-শিশু পাচারই আইনে প্রাধান্য পাইত। দুই, পাচার প্রতিরোধের জন্য পৃথক ব্যবস্থার প্রস্তাব। জেলা, রাজ্য এবং কেন্দ্র, সকল স্তরে ‘পাচার-বিরোধী ব্যুরো’ নির্মাণ করা হইবে। নেতৃত্বে থাকিবে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি (এনআইএ), যাহা প্রধানত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের তদন্ত করে। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পাচার-প্রতিরোধ ও উদ্ধার-পুনর্বাসনের কাজে সমন্বয়, এবং অপর রাষ্ট্রের সহিত সংযোগ রাখিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের উপর নিয়মিত নজরদারি, এই দুইটি কাজ তাহাতে সম্পন্ন হইতে পারে। পৃথক একটি তদন্তকারী সংস্থার নজরদারির ফলে সীমান্তের জেলাগুলিতে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্নীতি প্রশমিত হইবারও সম্ভাবনা। তিন, পাচারকারীর শাস্তি আরও কঠোর করিবার প্রস্তাব। কারাদণ্ডের মেয়াদবৃদ্ধি, পাচারকারীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিবার সুপারিশ আছে। চার, পাচার হওয়া মানুষদের সহায়তার জন্য পৃথক তহবিল গঠন করিবার, এবং তাহাদের দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করিবার প্রস্তাব করা হইয়াছে।

কথাগুলি শুনিতে মন্দ নহে। কিন্তু প্রশ্ন উঠিতেছে অনেক। একটি প্রশ্ন তুলিয়াছেন যৌনকর্মীরা। স্বেচ্ছায় যৌনকর্ম বিষয়ে এই আইন নীরব কেন? এই নীরবতা যৌনকর্মীদের ‘অপরাধী’ বলিয়া চিহ্নিত করিবার আশঙ্কা বাড়াইয়াছে। বিশেষত প্রস্তাবিত আইন পুলিশের তল্লাশি চালাইবার এবং গ্রেফতার করিবার ক্ষমতা আরও বাড়াইয়াছে। ভারতে গণিকাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ নহে, কিন্তু যৌনপেশার বিভিন্ন দিক লইয়া বৈধতা ও অবৈধতার মধ্যে বিস্তীর্ণ ধূসর এলাকা রহিয়াছে। সেই অস্পষ্টতা দূর করিবার কোনও চেষ্টাই নাই নূতন আইনের খসড়ায়। অথচ পাচার প্রতিরোধে যৌনকর্মীরাও সক্রিয়। মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কিছু রাজ্যে যৌনকর্মীদের স্বনিয়ন্ত্রিত পরিষদ পাচার-বিরোধিতা করিতেছে। নিজেদের স্বাভাবিক স্বার্থেই তাহারা পেশাটিকে অপরাধমুক্ত রাখিতে চাহে। অথচ সরকার যৌনকর্মের সম্পূর্ণ ক্ষেত্রটিকে অপরাধের কালিমায় আচ্ছন্ন রাখিয়া চলিতেই আগ্রহী। তাহাতে পাচার প্রতিরোধ আরও কঠিন হইবে।

উদ্ধার ও পুনর্বাসনের যে প্রস্তাবগুলি খসড়া আইনে উঠিয়াছে, সেগুলি খাতায়-কলমে মন্দ নহে। কিন্তু অনুরূপ বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা যাহা হইয়াছে, তাহাতে আশায় বুক বাঁধিতে ভরসা হয় না। যৌনপল্লি হইতে নাবালিকা কিংবা মালিকের কারখানা হইতে শ্রমরত শিশু উদ্ধার হইলে তাহার অসহায় অবস্থা অনুমেয়। তাহার সহায়তায় পৃথক তহবিল থাকিলে ভাল। কিন্তু তাহাতে বাস্তবে কতটা কাজ হইবে, বলা শক্ত। ধর্ষিতা মহিলা, অ্যাসিড-আক্রান্ত মহিলাদের দ্রুত সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্যও তো তহবিল হইয়াছে। কত জন তাহার সুবিধা পাইয়াছে? নির্ভয়া তহবিলে বহু টাকা পড়িয়া আছে। তাহা খরচ করিয়া রেল-বাসে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াইলে পাচারও কমিত। আরও একটি প্রশ্ন উঠিবে। পাচার-সংক্রান্ত মামলায় দোষী সাব্যস্ত হইবার হার যেখানে মাত্র ৪ শতাংশ, সেখানে শাস্তি আরও কঠোর করিয়া কতটুকু লাভ হইবে? সর্বোপরি, বালিকাবধূ, দাসশ্রমিক, যৌনকর্মী কেবল অপরাধের শিকার নহে, তাহারা আর্থ-সামাজিক সংকটের মুখ। দ্রুত সমাধান পাইবার তাগিদে আইন যদি জটিল সংকটকে একমাত্রিক করে, লাভ হইবে সামান্যই।