ভারতীয় রাজনীতির নির্বাচনী প্রচারে এখন পরিসংখ্যানের বেশ বড় একটা ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু প্রগতি, বা সামাজিক ন্যায়, বা দেশ বা রাজ্যের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার মতো ধোঁয়াটে প্রতিশ্রুতি বা তার পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ নয়, আয়বৃদ্ধির হার বা জনসংখ্যার কত শতাংশ দারিদ্ররেখার তলায়, পাশাপাশি এই নিয়েও চলে তরজা। আমাদের রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। বর্তমান রাজ্য সরকারের আমলে গত পাঁচ বছরে অর্থনীতির অবস্থার কী পরিবর্তন হল, তা নিয়ে চর্চাও শুরু হয়ে গেছে।

পরিসংখ্যানের অনেক বদনাম আছে। একটা কথা আছে, মিথ্যা তিন রকমের হয়, মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা, আর পরিসংখ্যান। এই সমালোচনা কিন্তু অন্যায্য। পরিসংখ্যানও এক রকম ভাষা বই কিছু নয়, যেখানে অক্ষরের বদলে সংখ্যা ব্যবহার করে বক্তব্য পেশ করা হয়। আর ভাষা ব্যবহার করে যেমন পরম সত্য, চরম মিথ্যা বা বিভ্রান্তিমূলক কথা বলা যায়, সংখ্যা দিয়েও ঠিক তাই করা যায়। আসলে পরিসংখ্যানের ভাষা এবং তার ব্যাকরণ অতটা সহজবোধ্য নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা অত্যধিক গুরুত্ব পান, এবং তাঁদের বক্তব্য মনোমত হলে যেমন তাঁদের প্রতি একটা মুগ্ধতার ভাব হয় (‘ডেটা দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন!’), আবার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় অবিশ্বাসের মাত্রাও বেশি হয়। তবে শব্দে বা সংখ্যায় যে ভাবেই বলা হোক, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে কোনও বক্তব্যকে বিচার করলে সাধারণ বুদ্ধি দিয়েই অনেক দূর যাওয়া যায়, বিশ্বাসে-মিলায়ে-বস্তু গোছের ভক্তিবাদ আর অবিশ্বাসের 'কিছু জানি না, কিছু মানি না’ ধরনের নৈরাজ্যবাদের যুগলবন্দি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

বৃদ্ধির হার নিয়ে একটা উদাহরণ দিই, যা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরের উন্নয়নের আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক হবে। পরীক্ষায় যে গত বার একশোর মধ্যে ৪০ পেয়েছে তার ৪ নম্বর বাড়লেই ১০% উন্নতির হার, আর যে ৮০ পেয়েছে, তার ৪ নম্বর বাড়লে 'মাত্র' ৫% উন্নতির হার। মোট নম্বর বাদ দিয়ে যদি উন্নতির মাপকাঠিতেও দেখি, স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে দ্বিতীয় জনের নম্বরের বৃদ্ধির হার কম হলেও, তার কৃতিত্ব বেশি, কারণ নম্বর যত বেশি হবে, তত বাড়ানোর সম্ভাবনাও কমবে। এই যুক্তির উল্টো দিকে যে কোনও যুক্তি নেই, তা কিন্তু নয়। ভাবুন আপনি গৃহশিক্ষক নিয়োগ করছেন। ফেল করা ছাত্রর নম্বর বাড়ানো, আর দারুণ কৃতী ছাত্রকে আরও ভালো করানো, এ দুটোর মধ্যে অনেকে মনে করবেন প্রথমটা বেশি কৃতিত্বের। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও বাকি ছাত্রদের তুলনায় এই ছাত্রটির আপেক্ষিক অবস্থানে খুব একটা পরিবর্তন না হলে (যেমন, ফেল করা ছাত্রকে পাশ করানো) বৃদ্ধির হারের পরিসংখ্যান দেখিয়ে বেশি কৃতিত্ব দাবি করা যাবে না।

বৃদ্ধির হার নিয়ে এই সতর্কতাগুলো মাথায় রেখে, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে কিনা দেখা যাক। গড় বা মাথাপিছু আয়ে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের আপেক্ষিক অবস্থানে সামান্য হলেও কোনও পরিবর্তন হয়েছে কি না। নীতি আয়োগ এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সৌজন্যে মূল কিছু তথ্য খুব সহজেই ইন্টারনেট থেকে পাওয়া যায়। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে ২০১১ সালে, এবং অন্য সব রাজ্যের সঙ্গে তুলনীয় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ২০১৪ সাল অবধি— ২০১৫ সালের তথ্য পশ্চিমবঙ্গের জন্যে পাওয়া গেলেও, অনেক রাজ্যের জন্যে পাওয়া যাচ্ছে না, এবং তাই সর্বভারতীয় গড়ও হিসেব করা যাচ্ছে না। তুলনা যাতে সমানে সমানে হয়, তাই প্রচলিত রীতি অনুসারে আমরা আলোচনা বৃহত্তর রাজ্যগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব (জনসংখ্যা এক কোটির বেশি)। ২০১০ সালে উনিশটি বড় রাজ্যের মধ্যে মাথাপিছু আয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল ১১ নম্বর, ২০১৪ সালে তার আপেক্ষিক স্থান একই আছে। কেউ বলতেই পারেন, মাত্র চার-পাঁচ বছরে একটা রাজ্যের আপেক্ষিক অবস্থান পাল্টানো সহজ নয়, এবং সেই কথার যে কোনও যুক্তি নেই তা নয়। রাজ্যের গড় আয় আর দেশের গড় আয়ের মধ্যে ফারাক কতটা বাড়ছে বা কমছে সেটা দেখলে হয়তো সূক্ষ্মতর পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে।

২০০৪ থেকে ২০১০ অবধি পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয় দেশের মাথাপিছু আয়ের থেকে গড়ে ১০.৪% কম ছিল। এই পুরো সময়টাই বামফ্রন্টের আমল। আর যদি ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল অবধি হিসেব করি, তা হলে এই ফারাক হয় গড়ে ১২.২%। কেউ বলতেই পারেন যে ২০১১ সালটা এক সরকার থেকে আর এক সরকারে পরিবর্তনের সময়, তাই সেটা বাদ দিয়েই হিসেব করা উচিত। তা যদি করা হয়, তা হলে হাতে থাকে মোটে দুই বছরের পরিসংখ্যান, এবং গড় ফারাক দাঁড়ায় ১০.৫%।

এর থেকে দুটো কথা সাব্যস্ত হয়। এক, জাতীয় ও রাজ্যের গড় আয়ের ফারাকের তুলনা করলে, এই সরকারের আমলে দেশের তুলনায় রাজ্যে ়উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে, তার পরিসংখ্যানগত প্রমাণ খুব মজবুত নয়। দুই, গড় ব্যাপারটাই এমন, যে বেশ কয়েক বছরের উপর ভিত্তি না করে মাত্র দু-তিন বছরের উপর ভিত্তি করলে, যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তা নির্ভরযোগ্য নয়। ২০১১ সালটা বর্তমান সরকারের শাসনকালের মধ্যে ধরা হবে, না বাদ দেওয়া হবে, তার উপর আমাদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে।

এই কারণে, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের আর জাতীয় গড় আয়ের বৃদ্ধির হার নিয়ে যে আলোচনা এই পাতাতেই বেরিয়েছে (অভিরূপ সরকার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৬) তার কিছু সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছু সংশয় থেকে যায়। এই প্রবন্ধের বক্তব্য, এই সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের গড় আয়ের বৃদ্ধির হার শুধু আগের জমানার বৃদ্ধির হারের থেকে বেশি নয়, সমসাময়িক জাতীয় বৃদ্ধির হারের থেকেও বেশি। কিন্তু, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গড় বৃদ্ধির হার হিসেব করলে বেরোয় ৫.৫% আর ২০১১ থেকে ২০১৪ এর মধ্যে গড় বৃদ্ধির হার হল ৫.৪%, অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য কোন তফাত নেই। এখন ২০১১ সালে বৃদ্ধির হার ছিল আগের এবং পরের বছরগুলোর তুলনায় বেশ কম, মাত্র ২.৭%। বছরটিকে বাদ দিলে (যা ওই প্রবন্ধে করা হয়েছে) ২০১২ থেকে ২০১৪-এর মধ্যে হিসেবে করলে গড় বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৬.৩%, যা আগের সময়সীমার গড় বৃদ্ধির হারের থেকে ভালো। কিন্তু পূর্বোক্ত যুক্তি-অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত খুব মজবুত নয়, কারণ তা নির্ভর করছে মাত্র একটি বছরকে ধরা হবে কি হবে না তার ওপরে।

আর এই সরকারের আমলে গড় আয়ের বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের থেকে বেশি এই তথ্যটি থেকেও খুব বেশি সান্ত্বনালাভ করা মুশকিল। বৃদ্ধি নিয়ে আগের আলোচনার সূত্র টেনে বলতে হয় যে ভারতের গড় আয় যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশি, পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হার জাতীয় বৃদ্ধির হারের থেকে খানিক বেশি হলে খুব একটা কৃতিত্ব দাবি করার নেই।

বিশেষত যেহেতু এই সরকারের প্রথম দিকটা হল ইউপিএ-জমানার শেষ দিকের অর্থনৈতিক মন্দার সময়, সেই সময়ে জাতীয় গড় আয়ের বৃদ্ধির হার গত দুই দশকের তুলনায় ঐতিহাসিক ভাবে কম। আর, ভারতের গড় আয়কে ছুঁতে হলে পশ্চিমবঙ্গের বৃদ্ধির হারকে জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হারের থেকে অন্তত ৩% বেশি হতে হবে টানা পাঁচ বছর ধরে। দু-এক বছর একটু বেশি হলে খুব একটা তফাত হয় না।

উন্নয়নের অন্য সূচকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার করার সুযোগ এখানে নেই, আর সব কটির জন্যে (যেমন, দারিদ্র) প্রাসঙ্গিক তুলনামূলক পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে প্রাপ্য নয়। স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত কিছু সূচক নীতি-আয়োগের কল্যাণে সহজেই পাওয়া যায়। যেমন সদ্যোজাত বা শিশুমৃত্যুর হারে পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ভারতের অন্য রাজ্যের তুলনায় আপেক্ষিক অবস্থান ২০১১ সালে যা ছিল, তার থেকে সর্বশেষ যে বছরের পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে (২০১৩ সাল), কোনও উন্নতি ধরা পড়ছে না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটা দীর্ঘমেয়াদি খেলা। বিশ্বাস বা অনুমানের কথা আলাদা। কেউ মনে করতেই পারেন যে এই সরকারের আমলে কিছু সংস্কার হয়েছে যার সুফল ক্রমশ প্রকাশ্য হবে। কিন্তু মাত্র কোন দু-তিন বছরের পরিসংখ্যান দিয়ে কোনও সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা কোনওটাই যাচাই করা যায় না।

 

লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স-এ অর্থনীতির শিক্ষক