Advertisement
E-Paper

সেলুলার ও সেলফি

সেলুলার জেলের কুঠুরিতে ঢুকেও ওঁরা সেলফি তুলতে মত্ত। আসলে ওঁরাও জেলবন্দি। এ জেল তাঁরা নিজের চার দিকে নিজেরাই বানিয়েছেন। চার পাশে তাকানোর অবকাশ বা ইচ্ছে নেই, শুধু নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা। লিখছেন বিশ্বজিৎ রায়।

বিশ্বজিৎ রায়

শেষ আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:০২
স্মৃতি-সাক্ষী। সেলুলার জেল, আন্দামান। ছবি: লেখক

স্মৃতি-সাক্ষী। সেলুলার জেল, আন্দামান। ছবি: লেখক

পুজোর পরে পরে। আন্দামানে তখন ট্যুরিস্টের মরসুম চলছে। ঝকঝকে আকাশ, নীল সমুদ্দুর। সেই নীল জল আবার আলো পড়ে নানারঙা নীল। চোখের আরাম হয়, মনেরও। মাঝে মাঝে দু’এক পশলা বৃষ্টি, তার পরেই আবার ঠিকঠাক। নীল আকাশ, নীল সাগর। আন্দামানিরা অবশ্য বৃষ্টিকে ভয় পান না, এখানে সারা বছরই বৃষ্টি কম-বেশি লেগে থাকে, সাগর আর বৃষ্টির সঙ্গেই তাঁদের ঘর। আইল্যান্ডের বৃষ্টির চরিত্রও মেনল্যান্ডের থেকে আলাদা। বৃষ্টি হলে অবশ্য একটা অসুবিধে হয়। সন্ধেবেলায় সেলুলার জেলে যে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হওয়ার কথা, তা বাতিল করে দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। পুরো সেলুলার জেলটাই যে এই লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মঞ্চ। বৃষ্টি হলে দর্শকরা সেই মুক্তমঞ্চে বসে ইতিহাস দেখবেন শুনবেন কী ভাবে!

বৃষ্টি না হলে ইতিহাস সবাক হয় জেলের ‘দিওয়ারে দিওয়ারে’। অন্ধকারে বসে থাকা শ্রোতা-দর্শকদের সামনে জেলের এক একটা জায়গায় আলো জ্বলে ওঠে, ধারাভাষ্য শোনা যায়। ওই যে দোতলার কোণের ঘর, যেখানে লাল আলো জ্বলে উঠল, ওখানে থাকতেন বীর সাভারকর। দশ বছর ছিলেন। অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। তাঁর ঘরের সামনেই ফাঁসিমঞ্চ। এমনিতে সহবন্দিদের সঙ্গে দেখা হওয়ার উপায় ছিল না তাঁর, জেলের কঠোর নিয়মমাফিক বন্দি করে রাখা হয়েছিল যে অপরিসর কুঠুরিতে সেখানেই দিনের পর দিন একা থাকা। ওপরে একটি আলো-না-ঢোকা ঘুলঘুলি। সহবন্দিদের সঙ্গে দেখা হলে তো দুটো কথা বলেও মন হালকা হয়, সে সুবিধে অত্যাচারী সাহেবরা নেটিভ দেশপ্রেমিককে দিতে চাননি। সাভারকর শুধু শুনতে পান ফাঁসি দেওয়ার আগের ‘ধর্মীয়’ কৃত্য, দেখতেও পান ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহযাত্রীদের। ওই তো কেন্দ্রীয় অংশে শোনা গেল উল্লাসকর দত্তের কণ্ঠ। গ্রামের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে উল্লাসকরের অভিজ্ঞতা ছিল, জানতেন কলুর বলদ সারা দিন ঘানি ঘুরিয়ে কতটা তেল বের করতে পারে। এই কারাগারে তো রাজনৈতিক বন্দিদের বলদের থেকে শক্তিশালী ‘পশু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বলিষ্ঠ কলুর বলদ সারা দিনে যতটা তেল বের করতে পারে তার থেকেও বেশি তেল বের করার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয় তাদের ক্ষেত্রে। আর তা করতে না পারলে নেমে আসত নির্মম প্রহার। প্রতিবাদ করলে বলা হত, এই হাতে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কঠিন অস্ত্র ধরতে পেরেছ আর সামান্য তেল বের করতে পারছ না! খাবারদাবারের কথা না বলাই ভাল। জেলে ঢোকার মুখে যে ঘন-পাতার গাছ, লাইট অ্যান্ড সাউন্ডে সে নিয়েছে সাক্ষীর ভূমিকা। ওম পুরীর গলায় বলে সে, অখাদ্য খাবার খেতে দেওয়া হত। পরতে দেওয়া হত যা, তাকে বস্ত্র বলা চলে না। বন্দিরা তাঁদের খাদ্যবস্ত্রের অধিকারের জন্য অনশন করতেন, তখন জোর করে খাইয়ে অনশন বন্ধ করার নির্মম চেষ্টা। জোর করে খাওয়াতে গিয়ে কণ্ঠরোধ হয়ে মারা গেলেন এক বিপ্লবী। সে হত্যা ধামা চাপা দেওয়ার জন্য পাথর বেঁধে দেহ ফেলে দেওয়া হল সমুদ্রে। ‘কালাপানি’তে তলিয়ে গেল দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা বিপ্লবী শরীর। সিপাহি বিদ্রোহের পর পুরো দ্বীপটাকেই ভাবা হয়েছিল উন্মুক্ত কারাগার, পরে তৈরি হল ষড়ঙ্গবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় স্তম্ভের চার পাশে ছড়িয়ে থাকা সাতবাহুওয়ালা জেলখানা, ১৯০৬-এর পর সশস্ত্র বিপ্লবীদের বন্দি করে রাখার জন্য আদর্শ এই ‘দিওয়ার’। সেই সশস্ত্র বিপ্লবীদের ক’জনেরই বা নাম আমাদের ইতিহাস পড়ুয়াদের চেনা! নামী-দামিদের পাশে অজস্র অনামা, তাঁদের নির্ভীক আত্মত্যাগ আর সাহস ব্রিটিশদের সন্ত্রস্ত করেছিল সন্দেহ নেই। বৃষ্টি নামলে সন্ধেবেলার এই কথকতা দেখার উপায় নেই।

দিনের বেলা অবশ্য বৃষ্টি মাথায় নিয়েও জেলখানা দেখা যায়। ছাতা ছাড়া ও ছাতাওয়ালা, দু’রকম ট্যুরিস্ট চোখে পড়ে। ভারতের নানা জায়গা থেকে এসেছেন তাঁরা। বাঙালিদের পাশাপাশি অবাঙালির ভারত। কিংবা, ইন্ডিয়া। মুক্ত অর্থনীতি এখন সব প্রদেশের ভারতীয়দের এমন পোশাকে আক্রান্ত করেছে যে, জামাকাপড় দেখে প্রদেশ চেনার উপায় নেই। কান পাতলে তাদের ভাষা শুনে ঠিক করে নেওয়া যায় খানিক, কে বাঙালি আর কে অবাঙালি। তাও সব সময় সে অনুমান মেলে না। এই নব্য ভারত আর এক দিক দিয়েও দেখলাম ঐক্যবদ্ধ। দেখার থেকেও দেখানোর স্পৃহা বড্ড বেশি। যা দেখছে তা দেখুক ছাই না দেখুক প্রতি মুহূর্তে তার ছবি তুলে রাখছে। শুধু তা-ই নয়, নিজেরা অলজ্জ ব্যগ্রতায় সে ছবির বিষয় হয়ে উঠতে চাইছে। নিজেই তুলছে নিজের ছবি, বা সঙ্গের বন্ধু-বন্ধুনি তুলে দিচ্ছে। সেলুলার জেলের ছোট ছোট কুঠুরিগুলো তালা বন্ধ থাকে না। ইচ্ছে করলে ভেতরে ঢুকে দেখা যায় কতটা অপরিসর মেঝেতে দিনরাত্রি কাটাতে হত দেশভক্তদের। স্বাধীন ভারতের যুবকযুবতীরা সেই অপরিসর কুঠুরিতে ঢুকছেন নিজেদের ছবি তোলার জন্য। ঢুকে গেট লাগিয়ে দাঁড়ালেন আর লোহার গরাদের অন্তরালে থাকা হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি-সানগ্লাসে হাসিখুশি ইন্ডিয়ার মজাদার ছবি উঠল।

বড় আত্মপরায়ণ, স্মৃতিহারা এই ‘সেলফি’-উৎপাদনকারী ইন্ডিয়া। সেলুলার জেলের ভেতরে যাঁরা বন্দি ছিলেন সেই রাজনৈতিক কর্মীদের দেশভাবনার মধ্যে হয়তো নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। সশস্ত্র বিপ্লবের উত্তেজনা অনেক সময় দেশ নির্মাণের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রকল্প গ্রহণের অন্তরায় হয়েছে। দেশের নামে বিশেষ এক ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষকে হয়তো কেউ বড় করে দেখেছিলেন। বাদ দিতে চেয়েছিলেন আর এক সম্প্রদায়কে, বহিরাগত বলতে চেয়েছিলেন বিশেষ ধর্মকে। কিন্তু এই প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নানা ভাবে প্রদর্শন করতে চাওয়া ‘আমাকে দেখুন’দের মতো আত্মপরায়ণ ছিলেন না তাঁরা। ছিলেন না বলেই তাঁরা সেলুলার জেলে বন্দি হয়েছিলেন। এখন ছবি তুলছেন যাঁরা তাঁরা কিন্তু আর এক জেলে বন্দি। এ জেল তাঁরা নিজের চার দিকে নিজেরাই বানিয়েছেন। চার পাশে তাকানোর অবকাশ বা ইচ্ছে নেই, শুধু নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা— কী ক্লান্তিকর এই ছবি তোলার জেল, তাঁরা নিজেরাই টের পাচ্ছেন না। রবীন্দ্রনাথের ‘কর্তার ভূত’-এর ভাষা ধার করে বলা যায়, ‘এ জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না।’ চোখে দেখা যায় না বলে ভাঙা আরও শক্ত।

সেলুলার জেলের ছাদে ওঠা যায়। সেখানে গরাদ নেই, কুঠুরি নেই। চোখ মেললে আদিগন্ত সমুদ্র। সেই দৃশ্যের সামনে নিজের ছবি তোলা কিছুক্ষণ বন্ধ। দূরে একতলায় ফাঁসিঘরের দেওয়ালে শেষ বিকেলের সূর্য চলে যাওয়ার আগে আলো বিছিয়েছে।

লেখক বিশ্বভারতীতে বাংলার শিক্ষক

cellular jail selfie biswajit roy
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy