Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

তৃতীয় ফ্রন্ট নয়, চাই শুধু দ্বিতীয় ফ্রন্ট

কংগ্রেসই প্রধান প্রতিপক্ষ

জয়ন্ত ঘোষাল
২৮ মার্চ ২০১৮ ০০:০৮

কলকাতা থেকে দিল্লি এসেছিলাম ১৯৮৭ সালে। তাই ’৭৭ সালের মোরারজি দেশাইয়ের জোট-যুগ চোখের সামনে দেখিনি, কিন্তু ’৮৯ সালে কী ভাবে বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহের সরকার গঠন হল, তার পর মাত্র এক বছরের মধ্যেই কী ভাবে সে-সরকারের পতন হল, সে-সব খুব কাছ থেকে দেখেছি। ফি-সপ্তাহে বিশ্বনাথপ্রতাপ জোট রক্ষার জন্য নৈশভোজের আয়োজন করতেন। সে-ভোজসভায় মান্ডার রাজা মধ্যমণি হয়ে বসতেন। বাঁ-দিকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো বামপন্থীরা মাছ-মাংস খেতেন। আর ডান দিকে আডবাণীরা। তাঁদের জন্য নিরামিষ আয়োজন থাকত। বিশ্বনাথপ্রতাপ যে-ভাবে কংগ্রেস-বিরোধিতার তাস ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে একত্রিত করেছিলেন, তার শেষরক্ষা হয়নি। মণ্ডল আর কমণ্ডলুর সংঘাতের রাজনীতি শুধু যে সেই জোটের পতন ঘটিয়েছিল, তা-ই নয়, মৃত্যুর আগে বিশ্বনাথপ্রতাপ আমাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর কংগ্রেস-বিরোধিতার সুযোগ নিয়ে এ-দেশে বিজেপির মতো শক্তির বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তখন তাঁর নিয়মিত ডায়ালিসিস চলছে। হাসপাতালের ঘরে বসে-বসে তেল-রং দিয়ে ছবি আঁকতেন আর কবিতা লিখতেন। বিশ্বনাথপ্রতাপের ঘনিষ্ঠ ওয়াসিম আহমেদ কংগ্রেসে যোগ দেন, রাজ্যসভার সদস্য হয়ে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের মুখপাত্র হন। সেই ওয়াসিম আজ বলেন, মৃত্যুর আগে বিশ্বনাথপ্রতাপ সনিয়া গাঁধীর কাছে বফর্স নিয়েও ক্ষমা চেয়ে এসেছিলেন।

ভারতের রাজনীতিতে সে-দিন আর আজ— ব্যবধান বিস্তর। আজ বিজেপি এক প্রবলপরাক্রান্ত দল। এই দলের কান্ডারি নরেন্দ্র মোদী। ‘দার্শনিক রাজা’ নন বটে, কিন্তু ক্ষমতার কৌশলী রাজনীতির এক সফল রূপকার। বিজেপির সবচেয়ে ‘ক্যারিসমাটিক’ নেতা, আর তার সঙ্গে আছেন এক ভোটযন্ত্র, যাঁর নাম অমিত শাহ। বলতেই হবে, গত চার বছরে বিজেপি ১২টি রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। এ-অবস্থায় আবার আওয়াজ উঠেছে, মোদীকে সরানোর জন্য চাই জোট। চাই ফ্রন্ট। আবার আওয়াজ উঠেছে, চাই তৃতীয় ফ্রন্ট। এই ‘তৃতীয় ফ্রন্ট’ নামক বিষয়টি আজ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতিতে সফল হতে পারেনি। কংগ্রেস ও বিজেপি, দুই প্রধান দলের সহায়তা ছাড়া তৃতীয় ফ্রন্ট দিল্লির তখ্‌তে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে কোনও দিনই পারেনি।

ভারতের রাজনীতি পুরনো ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। কখনও কংগ্রেস, কখনও বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির দিকে ঘুরেছে। কংগ্রেস পরিচালিত জোট হোক অথবা বিজেপি পরিচালিত জোট, এই মেরুকরণ আজও অপ্রাসঙ্গিক হয়নি। ঠিক কথা, ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ৪৪টি আসন পায়। জরুরি অবস্থার পরে, এমনকী ’৮৯ সালে বিশ্বনাথপ্রতাপের সরকার গঠনের সময়েও এত কম আসন কংগ্রেস কখনও পায়নি। এর কারণ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, হরিয়ানা, হিমাচলপ্রদেশ— এ-সব রাজ্যে বিজেপি একাই মোদী-ঝড়ে অধিকাংশ আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। ২০১৯ সালে যখন আর একটা লোকসভা ভোট হতে চলেছে, তখন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ভিত্তিতেই তো বিরোধীরা আসন বাড়াবার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু উপরোক্ত রাজ্যগুলিতে তো আজও কংগ্রেসই বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ। এ-সব রাজ্যে কংগ্রেস ভাল করতে না পারলে তৃতীয় ফ্রন্টেরই বা লাভ কোথায়?

Advertisement

ধরা যাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে ৪২টি আসন পেলেন। তেলঙ্গানার নেতা কেসিআর ১৭টি আসনের সব ক’টিই পেলেন। অখিলেশ-মায়াবতী জোট উত্তরপ্রদেশের সব আসন পেলেন। কিন্তু তাতেও দিল্লির তখ্ত দখল করা যায় না। ৫৪৭টি আসনের মধ্যে অন্তত ১০০টি আসন আছে, যেখানে কংগ্রেস এবং বিজেপির সম্মুখসমর। ২০১৪ সালে বিজেপি এই আসনগুলির মধ্যে ৯৭টা আসন ছিনিয়ে নেয়। আজ এ-কথা বললে অন্যায় হবে না যে, পরিস্থিতি আজ যা, তাতে বিজেপির সংখ্যা এই সব আসনে কমবে বই বাড়বে না। সেখানেই কংগ্রেসের সুযোগ। এবং সেখানেই কংগ্রেসের গুরুত্বও।

সমস্যা একটাই, মোদী-বিরোধী এই জোট গঠন কতটা সম্ভব! মোদী এবং মোদী-বিরোধী লড়াইকে কি ১:১ করা সম্ভব? এ-কথা সত্য, দীর্ঘদিন ভারতের মতো এক বিশাল দেশকে শাসন করার ফলে কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দলের নেতৃত্বের মধ্যে এক জমিদারি মনোভাব এসেছিল। পচমঢ়ীতে প্রথম সনিয়া গাঁধী দলের সেই সাবেকি সর্বভারতীয় ‘একলা চলো রে’ মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে জোট-যুগের প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করেন। সেই উপলব্ধির ফসলই হল ইউপিএ।

মোদী সরকারের চার বছর অতিবাহিত। গত জানুয়ারি মাসে শিবসেনা ঘোষণা করেছে, ২০১৯ সালে তারা একা লড়বে। দু’মাস পরই তেলুগু দেশম পার্টি এনডিএ ছাড়ল। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, এমনকী উত্তরপ্রদেশে ১০টি লোকসভা উপনির্বাচনে বিজেপি ৯টিতে হেরেছে। গত ডিসেম্বরে গুজরাতে বিজেপিকে ধাক্কা দিয়েছে কংগ্রেস। উত্তরপ্রদেশে মায়াবতী ও অখিলেশ যাদব একত্র হয়েছেন। শিবসেনার মুখপত্র ‘সামনা’ কাগজের মূল্যায়ন: ১০০ থেকে ১১০টা আসন বিজেপির কমবে ২০১৯ সালের ভোটে।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিরোধীদের একত্র হওয়া খুব জরুরি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মোদীকে সরাতে একই ভাবে উৎসাহী রাহুল এবং মমতা এবং আরও কয়েক জন আঞ্চলিক নেতা। কিন্তু তাঁরা একই ভাবে প্রধানমন্ত্রী পদেরও দাবিদার।

লালকৃষ্ণ আডবাণীর কাছে আমি চরণ সিংহের একটা মজার গপ্পো শুনেছিলেম। তিনি আডবাণীকে বলেন, জানো তো, আমি কেন প্রধানমন্ত্রী হতে চাই, এই প্রশ্ন করেছিল এক নবীন সাংবাদিক। তা, তাকে আমি বলেছিলাম, তুমি রিপোর্টার, তুমি সম্পাদক হতে চাইবে না? আমি মন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হতে চাই। আডবাণী বলেছিলেন, এই ইচ্ছেটা নিয়েই বিপদ। সবাই কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন? মজার ব্যাপার, আডবাণীও হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আডবাণী বলেন, যখনই আমি বুঝতে পারি বাজপেয়ী বেশি গ্রহণযোগ্য চরিত্র, তখনই আমি তাঁর নাম নিজেই প্রথম ঘোষণা করি।

আজও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য ভোটের আগে ‘কিস্সা কুরসি কা’ যদি বাড়তেই থাকে, তবে সবচেয়ে আহ্লাদিত হবেন নরেন্দ্র মোদী। বিজেপি তো চাইছেই বিজেপি শিবিরে যেমন আজও মোদী বিনে গীত নাই, মোদী-বিরোধী শিবিরে তেমনটা যেন না হয়। আর সেখানে তো প্রধানমন্ত্রী পদের বিবিধ প্রার্থী। অতএব রাহুল গাঁধীর কংগ্রেস যেমন আছে, তেমনই কংগ্রেস-বিরোধী প্রকাশ কারাটের তৃতীয় ফ্রন্ট আছে। আবার আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আর এক ফেডেরাল ফ্রন্ট।

সত্যি কথা বলতে, মমতা কিন্তু আজ নয়, মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ফেডেরাল ফ্রন্ট গঠনের কথা বলছেন। নীতীশ কুমার যখন বিজেপির বিরুদ্ধে ছিলেন, সে সময় তিনি আঞ্চলিক দল নিয়ে গঠিত এমন ফ্রন্টের প্রাসঙ্গিকতা তাঁকেও বোঝানোর চেষ্টা করেন। আমি নীতীশবাবুর সঙ্গে ওঁর বাসভবনে লিট্টি খেতে-খেতে বলেছিলাম, বিজেপির সঙ্গে গেলে আপনার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ভুলতে হবে। নীতীশ তাঁর বাসভবনের লনে বসে বলেছিলেন, ভাইয়া, আগে তো মুখ্যমন্ত্রিত্ব রক্ষা করি।

মমতা একাই একশো, কোনও লালুপ্রসাদ যাদবকে ছাড়াই। তিনি রাজ্যে এক বিরাট শক্তি। কিন্তু মমতাও বুঝতে পারছেন, আজ তৃতীয় ফ্রন্ট, চতুর্থ ফ্রন্ট, পঞ্চম ফ্রন্ট নয়, নরেন্দ্র মোদী নামক এক প্রবল শক্তির মোকাবিলা করার জন্য চাই শুধু দ্বিতীয় ফ্রন্ট। মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি যদি হয় প্রথম ফ্রন্ট, তবে বিরোধীরা, রাহুল-মমতাসহ, সবাই মিলে হোক সম্মিলিত দ্বিতীয় ফ্রন্ট।

আরও পড়ুন

Advertisement