ভারত প্রায়ই দাবদাহের কোপে পড়েছে। রেকর্ড বিদ্যুৎ চাহিদা, জলসঙ্কট, কৃষির ক্ষতি, কাজের শ্রমঘণ্টায় প্রভাব পড়েছে। কিন্তু গবেষণায় ইঙ্গিত, পরিস্থিতির ক্রম অবনমন হবে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাত কমবে এবং চরম তাপমাত্রায় দেশে এক দিনেই ৩৪০০ অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। পাঁচ দিনের তাপপ্রবাহেই এই সংখ্যা ১০০০০ ছুঁতে পারে। আশঙ্কা সত্যি হওয়ার পথে। বিশ্বের উত্তপ্ত শহরের প্রথম ৫০টিই এখন ভারতে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে তো বটেই, রাতেও তাপ কমছে না, ফলে মানবশরীর বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছে না। উদ্বেগের বিষয়, বহু সময়েই হিটস্ট্রোক-জনিত মৃত্যুর স্পষ্ট চিত্র মেলে না। হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট, পেটের অসুখ ইত্যাদি বলে চিহ্নিত হওয়ার সমস্যা থাকে। ফলে, এই সতর্কতাকে কেবল ঋতুগত সমস্যা হিসাবে দেখে মানুষকে প্রকৃতির রোষের হাতে ছাড়লে চলবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে তার অবশ্যম্ভাবী প্রকোপ এড়াতে আগাম প্রস্তুতি, ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতারই পরীক্ষা। শুধু প্রচার নয়, স্পষ্ট, বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা অত্যাবশ্যক।
কোথায় জলাভাব দেখা দিতে পারে, কোথায় হাসপাতালে চাপ বাড়তে পারে— জেনে প্রশাসনকে তৈরি হতে হবে। কৃষি দফতরের দায়িত্ব আগেভাগে জানানো কখন মাঠে কাজ করা নিরাপদ, কোন ফসল গরমে নষ্ট হয়, সেচের পরিকল্পনা কী ভাবে বদলাবে। কারণ, তাপপ্রবাহের ক্ষতি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, উৎপাদনশীলতা কমে, সম্পদ ও কাজের সময় নষ্ট হয়, বিদ্যুতের চাহিদার কারণে অর্থনীতির উপর আরও চাপ পড়ে। ট্র্যাফিক পুলিশ, নির্মাণকর্মী, হকার, ডেলিভারি কর্মী ও আরও যাঁরা রাস্তায় কাজ করেন তাঁদের বাধ্যতামূলক মধ্যাহ্নবিরতি, ঠান্ডা পানীয় জল, ছাউনির ব্যবস্থা জরুরি। দিল্লিতে দুপুর একটা থেকে চারটে শ্রমিকদের বিশ্রাম, ওআরএস সরবরাহ, বস্তি এলাকায় ছাদ ঠান্ডা করার ব্যবস্থা ইত্যাদির পরিকল্পনা হয়েছে। ২০০৩-এর প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের পর ফ্রান্স হিটওয়েভ প্ল্যান তৈরি করে যে চার স্তরীয় সতর্কতা নিয়েছিল সেই মডেল হুবহু এখানে প্রয়োগ মুশকিল, তবে আগাম পরিকল্পনা যে মৃত্যুঝুঁকি কমায় তা দেশেরই আমদাবাদের হিট অ্যাকশন প্ল্যান-এ প্রমাণিত। নৈতিক শিক্ষা স্পষ্ট। কর্মসূত্রে রাস্তায় থাকা মানুষ, শিশু, একাকী বৃদ্ধ, অসুস্থ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাঁদের ঝুঁকি সর্বাধিক তাঁদের সমস্যা বিচার করে নীতি তৈরি করা জরুরি।
অসুরক্ষিত চার দেওয়ালের অভ্যন্তর বাইরের চেয়েও তপ্ত হতে পারে। অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচল, ঘনসন্নিবিষ্ট বস্তি ও নিম্নমানের আবাসনে থাকতে বাধ্য মানুষ, টিনের ঘরে আবদ্ধ কুটিরশিল্পী, রান্নায় ব্যস্ত মানুষও বিপন্ন। একা প্রবীণদের প্রতি নিয়মিত লক্ষ রাখা চাই, অনেকেই তৃষ্ণা বা অসুস্থতার লক্ষণ বুঝতে অপারগ। হিটস্ট্রোক ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীকক্ষ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট রোধ, সবুজায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ, ছাদ ঠান্ডা করার প্রকল্প, তাপ-সহনশীল আবাসন— এগুলি কোনও সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের অলঙ্কার নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার আবশ্যিক পরিকাঠামো হিসাবে বিবেচ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়া ঘন ঘন হওয়াই বিধি। অতএব, ঝড়ের পূর্বাভাসের পরে যে তৎপরতার দেখা মেলে, এ ক্ষেত্রেও সে ভাবেই দুর্যোগ-মোকাবিলার প্রস্তুতি প্রয়োজন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)