• দেবাশিস ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ভারতমাতার আসন আমাদের অন্তরে চিরস্থায়ী

অদ্ভুত আঁধার এক

Protest

দু’টি খবর। একটি পীড়িত করে, অন্যটি স্তম্ভিত। প্রথমটি নদিয়ার তাহেরপুরের। উৎস একটি ভিডিয়ো। এক কাশ্মীরি যুবককে মেরে রক্তাক্ত করার দগদগে ছবি। দ্বিতীয়টি একটি টুইট। সেটি তথাগত রায়ের। ভারতের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং সংবিধানের প্রতি  ‘সচ্চি শ্রদ্ধা’ রাখার শপথ নিয়ে যিনি এক জন রাজ্যপাল। তাঁর আহ্বান: কাশ্মীর এবং কাশ্মীরি জিনিস বয়কট করুন!

এ সব ঘটনা যখন ঘটেছে, ভারতীয় বায়ুসেনা তখনও নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে জঙ্গিদের উপর আঘাত হানেনি। তখন শুধু পুলওয়ামা-কাণ্ড দেশকে নড়িয়ে দিয়েছিল। এ বার পাক মদতে পুষ্ট জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ভারতের ‘জবাব’ অবশ্যই দেশবাসীর অন্তরের আগুনকে খানিকটা প্রশমিত করতে পারবে। পাশাপাশি এর ফলে নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী সুবিধার পথ প্রশস্ত হল কি না, সেটাও  আলোচনার বাইরে থাকবে না বলে মনে হয়।

কিন্তু এই লেখার আলোচ্য তা নয়। বরং জঙ্গি দমনের জায়গায় আমাদের দেশের নির্দিষ্ট একটি  জনসমষ্টিকে কী ভাবে ‘জঙ্গি’ বা ‘দেশদ্রোহী’ সাজানোর চক্রান্ত হল এবং কী ভাবে দেশের শাসককুল কার্যত তার প্রতি নীরব সায় দিয়ে গেলেন, সেই রাজনীতিটাও একটু স্পষ্ট করা দরকার। চেনা দরকার সেই সব ‘খেলোয়াড়’ ও তার মদতদাতাদের।

তাহেরপুরে প্রহৃত যুবকের নাম জাভেদ আহমেদ খান। বহুকাল ধরে কাশ্মীর থেকে শীতের মরসুমে শাল বেচতে আসেন তাঁরা। এ বারেও এসেছেন। জাভেদের ‘অপরাধ’, তিনি কাশ্মীরি এবং তাঁরই রাজ্যের পুলওয়ামায় জঙ্গি হানায় প্রাণ গিয়েছে ৪৯ জন জওয়ানের। ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, মেরে নাক-মুখ ফাটিয়ে দেওয়ার সময় মারমুখীরা জাভেদকে গালাগালি দিয়ে বলছে, ‘বল বন্দে মাতরম্। বল ভারতমাতা কি জয়।’

আমরা ভারতবাসী। ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলা আমাদের জন্মগত, মর্মগত অধিকার। গর্ভধারিণী মায়ের মতোই দেশমাতৃকার স্থানও আমাদের অন্তরে। কিন্তু পুলওয়ামার মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই মনে হচ্ছে, দেশপ্রেম বোঝাতে বাহ্যিক আড়ম্বর প্রকাশ যেন বাধ্যতামূলক। আর তার জন্য জবরদস্তি করাকে একদল লোক ‘প্রকৃত দেশপ্রেম’ বলে ভাবছে! তার চেয়েও গুরুতর হল, দেশের একটি রাজ্যের নির্দিষ্ট একশ্রেণির মানুষকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার মারাত্মক প্রবণতা ছড়ানো। এ-ও তো এক যুদ্ধই!

কলকাতার অনেক বছরের বাসিন্দা এক কাশ্মীরি চিকিৎসক ও তাঁর পরিবারের কথাও এখানে একই কারণে উল্লেখ করতে হবে। তাঁকে হুমকি দেওয়ার কথা তো ছেড়েই দিলাম, তাঁর মেয়েরা স্কুলে গিয়ে চাপের মুখে পড়েছে, এমন ঘটনারও খবর মিলেছে। 

ভাবতে ভাল লাগে, আক্রান্তেরা সবাই বলেছেন, কতিপয় লুম্পেনের জন্য তাঁরা এই রাজ্য, এই শহর ছেড়ে চলে যাবেন না। কারণ তাঁদের কাছে এই রাজ্য নিরাপদ। কিন্তু এ সব দেখলে, জানলে কোথাও একটি বিপদঘণ্টা বাজতে থাকে। আতঙ্ক শতগুণ বাড়ে যখন দেখা যায়, বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের বহু নেতাও এই সব উন্মত্ততার পাশে দাঁড়িয়ে একে দেশপ্রেমের আবেগ বলে গৌরবান্বিত করছেন! বোঝাচ্ছেন, বেশ করেছে!

যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের চলা-বলায় হরেক হিসেব থাকে। কিন্তু রাজনীতির বিষবাষ্প যখন গোটা সমাজকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেয়, ব্যক্তি-জীবন যখন আতঙ্কের শিকার হয়ে ওঠে, মনুষ্যত্ব লোপ পায়, তখন সেই রাজনীতির কুশীলব ও পৃষ্ঠপোষকদের শুভবুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই হয়।

পুলওয়ামার ঘটনার পরে এই রাজ্যে দেশপ্রেমের ডাক দিয়ে যে সব অপ্রীতিকর, হিংসাত্মক কাণ্ড ঘটছে এবং বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার তাকে যে ভাবে সমর্থন করছে, তাতে তাদের রাজনৈতিক লাভ কতটা কী হচ্ছে বলতে পারব না। তবে একটি দায়িত্বশীল জাতীয় দলের কাছে এটা যে প্রত্যাশিত নয়, সে কথা অবশ্যই বলার সময় এসেছে। দেশের একটি রাজ্যের ভূমিপুত্রদের দিকে আঙুল তুলে তাঁদের সকলকে সরাসরি ‘দেশদ্রোহী’ বলার এবং আক্রমণ করার যে নজির তৈরি করা হচ্ছে তার সুদূর পরিণতি কি ওই নেতারা এক বারও ভেবে দেখেছেন? জোর করে এ ভাবে ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ জাগিয়ে তুলে সামগ্রিক ভাবে কাশ্মীরিদের আলাদা করে দেওয়ার অপচেষ্টা ভারতের ঐক্য-সংহতির পক্ষে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, সেটা না বুঝলে তা চরম দুর্ভাগ্যের।

যারা সন্ত্রাসবাদী, যারা উগ্রপন্থী তাদের দমন করার প্রশ্নে কারও কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না। যে কোনও মূল্যে তা করতেই হবে। সন্ত্রাসীদের কোনও জাত-ধর্ম-স্থান বিচারও অর্থহীন। তাদের একটাই পরিচয়, তারা মানবতার শত্রু। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদকে মদত দিচ্ছে, এটাও ঘটনা। কিন্তু কাশ্মীরি মানেই সেই দোষে দুষ্ট— রাজনীতিকেরা এমন নির্বিচার বার্তা ছড়িয়ে দিতে থাকলে তা মেনে নেওয়া কঠিন।

পুলওয়ামার ঘটনার জন্য কেন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা কাশ্মীরিদের? তাঁরা তো আমাদের সকলের মতো স্বাধীন ভারতের নাগরিক। আমাদেরই মতো ভোটদানের অধিকারী। তা হলে আজ তাঁদের সবার দিকে দেশদ্রোহিতার আঙুল তুলে কার কী রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ হচ্ছে? এই ধরনের আক্রমণও কি সন্ত্রাসের নামান্তর নয়?

সুস্থবুদ্ধির নেতারা নিশ্চয় এমন চান না। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। তবে সেই বার্তা পৌঁছনোও খুব জরুরি। ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আর বিলম্ব নয়। বিজেপি এখন দেশের শাসক দল। দায়িত্ব তাদেরই বেশি। তারা ক্ষমা চাইবে কি?

এই সূত্রেই এ বার বলব মেঘালয়ের বর্তমান রাজ্যপাল তথাগত রায়ের কথা। বিজেপির শীর্ষনেতা হিসাবে এই রাজ্য তাঁকে দেখেছে। দলের রাজ্য সভাপতি ছিলেন। ভোটে লড়েছেন এবং হেরেছেন। মোদীর জমানায় ত্রিপুরায় রাজ্যপালের দায়িত্ব পালনের পরে বঙ্গসন্তান তথাগতবাবু এখন মেঘালয়ের রাজভবনে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পড়াশুনো, বিচার-বিশ্লেষণ, গভীরতা আর পাঁচ জনের তুলনায় অধিক মান্যতা পায়।

কিন্তু সেই তথাগতবাবু রাজ্যপাল হওয়ার পর থেকেই তাঁর সাংবিধানিক মর্যাদাকে কার্যত রাজনীতির পায়ে সঁপে দিয়ে রাজভবন থেকে দলীয় নেতার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। আগরতলা থেকে শিলংয়ে গিয়েও তাঁর সেই অভ্যাস বদলায়নি।

রাজভবনগুলিকে দেশের শাসক দলের ‘দফতর’ এবং রাজ্যপালদের কেন্দ্রের ‘এজেন্ট’ বলে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক রেওয়াজটা অনেক পুরনো। কিন্তু অন্তরে যা-ই থাক, বাইরে একটা আপাত-নিরপেক্ষ মুখ নিয়েই রাজ্যপালেরা কাজ করে থাকেন। তথাগত রায় সে দিক থেকে এক বড় ব্যতিক্রম বলতে হবে। রাজভবনে বসে ক্রমাগত সোশ্যাল নেটওয়ার্কে তিনি তাঁর পুরনো দল বিজেপির পক্ষে রাজনৈতিক প্রচার থেকে শুরু করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে কু-কথা, আক্রমণ শানানো কোনও কিছুই বাকি রাখছেন না। এমনকি, বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারও তাঁর এই ‘স্খলন’ মেনে নিয়ে কার্যত রাজ্যপালের পদের অবনমন নিশ্চিত করে চলেছে বললে হয়তো খুব ভুল বলা হবে না।

কিন্তু ‘বেলাগাম’ রাজ্যপাল তথাগতবাবু এ বার কাশ্মীরিদের বয়কট করা এবং কাশ্মীরের শাল বা কোনও পণ্য কেনা উচিত নয় বলে আগুন উস্কে দেওয়ার পরেও কেন্দ্রের সরকার ও তার সমর্থক-পৃষ্ঠপোষকদের মুখে কুলুপ আঁটা দেখে স্তম্ভিত হতে হয়! প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা কী করে এই ধরনের কথাবার্তাকে প্রশ্রয় জোগান, কেন এই রকম কথার পরেও এই রাজ্যপালকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করা হল না, কেন তিনি বহাল তবিয়তে ‘সাংবিধানিক’ পদ আঁকড়ে বসে রয়েছেন, সেই সব প্রশ্ন তোলার অধিকার দেশবাসীর আছে।

মৌন কি এ ক্ষেত্রেও তা হলে সম্মতির লক্ষণ বলে গণ্য হবে? 

উত্তর কে দেবে? সত্যি, এ এক অদ্ভুত আঁধার!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন