এ সমাজের ক্ষমা চাওয়ার আছে সমকামী মানুষের কাছে। উচ্চারণ সুপ্রিম কোর্টের। সমকামী মানুষজনকে বা তাঁদের পরিবার-পরিজনকে বছরের পর বছর ধরে যে প্রতিকূলতা দিয়ে এসেছে এ সমাজ, তার জন্যই ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া উচিত। মত বিচারপতির। এই উচ্চারণ, এই মতামত প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত বছরের শৃঙ্খল এবং আরোপিত কালিমা ছিঁড়ে-ছুটে, ধুয়ে-মুছে, ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছে। শত শত বছর ধরে কোনও এক ডাকিনীর শাসনের কারণে জমে বরফ হয়ে থাকা এক রূপকথার রাজ্যে যেন বসন্ত এসেছে লহমায়, চোখের নিমেষে ধূসর উড়ে গিয়ে যেন রামধনু রং খেলে গিয়েছে সে রাজ্যের আকাশ জুড়ে।

ব্রিটিশ জমানার এক আইন। ব্রিটিশ নৈতিকতা বা সে যুগের ইউরোপীয় নৈতিকতায় সমকাম অপরাধ ছিল। তাই ব্রিটিশ শাসিত ভারতকেও মানতে হয়েছিল, সমকাম অপরাধ। মুখে মুখে বা মনে মনে নয়, একেবারে আইনি লেখের মাধ্যমে অপরাধের তকমা দেওয়া হয়েছিল সমকামিতাকে। সে আইনের বা সে বিভ্রমের উত্তরাধিকার এতদিন ধরে বহন করে এসেছে ভারত। অবশেষে ঝেড়ে ফেলা গেল অনর্থক বোঝাটা।

অনেকগুলি ক্ষেত্রেই ভারতে প্রচলিত সামাজিক অভ্যাসের চারপাশে ইউরোপীয় নৈতিকতার বেড়াজাল তৈরি করেছিল ব্রিটিশরা। ভারতীয় সভ্যতা কিন্তু এক কালে ওইসব তথাকথিত নৈতিকতায় বিশ্বাসী ছিল না। ভারতীয় পুরাণ বা ভারতীয় মহাকাব্যের নানা ব্যাখ্যায় চোখ রাখলেই খুব স্পষ্ট হয়ে যায় সে কথা। কৃষ্ণের প্রতি সুদামার প্রেমকে সমকামিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন মহাভারতের একাধিক টিকাকার। ভগীরথের জন্মবৃত্তান্তেও অন্যধারার যৌনতার ইঙ্গিত রয়েছে। বহুগামিতার নিদর্শন রয়েছে অজস্র। পুরুষ বা নারী, উভয়েরই যে একাধিক বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার ছিল, মহাকাব্য তারও সাক্ষী। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত নতুন ধরনের নৈতিকতায় অভ্যস্ত হতে শুরু করে। তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসকদের হাত ধরে ভারত তৎকালীন ইউরোপীয় নৈতিকতায় উপনীত হতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন প্রচলিত সামাজিক অভ্যাস ত্যাগ করে বা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু যাঁরা এ দেশে এসে সমকামিতাকে অপরাধের তকমা দিয়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু পরে নিজেদের দেশে ওই আইন বর্জন করেছেন। ভারত এতদিন বর্জন করতে পারেনি, সেই তিমিরেই থেকে গিয়েছিল। এ বার মুক্তি মিলল। অনাবশ্যক বিধিনিষেধের একটা জাল ছিন্ন হয়ে গেল বহু বছরের সংগ্রামের সুবাদে।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

মহাকাব্যে বা পুরাণে বা প্রাচীন ভারতীয় সমাজের আখ্যানে যা কিছু বর্ণিত, সেই সব কিছুই বৈধ, এমন নয়। খুন-জখম, বিশ্বাসঘাতকতা বা লুণ্ঠনের বর্ণনাও সেখানে মিলবে। তার মানে তো এই নয় যে, খুন বা বিশ্বাসভঙ্গ বা লুণ্ঠনও বৈধ। কিন্তু সে প্রশ্ন তোলাই অবান্তর। কারণ, দুই ধরনের ঘটনার উপস্থাপনায় সুস্পষ্ট ফারাক রয়েছে। খেয়াল করতে হবে যে, খুন-জখম বা বিশ্বাসভঙ্গ বা লুণ্ঠনের উপস্থাপনা নেতির আলোকে হয়েছে মহাকাব্যে। কিন্তু সমকামিতা বা বহুগামিতা বা একাধিক বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া নিয়ে তেমন কোনও নৈতিকতা সংক্রান্ত প্রশ্ন মহাকাব্যে বা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে তোলা হয়নি। বিষয়গুলিকে নেতির আলোকে উপস্থাপিত করা হয়নি আদি ভারতের সমাজচিত্রের বিবৃতিগুলোয়। অতএব, সমকামিতাকে সর্বোচ্চ আদালত বৈধতা দেওয়ায় ‘ভারতীয়ত্বের’ যে ধ্বজাধারীরা গেল গেল রব তুলছেন, তাঁদের উচিত একটু থেমে যাওয়া। উচিত পিছন ফিরে তাকানো এবং বোঝার চেষ্টা করা— আদৌ কি ভারতীয় সমাজের বিপক্ষে গেল এ রায়? নাকি ভারতীয় বোধের উপরে তৎকালীন ইউরোপীয় নৈতিকতার যে প্রলেপ পড়েছিল, সেই প্রলেপকেই এত দিন পরে ঝেড়ে ফেলতে সমর্থ হলাম আমরা?

আরও পড়ুন: সমকামিতা অপরাধ নয়, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

আরও পড়ুন: নতুন করে স্বাধীনতার স্বাদ পেলাম আজ: মানবী

শত যুক্তিতেও অবশ্য অনেককে থামানো যাবে না। সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর মতো সুপণ্ডিতও বলবেন, সমকামিতা বৈধতা পাওয়ায় এডস বাড়বে। কট্টরবাদী সংগঠনগুলো বলবে, সমকামিতা প্রকৃতির নিয়মের বিপ্রতীপ। অতএব, সংগ্রামটা যাঁরা করছিলেন, তাঁদের জেনে রাখা দরকার, সংগ্রাম শেষ হয়নি এখনও। একটা বিরাট শৃঙ্খলকে সুপ্রিম কোর্ট ছিঁড়ে দিয়েছে, সে কথা ঠিক। সমকামী নাগরিকদের সামনে আর কোনও রাষ্ট্রীয় অবরোধ নেই। কিন্তু বাধা-বিপত্তি এখনও অনেক রয়ে গিয়েছে। আইনি সমস্যা হবে না। কিন্তু সামাজিক অবরোধ এখনও থাকবে। এখনও এলজিবিটি জনগোষ্ঠীকে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখবেন, কটাক্ষ ছুড়বেন, হেনস্থা করবেন। কিন্তু জেনে রাখুন, সে হেনস্থাও চিরস্থায়ী হবে না। রাষ্ট্রীয় হেনস্থার আশঙ্কা অতীত। এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে অনেক মানুষের সামনে। এই দিগন্ত পেরিয়ে গেলে এখনও হয়তো অন্ধকার মিলবে। কিন্তু অচিরেই সে অন্ধকারও কাটবে। সভ্যতার ইতিহাসই সে ইঙ্গিত দিচ্ছে।