লেখার জন্য লেখকদের কি কোনও সম্মান-দক্ষিণা থাকা উচিত? রবীন্দ্রনাথের বিদূষী ভাগিনেয়ী ‘ভারতী’-সম্পাদিকা সরলা দেবীর এ ব্যাপারে স্পষ্ট মত ছিল— না।  লেখার  বিনিময়ে লেখকদের টাকা না দিতে বদ্ধ-পরিকর সরলাদেবীর মতে, সরস্বতীর বাণিজ্য দিয়ে লক্ষ্মীলাভের চেষ্টা করা অরুচিকর। এ নিয়ে তাঁর সঙ্ঘাতও বেধেছিল খোদ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই।  

সঙ্ঘাতের সূচনা অবশ্য সরলাদেবীই করেছিলেন। পৃথিবী টাকার বশ, প্রচলিত এই প্রবচনে ধরা দিয়েছেন মাতুল। ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। কারণ আর কিছু নয়। লেখার জন্য ‘প্রবাসী’ সম্পাদক সেই সময় তিনশো টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে এবং তিনি  তা গ্রহণ করেছিলেন সানন্দে।

‘ভারতী’ পত্রিকায় সরলাদেবী লিখেছিলেন, ‘‘প্রবাসী সম্পাদক ‘বাল্মিকী প্রতিভা’র কবিকেও সরস্বতীর বিনা পণের মহল হইতে ছুটাইয়া লক্ষ্মীর পণ্যশালায় বন্দী করিয়াছেন।’’ 

লেখার জন্য টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল সরলার বিপরীতে। লক্ষ্মী তাঁর ‘লেখনীর  উপর স্বর্ণবৃষ্টি করলে’ তিনি মোটেই দুঃখিত হবেন না, এই ছিল রবীন্দ্রনাথের মত। ফলে সরলার বাচালতায় বেজায় ক্ষুব্ধ হলেন তিনি । তখনই কিছু বললেন না। ১৩৩৩ সালের আশ্বিনের ‘সবুজপত্র’-এ  সরলার লেখার কঠোর সমলোচনা করলেন।

যে তিনশোটি টাকা ‘প্রবাসী’ সম্পাদক অগ্রিম রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন তাঁর পত্রিকায় লেখার জন্য, সে-টাকার পরিণতিতে বাংলা সাহিত্যের পাঠকমাত্রেই রোমাঞ্চিত বোধ করবেন। এই টাকার বিনিময়েই ‘প্রবাসী’তে শুরু হয়েছিল  সেই মহাকাব্যিক উপন্যাস, ‘গোরা’। সুতরাং সম্পাদকের দেয় অগ্রিম যে সার্থক হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

লেখার বিনিময়ে টাকা দেওয়ার ব্যাপারে ‘প্রবাসী’ সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মনোভাব প্রথম থেকেই ছিল উদার। তিনি যখন ‘দাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত, তখন থেকেই বিশ্বাস করতেন, খালি পেটে যদি ধর্ম না হয়, তা হলে সাহিত্য তো হয়ই না। সুতরাং লেখকদের যথাসাধ্য সাম্মানিক দিতে হবে। নিজের পত্রিকা ‘প্রবাসী’ প্রকাশিত হওয়ার পরেও তিনি তা মেনে চলেন। সাহিত্যের জন্য সাম্মানিক পেলে কোন লেখক না খুশি হন? ‘প্রবাসী’ থেকে প্রবন্ধের জন্য অর্থ পেয়ে আনন্দিত রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘মাসিক পত্র থেকে এই আমার প্রথম আর্থিক পুরস্কার।’’  

‘ভারতী’ সেই সময় ‘প্রবাসী’র উল্টো দিকে হাঁটলেও অন্য বড় পত্রিকাগুলো লেখকদের সাম্মানিক দেওয়ার ব্যাপারে ‘প্রবাসী’কেই অনুসরণ করে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘ভারতবর্ষ’-এর সম্পাদক জলধর সেনের  ‘মুঠোভরে দক্ষিণা’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। একই অভিজ্ঞতা যোগেশচন্দ্র বাগলের। ‘ভারতবর্ষে’-এর দু’সংখ্যা জুড়ে প্রকাশিত হল তাঁর একটি প্রবন্ধ। এর আগে যোগেশচন্দ্রের কোনও রচনা মুদ্রিত হয়নি। এটিই প্রথম প্রকাশিত রচনা। তা-ও আবার যে সে পত্রিকা নয়, ‘ভারতবর্ষ’-এ। স্বভাবতই তিনি খুশি। কয়েক দিন বাদে সম্পাদকের সঙ্গে দেখা। সম্পাদক যোগেশচন্দ্রকে দেখে পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করলেন। তারপর ‘ভায়া এই নাও’ বলে সেটি তাঁর বুকপকেটে গুঁজে দিলেন। নতুন লেখক হিসাবে এতটা তিনি নিশ্চয় আশা করেননি। তবে দক্ষিণা পেয়ে লেখার উৎসাহ যে বেড়ে গিয়েছিল, তা বলাই যায়।  

সাম্মানিক দেওয়ার ব্যাপারে সবাইকে তখন ছাপিয়ে গিয়েছিল ‘বিচিত্রা’। ‘বিচিত্রা’ ছিল অভিজাত পত্রিকা। লেখকদের দক্ষিণা দেওয়ার ব্যাপারেও সে তার আভিজাত্য অক্ষুণ্ণ রাখত। লেখার জন্য লেখকদের টাকা দিত বেশ উচ্চ হারেই। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের জন্য ‘বিচিত্রা’ রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিল তিন হাজার টাকা। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে এই দক্ষিণা সংক্রান্ত একটি ঘটনা বিচিত্রা সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা থেকে উদ্ধার করা যাক—  ‘জিজ্ঞাসা করলাম, মাসে মাসে তোমাকে কত টাকা দিতে হবে শরৎ?’ 

মনে মনে একটু চিন্তা করে শরৎ বললে, ‘যোগাযোগ’র জন্য রবীন্দ্রনাথকে কিরকম দিতে?’

বললাম, ‘তাঁকে মাসিক হারে দিতাম না। একেবারে সম্পূর্ণ উপন্যাসের দক্ষিণা বাবদ দিয়েছিলাম তিন হাজার টাকা। মাসিক পড়তা বোধহয় একশো টাকা করে দাঁড়িয়েছিল।’

—‘আমাকে কত দেবে?’

—‘পঞ্চাশ টাকা।’

ঘাড় নেড়ে শরৎ বললে, ‘আচ্ছা, তাই দিয়ো।’

রবীন্দ্রনাথের জন্য ‘বিচিত্রা’র দক্ষিণা অন্য লেখকদের চেয়ে একটু বেশিই ছিল। তবে শরৎচন্দ্রও তখন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে কোনও অংশে কম জনপ্রিয় নন। বরং সেই সময় একটু বেশিই। তবুও রবীন্দ্রনাথের জায়গাটা কোথায় শরৎচন্দ্র জানতেন। তাই এ নিয়ে তাঁর মনক্ষুণ্ণ হওয়ার কারণ ছিল না।

‘বিচিত্রা’ রবীন্দ্রনাথকে বেশি করে পাওয়ার জন্য অন্য পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও নেমেছিল। এক্ষেত্রে  উপেন্দ্রনাথের সহায় হয়েছিল তাঁর অর্থবল। একবার উপেন্দ্রনাথ শুনতে পেলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘নটরাজ’-এর জন্য একটি মাসিক পত্র রবীন্দ্রনাথের কাছে ছশো টাকা পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব করছে। উপেন্দ্রনাথ একেবারে এক হাজার টাকার একটা চেক নিয়ে গেলেন এবং হস্তগত করলেন ‘নটরাজ’। বিশ্বভারতীর অনটন সে সময় প্রবল। তাই মনে মনে পীড়িত হলেও উপায় ছিল না। লেখা নিয়ে এ রকম বেচাকেনায় তখন এক রকম বাধ্য হয়েই নামতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। 

আর ‘বিচিত্রা’ শুধু প্রতিষ্ঠিতদের নয়, দক্ষিণার ব্যাপারে নতুনদেরও নিরাশ করেনি। ‘মানিক  বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অতসী মামী’ ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে উপেন্দ্রনাথ তাঁকে সম্মান-দক্ষিণা দিয়ে এসেছিলেন বাড়ি বয়ে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আকাশবাণীতে ‘গল্প লেখার গল্প’ বলতে গিয়ে বলে গিয়েছেন সে কথা। জরাসন্ধ তাঁর প্রথম গল্প ‘স্ত্রী’র জন্য ‘বিচিত্রা’র কাছ থেকে পেয়েছিলেন দশ টাকার মানি-অর্ডার।

 

লেখক ভগবানগোলা হাইস্কুলের শিক্ষক