সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সম্পাদকীয় ১

মাধ্যম

Primary Education

মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধসম। তবু ইহার পরও একটি কথা থাকিয়া যায়। মাতৃদুগ্ধই কি শিশুর বাড়িয়া উঠিবার পক্ষে যথেষ্ট? না কি অন্যবিধ পুষ্টিও আবশ্যক? বাঙালি শিশুদের ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত যুক্তি একই। বাংলা তাহাদের শিখিতেই হইবে, অতীব জরুরি শর্ত। কিন্তু উহার পাশাপাশি আর কি কোনও শর্ত নাই? ইংরেজি কি শিখিতে হইবে না? পরবর্তী পর্যায়ে পড়াশোনা যেহেতু অনেকাংশেই বহিঃসংযোগের উপর নির্ভরশীল, অন্যান্য বিষয়ের প্রাত্যহিক উপাদানগুলির ইংরেজি প্রতিশব্দ জানিতে হইবে না? গুরুতর প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গ এক কালে এই প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তর বাহির করিয়া সেই পথে গোটা দুই দশক নিরবচ্ছিন্ন হণ্টন করিয়া ফেলিয়াছে। অনেক মূল্য চুকাইবার পর পথ-পরিবর্তন ও পরিশোধন হইয়াছে। আপাতত আবার আর একটি কঠিন প্রশ্ন। ইংরাজি ভাষাটি শেখাই কি যথেষ্ট? না কি ইংরাজি মাধ্যমে পঠনপাঠনও দরকার? অন্যান্য বিষয়গুলির সহিতও ইংরাজিতে পরিচিত হওয়ার দরকার? রাজ্যের শিক্ষা দফতর সম্প্রতি উদ্যোগ লইয়াছে, প্রথমে সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে, পরে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়েও, প্রাথমিক স্তর হইতে ইংরাজি মাধ্যম চালু করিবার লক্ষ্যে। হেতুটি স্পষ্ট: সামাজিক প্রবণতাটি যখন ইংরাজি মাধ্যমে পড়াশোনা করাইবার, তখন সরকারি স্কুলের প্রতি যাহারা নির্ভরশীল, তাহাদের দাবিটিও এই দিকেই ধাবিত হইবার কথা। শুধু সরকারি বিদ্যালয় বলিয়া বাংলা মাধ্যমে তাহাদের জোর করা হয়তো উচিত কাজ নহে।

অনেকে প্রশ্ন তুলিবেন, দরিদ্র পরিবারগুলিতে যেখানে শিক্ষাদান একটি দৈনিক সংগ্রাম, সেখানে প্রাথমিক স্তরে ইংরাজি মাধ্যমে শিক্ষাদান সংকট আরও অনেক গুণ বাড়াইবে না কি? প্রশ্নটি অত্যন্ত ন্যায্য। শহরে সমস্যার মাত্রা কম হইবে, মফস্সল কিংবা গ্রামে তাহা বহুগুণ বাড়িবে। গৃহশিক্ষার প্রচলন বা সুবিধা যেখানে কম, কিংবা সংগতি সীমিত, সেখানে ইংরাজি একটি অতিরিক্ত বাধা তৈরি করিবে। এগুলি স্বীকার করিয়াও কিন্তু একটি ভাবিবার বিষয় আছে। যে দেশে বিদ্যালয়-পরবর্তী শিক্ষা দ্রুত আঞ্চলিক গণ্ডি পারাইয়া যাইতেছে, সেখানে আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি ইংরেজির উপর জোর দেওয়া ভিন্ন উপায় আছে কি? নতুবা একটি শ্রেণিকে জোর করিয়া অন্যান্য সামাজিক শ্রেণি তথা সর্বভারতীয় শিক্ষামঞ্চ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখা হয়। বাস্তবিক, শিক্ষা পরিকাঠামোর সংস্কার না করিয়া গ্রামেগঞ্জে ইংরাজি মাধ্যম এখনই শুরু করা সম্ভবও নয়, উচিতও নহে। কিন্তু শিক্ষা দফতর যে চিন্তা শুরু করিয়াছে, তাহা একটি সাহসী পদক্ষেপ। একবিংশ শতক এই ভাবনা এড়াইয়া আগাইতে পারে না।

সরকারি দফতর কখনওই নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি ধরিতে আগ্রহ দেখায় না। সুতরাং সরকারি স্কুল হইতে অভিভাবকরা কেন মুখ ফিরাইয়া লইতেছেন, সেই ঘটনাটিকে তাঁহারা কেবল বাংলা মাধ্যমের প্রতি অনাগ্রহ দিয়াই ব্যাখ্যা করিবেন। ঘটনা হইল, পরিকাঠামোর আত্যন্তিক দুর্বলতা, শিক্ষামানের ক্রমনিম্নগামিতা— এই সব কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা কিন্তু কেবল ইংরাজি মাধ্যম স্কুল হইলেই রাতারাতি পাল্টাইয়া যাইবে না। পাশাপাশি দুইটি মাধ্যমে পঠনপাঠন কী ভাবে একসঙ্গে চলিবে, তাহাও স্পষ্ট করা দরকার, বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ায় শামিল করিতে হইবে। বিজ্ঞান ইতিহাস ভূগোল কোন মাধ্যমে পড়া হইবে, নির্বাচনের সুযোগ থাকিবে কি না, কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন হইবে, শিক্ষকরা কী ভাবে দুই দিক সামলাইবেন, এ সবই সময়সাপেক্ষ গবেষণা দাবি করে। শিক্ষা দফতর ভাবনা শুরু করিয়াছে, উত্তম। কিন্তু মারাত্মক তাড়াহুড়া করিয়া নীতি প্রণয়ন করিলে ও কার্যকর করিলে শিক্ষার মান আরও অবনত হইবে। সমাধানের বদলে সমস্যা বাড়িবে।  

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন