সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী একটি সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে অগণিত দেবদেবীর নাম বলে গেলেন। ব্যাপারটা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ল। দুর্গাপুজো আসছে, তাঁর সরকারের মন্ত্রী ও দলের নেতারা উল্টোরথের দিন খুঁটিপুজো নিয়ে দারুণ মেতে উঠলেন, সেটাও চোখে পড়ল। তবে ঘটনা হচ্ছে, বাংলায় এখন পুজো আর উৎসবের শেষ নেই। শীতলা, মনসা, রক্ষাকালী, ধর্মঠাকুর, বড়ঠাকুর এবং আরও অনেক দেবদেবী এ কালে গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসী হয়েছেন, অনেকটা বিভূতিভূষণ বা সত্যজিতের অপুর মতো। আজকাল এঁদের অনেকের মূর্তি প্রায় দুর্গা ঠাকুরের সমান বড় হয়, উৎসবও চলে বেশ কয়েক দিন ধরে।

হিন্দি-বলয় ও অন্যান্য অঞ্চল থেকেও অনেক রকম ঠাকুর আমরা আমদানি করেছি। শুরু হয়েছিল সন্তোষী মা দিয়ে, এখন অন্য নানা পুজোও চলছে জোর কদমে। গণেশ পুজোর সংখ্যা ও জাঁকজমক যে ভাবে বাড়ছে, এমন চলতে থাকলে আমরা অচিরে মুম্বইকেও ছাড়িয়ে যেতে পারি। গত তিন বছরে রামচন্দ্র ও বজরংবলী, আক্ষরিক অর্থেই, সশব্দে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছেন। ইদানীং তাঁরা আর একটিমাত্র দলের মেহমান নন, সেই দলের বিরোধীরাও তাঁদের পুজোয় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, রাম আর হনুমান এখন তীব্র রাজনৈতিক রেষারেষির ব্যাপার। এবং সেটাই আসল ব্যাপার— রাজনীতি। আমাদের বুঝতে হবে, ‘পরিবর্তিত বাংলা’য় এই প্রতিযোগিতামূলক পুজোই হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা জাহির করার সব চেয়ে বড় উপায়।

বিরাট আড়ম্বরে দুর্গা আর কালীর পুজো হবে, তার পাশে বিশ্বকর্মা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর আরাধনা চলবে নিতান্ত আটপৌরে ভাবে— আমাদের বারোয়ারি পুজোর এই পুরনো ছকটা আর চলছে না। কিংবা ধরা যাক শিবরাত্রির কথা। এটি এখন আর কিছু ভক্তিমতী মেয়ের ব্রত-পার্বণ নয়, আলোকসজ্জা, গানবাজনা সহযোগে বিরাট এক উৎসব। এমনকি ‘শ্রাবণ’ উৎসবের ঘনঘটাও বাংলায় দেখতে দেখতে উত্তর ভারতের মতোই ভয়ানক ব্যাপার হয়ে উঠেছে— এই সময়টাতে প্রতি বছর ‘কাঁওয়ারিয়া’ নামে পরিচিত ভক্তদের বেলাগাম অতি-উচ্ছ্বাসে বাসে ট্রেনে রাস্তায় সাধারণ জনজীবন দিনের পর দিন বিপর্যস্ত হয়, এবং তার দাপট ক্রমশই বেড়ে চলেছে। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীও কলকাতায় বেশ ঘটা করেই এসে গিয়েছেন। এই উৎসবগুলি এখন আর দুর্গাপুজো বা কালীপুজো থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

তপতী গুহঠাকুরতা তাঁর বিশদ গবেষণায় দেখিয়েছেন, কলকাতার দুর্গাপুজোগুলি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে অচ্ছেদ্য। আমি সেটা মানছি। কিন্তু আমি আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলব, রাজনীতির হস্তক্ষেপ এখন আর কেবল দুর্গাপুজোয় আটকে নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতটা মনে রাখতে হবে। পাড়ার পুজো এবং ক্লাবগুলো যে প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ক্ষমতার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার পিছনে তার একটা বড় অবদান আছে। কেবল লাগাতার বিক্ষোভ এবং আবেগের রাজনীতি করেই তিনি বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরাননি। তিনি এক অনন্য রণকৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে যা দারুণ কার্যকর। নব্বইয়ের দশকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর ‘পূর্বাশ্রম’ কংগ্রেসের মতো একটি মরসুমি দল কোনও দিনই বামফ্রন্টের সর্ব স্তরে অবিরত সক্রিয় দলীয় সংগঠনের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে না। তাঁর একটা ‘তৃণমূল’ ঘরানার জবাব তৈরি করার দরকার ছিল। তখন, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে বামফ্রন্ট নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল, কেবল পুজো ছাড়া। এই একটা ব্যাপারে তাদের ঘাটতি ছিল। বামফ্রন্টের চিনের প্রাচীরের এই একটি ফাঁককে মমতা চমৎকার কাজে লাগিয়েছিলেন। পুজো কমিটি বা ক্লাবগুলির পুলিশ ও পুর-কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার দরকার ছিল। এমনকি বিরোধী দল হিসেবেও তৃণমূল কংগ্রেস যখন তখন, যেখানে সেখানে ঝামেলা বাধিয়ে দিতে পারত, এবং বুদ্ধিমান স্থানীয় আধিকারিকরা সেই সময় থেকেই তাঁদের চটাতেন না। বামফ্রন্ট এই সব নিয়ে মাথা ঘামায়নি, কারণ তাদের কাছে এ সব ছিল নেহাতই পুজোর ব্যাপার, সরকারবিরোধী কোনও ক্ষোভবিক্ষোভ নয়। পাড়া স্তরের এই সম্পর্কটাই এখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন স্থানীয় কাউন্সিলর— বামফ্রন্ট আমলে সিপিএমের লোকাল কমিটির সেক্রেটারির যা ক্ষমতা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা তাঁদের হাতে। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হামি ছবিতে এই ব্যাপারটা দারুণ দেখানো হয়েছে।

আমার আর একটা বক্তব্য হল, পাড়ায় পাড়ায় যত বেশি পুজো হবে, যত রকমের পুজো হবে এবং যত ঘন ঘন পুজো হবে, অঞ্চলগুলিতে এবং দলের ভিতরে ক্ষমতার গণতন্ত্রীকরণ তত বাড়বে। নানা এলাকায় বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা পুজোর সংগঠনে কে কতটা সফল, তা দিয়ে তাঁদের সামর্থ্য যাচাই করা যায়। সুতরাং পুজোগুলো তাঁদের কাছে এলেম দেখানোর একটা বড় সুযোগ। পুজো উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে দলনির্বিশেষে সামাজিক সংযোগের সুযোগও হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রসারে যার মূল্য অনেক। পুলিশ ও পুরকর্তাদের সঙ্গে, এবং প্রোমোটার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ তো এখন রীতিমতো জোরদার, ফলে পার্টি ফান্ডে টাকা আসার কোনও অসুবিধে হয় না। 

কিন্তু এই পুজোগুলির এমন তুমুল জনপ্রিয়তার আসল কারণ, তারা আমাদের শহর এবং গঞ্জ এলাকার সর্ব স্তরের মানুষকে নিখরচায় আনন্দ দেয়। বিপুল আনন্দ। উদ্যোক্তা ক্লাবগুলি ব্যবস্থা করে, যাতে অন্তত কয়েকটি সন্ধ্যায় জনপ্রিয় গান এবং অনুষ্ঠান করা যায়। যে সাম্প্রতিক সংযোজনটি অত্যন্ত হিট করেছে তার নাম ‘ডিজে নাইট’। এই সব পুজো শারদোৎসবের মতো একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাপার নয়, সংগঠকরা জনপ্রিয় গায়ক বা অভিনেতাদের সুবিধে অনুসারে তাঁদের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। বছরের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে বিভিন্ন এলাকার মানুষ কেবল নিজের পাড়ায় নয়, অন্য পাড়ায় গিয়েও অনুষ্ঠান দেখতে পারেন। কারা কত ভাল জমাটি অনুষ্ঠান করতে পারল, তা নিয়ে তুমুল রেষারেষি চলে। বিভিন্ন পাড়া এবং ক্লাব সেই সাফল্যের জন্য প্রাণপাত করে দেয়। তার পরে আছে ‘ভোগ’, অর্থাৎ সবাই মিলে খাওয়াদাওয়ার উৎসব।
স্থানীয় মাতব্বররা অনুগতদের জন্য কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার আয়োজন করেন। এটা আসলে এক ধরনের আর্থিক পুনর্বণ্টন।

সমাজের উপরের স্তরের মানুষ অভিযোগ করেন, কেন রাস্তা জুড়ে পুজো হবে, কেন এত জোরে গানবাজনা চালিয়ে এলাকার শান্তি বিঘ্নিত করা হবে। কিন্তু ক্রমশ শহরের পরিসরের
এবং শ্রুতির দখল নেওয়ার এই উদ্যোগগুলির মধ্যে আসলে নিহিত আছে একটা নতুন সামাজিক শ্রেণি বা বর্গের আত্মনির্ঘোষ। এ থেকে আর একটা সত্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ রাজ্যের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ উত্তরোত্তর সম্পন্ন, বনেদি, শিক্ষিত ‘বুদ্ধিজীবী’ গোষ্ঠীর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। শহরের
পুজোগুলি রাজনীতিকদের হাতে চলে যাচ্ছে বলে যাঁরা বিষণ্ণ ও ক্ষুব্ধ, তাঁদের মনে রাখা দরকার, সর্বজনীন পুজোর শুরু করার পিছনেও একটা রাজনৈতিক তাগিদ ছিল— কংগ্রেসের জনসমর্থন জোটানোর তাগিদ। ১৮৯৩ সালে বালগঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থীতে সামাজিক উৎসব শুরু করেন, প্রথম সর্বজনীন দুর্গাপুজো শুরু হয় বাগবাজারে, ১৯১০ সালে। রাজনীতির কথা মনে রেখেই এগুলির সূত্রপাত হয়েছিল। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।