স্বামী বিবেকানন্দকে হিন্দু সন্ন্যাসী প্রমাণ করার জন্য বিজেপিপন্থীরা উঠে পড়ে লেগেছেন। প্রমাণ করার দরকার নেই। বিবেকানন্দ হিন্দু সন্ন্যাসী। তবে বিজেপির একমাত্রিক হিন্দুত্বের সঙ্গে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে প্রয়াত এই সন্ন্যাসী যুবার আদর্শের বিরাট ফারাক। অত বড় ফারাক আছে বলেই মানবতাবাদীরা অনেক সময় বিবেকানন্দের শরণ নেন। শরণ নেন সেকুলাররাও। তবে বিবেকানন্দ সেকুলার বা ধর্মবিবিক্তও ছিলেন না। তা হলে বিবেকানন্দ কী ছিলেন? সহজ উত্তর, বিবেকানন্দ বিবেকানন্দ ছিলেন। তাঁর সেকুলার হওয়ার ইচ্ছে ছিল না, সেকেলে সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদীদের মতো ওলবাটা-খাওয়া মুখ করে বসে থাকার মানুষও ছিলেন না তিনি। 

কালীসাধক রামকৃষ্ণের শিষ্য বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের বিশেষ এক কাঠামো নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। সেই কাঠামোর নানা সীমাবদ্ধতা, তবে ভারতবর্ষের নানাত্বকে তা অনেকটাই স্বীকার করে। তা বর্জনপন্থী নয়, গ্রহণপন্থী। তা ছাড়া রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ দুজনেই হাস্যপরায়ণ, যাঁরা হাসতে পারেন তাঁরা প্রতিযুক্তি শোনেন, সহনশীল হন। বিবেকানন্দ হিন্দু ঠাকুরদেবতাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছেন, হিন্দুর বিচিত্র লোকাচার দেশাচার নিয়ে রঙ্গ করেছেন, দেশের মানুষের কথা ভেবেছেন, পরোপকারকে সেবাধর্মে উন্নীত করতে তৎপর হয়েছেন, নানা দেশ দেখেছেন, খাওয়াদাওয়া-জামা-কাপড়-প্রেম-বিয়ে-যৌনতা যে দেশ ভেদে আলাদা তা কবুল করেছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিবেকানন্দ স্বীকার করেছেন সব মানুষ এক রকম নন, নানা মানুষের নানা কাজ নানা রুচি, সুতরাং সবাইকে এক ভাবে চালনা করতে চাওয়া মূর্খতা। 

বিবেকানন্দ লিখেছেন, ‘যাঁর উদ্দেশ্য কেবল মাত্র ধর্মজীবন, তাঁর পক্ষে নিরামিষ, আর যাকে খেটে খুটে... জীবনতরি চালাতে হবে তাকে মাংস খেতে হবে বৈ কি।’ বিবেকানন্দ তাই অনায়াসে কবুল করেন ‘ঠাকুর রাম বা কৃষ্ণের মদ মাংস খাওয়ার কথা রামায়ণ মহাভারতে রয়েছে, সীতাদেবী গঙ্গাকে মাংস, ভাত আর হাজার কলসী মদ মান্‌ছেন!’ রামায়ণ-মহাভারতে রাম-কৃষ্ণ তো সন্ন্যাসী নন, তাই তাঁদের সেই মতো খাবার-দাবার। লক্ষণীয় নিরামিষ-আমিষ দুই স্বীকৃত, নিজের ইচ্ছে ও উদ্দেশ্য অনুসারে খাওয়ার স্বাধীনতা চাই। বিবেকানন্দ লিখেছেন, কোথাও কোথাও ‘বুনো শোর আবার হিঁদুদের একটা অত্যাবশ্যক খাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

পতিতপাবন রামবাদীরা যেভাবে কাটাকুটি করছেন তাঁরা না বিবেকানন্দের রচনার এই সব কেটে দেন। জামা-কাপড়? বিবেকানন্দ লেখেন, পাশ্চাত্যে ‘এ পোষাক গড়া এক প্রকার বিদ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন্‌ মেয়ের গায়ের, চুলের রঙ্গের সঙ্গে কোন্‌ রঙ্গের কাপড় সাজন্ত হবে, কার শরীরের কোন্‌ গড়নটা ঢাকতে হবে, কোন্‌টা বা পরিস্ফুট করতে হবে, ইত্যাদি, অনেক মাথা ঘামিয়ে পোষাক তৈরি হয়।’ তা, যাঁর এমন পর্যবেক্ষণ তিনি সাধারণ গৃহী মানুষের জামাকাপড়ের বিষয়ে রক্ষণশীল কেন হবেন? ভারতীয় পোশাকও নানারকম। কোনও এক রকমকে ভারতীয় পোশাক বলার উপায় নেই। বিবেকানন্দ ভারতীয় পোশাকের নানাত্ব নিয়ে ফুট কাটছেন। ‘অতি প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে মেয়ে মদ্দে পাগড়ী পরত।’ ‘বৌদ্ধদের সময়ের যে সকল ভাস্কর্য-মূর্তি পাওয়া যায়, তার মেয়ে মদ্দে কৌপীন পরা।’ রাজনর্তকীরা ‘দিব্যি উলঙ্গ, কোমর থেকে কতকগুলো ন্যাকড়ার ফালি ঝুল্‌ছে।’ ‘রাজা ঋতুপর্ণ আদুর গায়ে বে কর্‌তে চললেন।’ পড়লে বোঝা যায় বিবেকানন্দ খাওয়া-পরা নিয়ে রঙ্গ করতে ওস্তাদ। এদেশি গৃহী মানুষদের ওপর খাওয়া-পরা নিয়ে একমাত্রিক কোনও বিধি চাপানোর পক্ষপাতী তিনি নন। আবার যাঁরা হিন্দু ধর্মের নামে কারবার চালান সেই হিন্দুত্ববাদীদের ওপর তিনি খড়্গহস্ত। লোক ঠকিয়ে ব্যবসা জমানো অপবিজ্ঞানী ভট্টাচার্য পণ্ডিতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিবেকানন্দ লেখেন, ‘গুড়গুড়ে কৃষ্ণব্যাল ভট্টাচার্য মহাপণ্ডিত... বিশেষ টিকি হতে আরম্ভ করে নবদ্বার পর্যন্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ ও চৌম্বুকশক্তির গতাগতি বিষয়ে তিনি সর্বজ্ঞ।’ হিন্দুমন্দিরের বর্ণনা দেন তিনি, ‘সনাতন হিন্দুধর্মের গগনস্পর্শী মন্দির— সে মন্দিরে নিয়ে যাবার রাস্তাই বা কত! আর সেথা নাই বা কি? বেদান্তীর নির্গুণ হতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্যিমামা, ইঁদুরচড়া গণেশ, আর কুচ দেবতা ষষ্ঠী, মাকাল প্রভৃতি – নাই কি? আর বেদ বেদান্ত দর্শন পুরাণ তন্ত্রে ত ঢের মাল আছে, যার এক একটা কথায় ভববন্ধন টুটে যায়।’ এ সব পড়ে হাসি পায়। যাঁরা পুজোর প্রসাধনী বিজ্ঞাপনে মুসলমানি মালিকানা দেখে বিরক্ত, তাঁরা বিবেকানন্দের এই ভাষা পড়ে কী করবেন? যে ঠাকুর নাকি প্রাচীন ভারতের প্লাস্টিক-সার্জারির প্রমাণ, সেই ঠাকুর বিবেকানন্দের ভাষায় ‘ইঁদুরচড়া গণেশ।’ ভববন্ধন মুক্ত করা দার্শনিক বচন তাঁর ভাষায় ‘ঢের মাল।’ না, লোকটা হিন্দুধর্মের সম্ভ্রম কিছু রাখলে না!

এ-সব পড়ে আবার কেউ ভেবে না বসেন বিবেকানন্দ ধর্ম-বিবিক্ত বলে এ-সব লিখেছিলেন। একেবারেই না। তিনি আসলে দুটি আলাদা মার্গের কথা বলেন। একটি মোক্ষ, অন্যটি ধর্ম। মোক্ষপরায়ণ যাঁরা, তাঁরা জাগতিক বিষয়ে উদাসীন, আত্মোপলব্ধির জন্য ত্যাগের পথে এগিয়ে যাবেন। সেই মোক্ষমুখী ত্যাগী তো সবাই হবেন না। যাঁরা মোক্ষপরায়ণ নন তাঁরা ধর্মপরায়ণ হবেন। এই ধর্ম বলতে বিবেকানন্দ জীবনযাপনের শৈলীর কথা বলছেন। এই শৈলী ঈশ্বর-বিমুক্ত নয়। তবে তার নানা রীতি, এ দেশে ও বিদেশে। বিবেকানন্দের মতে সেই রীতিটি এমন হওয়া চাই যাতে দেশ ও সমাজের উন্নতি হয়। কেমন হবে তা একমাত্রিক ভাবে নির্দেশ করা মুশকিল। কখনও তিনি খুব উদার, কখনও তুলনায় রক্ষণশীল। যেমন ওপরে হিন্দুত্ববাদীদের একমাত্রিকতার বিরোধী স্বর হিসেবে বিবেকানন্দের যে লেখাপত্র তুলে ধরা হয়েছে সে বিবেকানন্দ উদার। কোথাও কোথাও আবার বিবেকানন্দ তত উদার নন। বিবেকানন্দের লেখা থেকে এমন অনেক অংশ উদ্ধার করা যায় যা পড়ে হিন্দুত্ববাদীরা বলবেন এই তো, এই তো। একটা মোক্ষম উদাহরণ। ‘ঐ বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঁঠা খাবেন, আর কৃষ্ণ বাঁশী বাজাবেন, এদেশে চিরকাল। যদি না পছন্দ হয়, সরে পড় না কেন?’ এটা পড়ে হিন্দুত্ববাদীরা বলতেই পারেন এ দেশ সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দেশ। বাকিরা কেটে পড়। বললেই হল? বিবেকানন্দের হিন্দুরা মোটেই যোগীব্র্যান্ড নন। আর বিবেকানন্দ অতীত ভারতে মুসলমানদের অবদান ভুলে যাননি। ইসলামের ঐতিহ্য নিয়ে নানা ইতিবাচক কথা বলেছেন। মেয়েদের কর্তব্য, বর্ণাশ্রম ইত্যাদি নিয়ে বিবেকানন্দের কথা কারও কারও না-পসন্দ হতে পারে। তবে বিবেকানন্দের মতো অনেকেই সে-সময় ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ ছিলেন না। তা বলে তাঁরা কি সংকীর্ণ হিন্দুত্বের পক্ষ আলো করে বসে ছিলেন? একেবারেই না। বিবেকানন্দকে সংকীর্ণ হিন্দুত্বের দলে টানার চেষ্টা চলবে। হিন্দুত্ববাদীরা বিবেকানন্দকে তাঁদের লোক বলে প্রমাণ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইবেন। আমাদের উচিত ঊনচল্লিশ বছরের সজীব বিবেকানন্দকে মনে রাখা, বিবেকানন্দকে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে তুলে না দেওয়া।

 

বিশ্বভারতীতে বাংলার শিক্ষক