তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা— লিখেছেন কবি। যেন একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে বলছেন। ‘সাধ’ কথাটাকে লঘু, আর ‘সাধনা’কে ওজনদার দেখায়। আজ কথাবার্তা থেকে ‘সাধনা’ শব্দটা প্রায় নির্বাসিত। ‘সাধক’ কিন্তু রয়েছে। ‘সাহিত্যসাধক-চরিতমালা’ বা ‘বিজ্ঞানসাধক প্রফুল্লচন্দ্র’ বলা হয়, লেখাও হয়। তা বলে কেউ কি বলেন, চুনী গোস্বামী বিরাট ফুটবলসাধক ছিলেন? কিংবা, চিত্তরঞ্জন ওকালতি-সাধনা ত্যাগ করেছিলেন, মস্ত আত্মত্যাগ? খুবই অল্প কর্মক্ষেত্রের প্রসঙ্গে ‘সাধনা’ বা ‘সাধক’ কথাটা বলা হয়। 

আমার এক প্রবীণ বন্ধু ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন ‘শ্রীনিবাস রায়প্রোল’ নামে। কিন্তু পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কর্মস্থলে ‘আর এস মার্তণ্ডম্’ সই করতেন। বাসস্থানেও ঘর ভাগ করেছিলেন। “এ বাড়ির উপরতলায় থাকেন কবি শ্রীনিবাস রায়প্রোল। রোজগার, স্ত্রী, তিন কন্যা, কিছুই নেই ওই লোকটার। ক্যালিফর্নিয়া-ফেরত ইঞ্জিনিয়ার মার্তণ্ডম্ থাকেন নীচের তলায়। তিনিই বাড়ির মালিক, কবি-ব্যাটা আশ্রিত মাত্র।” কিন্তু কেন এই বিভাজন? 

ক্যালিফর্নিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তে যখন দেখলেন কবিতার আরাধনা ছাড়তে পারবেন না, তরুণ শ্রীনিবাস তখন চিঠি লিখে অগ্রজ কবি উইলিয়ম কার্লোস উইলিয়মসকে শুধোলেন, আপনি শিশুরোগ-চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত থেকেও কবিসত্তা অটুট রাখেন কী করে? উইলিয়মস তাঁকে বাড়িতে ডেকে এনে দেখালেন, বাড়িতে দুটো এলাকা আলাদা করে নিয়ে তুমি দু’জায়গায় দু’জন ব্যক্তির চলনে চলতে পারো। দ্বৈত সত্তাকে নিজে স্বীকার করেছ বলে অন্যেরাও বুঝবে, তুমি একই শরীরে অবস্থিত পৃথগন্ন কবি আর ইঞ্জিনিয়ার। সেই আকল্প ধরেই রায়প্রোল নিজের জীবনের স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন। 

উইলিয়মস কিন্তু নিজের নামেই ডাক্তারি করতেন, কবিতাও সই করতেন। তাঁর তরুণ ভারতীয় বন্ধুটি দুটো নামের মধ্যে দেওয়াল তুলে দিলেন কেন? এখানেই আজকের বিষয়টার আলোচনায় শ্রীনিবাস প্রাসঙ্গিক। ইঞ্জিনিয়ারিংকে কেউ ‘সাধনা’ ভাবেন না। বিজ্ঞানসাধক হয়, কারিগরিসাধক বলে কিছু হয় না। নাম আলাদা করে সাধনা আর পেশার মধ্যে সীমারেখা টানতে চেয়েছিলেন শ্রীনিবাস। 

এমন একটা সীমা কি সকলেই টানেন না? লোকে যে কোনও সাফল্যকে ‘সাধনায় সিদ্ধি’ বলে অভিহিত করে না। সকল চেষ্টাকারীই সাধক নন, বিশেষ কোনও কোনও ধরনের চেষ্টাকারীকে সাধক বলা চলে। কিন্তু ঠিক কোন কষ্টিপাথরে বিচার করে বিশেষ কিছু অশিথিল, একনিষ্ঠ প্রয়াসকে ‘সাধনা’ বলতে রাজি হই আমরা? কেন অন্য কোনও কোনও প্রয়াসের বেলায় ওই শব্দটাকে সরিয়ে রাখি? হয়তো আমরা নিজেদের বোঝাতে চাই, মানুষের কিছু চেষ্টা থাকে পবিত্রতাকে, অকলুষ বিশুদ্ধতাকে স্পর্শ করার। সে রকম কোনও প্রয়াস যদি কেউ দৃঢ়তার সঙ্গে করেন, একাকী অথবা সম্মিলিত ভাবে, পরস্পরকে সাহায্য করেন, তখন সে কাজটাকে বলি সাধনা। আর তার ব্রতীদের বলি সাধক। 

যারা ঘোষিত তস্কর, বা যাঁরা আদালতে তস্করদের (তথা অন্য অপরাধীদের) আত্মপক্ষ সমর্থনের সহায়ক (যেমন উকিল) কিংবা যাঁরা সেই আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় উপকরণের নির্মাতা (যেমন আইনসভার সদস্য) তাঁদের কাজকর্মকে শত সফলতা সত্ত্বেও ‘সাধনা’ বলি না। তার কারণ, ঘোলাটে জলকে নির্মল বলতে অস্বস্তি বোধ করি। কথাগুলো নিশ্চয়ই আপেক্ষিক। অনেক নিম্নমানের কবি, বিজ্ঞানী বা সন্ন্যাসী রয়েছেন। তাঁদের ব্যর্থতা দেখে আমরা কপাল চাপড়াই। তবে এত ব্যর্থতা দেখেও আমরা ভুলিনি সার্থকতা কী রকম দেখতে, এবং সে সার্থকতা কেন দামি। ‘সাধনা’ শব্দের প্রয়োগ আর অপ্রয়োগ দেখে এটাই বোঝা যায়। 

তাই বলে সব উকিল কি ঘুষ খান, মিথ্যা বলেন? ন্যায়ের পথে চলেছেন, এমন পেশাদার উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কি নেই? নিশ্চয়ই আছেন, কিন্তু তিনি নৈতিক পথে চলেছেন বলেই ‘সাধক’ নন। তাঁর চরিত্র বিশুদ্ধ কি না, সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল, তিনি যে কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত আছেন, সত্যের/ শুভের/ সুন্দরের প্রতিমান খুঁজতে চেষ্টা করা কি সেই কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত? কবি যে অর্থে সাধক, তিনি যে ভাবে পথ খোঁজেন, সে ভাবে কি ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল পথ খোঁজেন? অন্যের নির্দিষ্ট পথে যিনি চলেন, তিনি ন্যায়নিষ্ঠ হলেও, চলার পথে সত্য/শুভ/সুন্দরকে স্বীকৃতি দিলেও, তাঁকে ‘সাধক’ বলা চলে না। কারণ সাধনার মধ্যে একটা বাড়তি পরিশ্রম রয়েছে, তা হল মৌলিকত্ব। সাধক শুধু অন্যের প্রতি সৎ নন, তিনি চলার পথ নির্ণয় করেন নিজে, একা বা অনেকে মিলে। সৎ-অসৎ, শুভ-অশুভ, সুন্দর-অসুন্দরের সূক্ষ্ম বিচার করা, আর সেই অনুসারে চলার আপসহীন চেষ্টা— এই দ্বিতীয় ধরনের চেষ্টার ক্ষেত্রেই আমরা সাধনা কথাটা বলতে রাজি, এমনকি আজও। বিজ্ঞান বা শিল্পে‌ও তাই। চর্চাকারী ‘সাধক’ হয়ে ওঠেন যখন তিনি নিজের পথ তৈরি করেন।   

অন্য দিক থেকে মনোযোগ দাবি করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানটির কথায় হালকা ‘সাধ’ আর ওজনদার ‘সাধনা’র বৈপরীত্য। গানটা যে যুগে লেখা সেই সময়ে লোকে ‘সাধনা’ শব্দটাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়নি। সে যুগে সবাই ধরে নিয়েছিল, সাধনা ব্যাপারটা ভারী, তাতে সামূহিকের স্বাক্ষর। আর সাধ নেহাতই ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদের হালকা জায়গা। স্বাধীনতাসংগ্রামীরা নিজেদের সাধকের সাজে সাজিয়েছিলেন। সেই গুরুদায়িত্বের পাশে ব্যক্তিগত সাধগুলোকে লঘু ভাবতে চেয়েছিলেন। স্বাধীন দেশে ভাবনার জ্যামিতি পাল্টে গিয়েছে। ‘সাধনা’ শব্দটাই চিলেকোঠায় চলে গিয়েছে। কিন্তু তামাদি হয়নি। তার আলোয় কি আর এক বার ইচ্ছে আর সঙ্কল্পের দিকে তাকানো যায়?

এই সূত্রে গাঁধীর প্রসঙ্গ অনিবার্য ভাবে এসে পড়ে। নিজের গোটা জীবনযাপনকেই তিনি করে তুলেছিলেন ব্রতচর্যার অঙ্গন। তাঁর জীবনে ছাগলের পরিচর্যা বা হাতুড়ে চিকিৎসাকে কি তাঁর অনশন আন্দোলন বা ডান্ডি পদযাত্রার থেকে আলাদা করা যায়? ‘এইগুলো নেহাতই অবান্তর আটপৌরে ক্রিয়াকলাপ, ওইগুলো ওঁর প্রকৃত সাধনার অঙ্গ’, এমন সীমারেখা টানার অবকাশই রাখেননি গাঁধী। কিন্তু এখানে ব্যক্তিবিশেষকে নিয়ে ভাবছি না, তিনি যতই মহৎ হোন না কেন। সবার ক্ষেত্রে কোন কষ্টিপাথর প্রযোজ্য, এটাই আমাদের বিবেচ্য। গাঁধীর আদর্শের যে রূপায়ণ অন্নদাশঙ্কর ছকেছিলেন, প্রবন্ধে, উপন্যাসে, গল্পে ছড়ায়, নিজের জীবনচর্যাতেও, সেখানে পাথেয় পাওয়া যেতে পারে। বিশেষত যখন তিনি ‘জীবনশিল্প’কে ধ্বজার মতো তুলে ধরেন তখন একটা নতুন সূত্র দেখতে পাই। সাধের আয়তি আপনার সমগ্র রুচিমণ্ডলে বিস্তৃত হলে সুর বাঁধার ধরনটাই পাল্টে যায়।

তবু সাবধান হতে চাইব। কোনও এক জনকে — কোনও গাঁধী বা অন্নদাশঙ্করকেও— একমাত্র গুরু বলে মুকুট পরিয়ে দিলে কিন্তু নিজের পথ খোঁজা থেকে সরে আসছেন আপনি। মুগ্ধ হতেই পারেন। কিন্তু গ্রস্ত হতে নেই। এটাই হুঁশিয়ারির জায়গা।

একাধিক ঘাটের জল খেয়ে আসার পর কোথায় এসে দাঁড়ালাম তা হলে?

‘সাধনা’ কথাটার মানে কি হতে পারে, এমন পথ খোঁজা, এমন সহপথিক খোঁজা, যেখানে হমসফরদের সাধে সাধ মিলিয়ে লোকে জেনে নেবে, কয়েকটা জরুরি সাধ কী ভাবে হালকা, ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সীমিত না থেকে, সর্বজনীনতার যোগ্য ভারবত্তার দিকে এগিয়ে যেতে পারে? পরাধীন দেশের সামাজিক জ্যামিতি ‘সাধনা’ শব্দটাকে যে বিশেষ ওজন দিয়েছিল, তার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও শব্দটার রেশ আমাদের সত্তায় প্রচ্ছন্ন ভাবে কাজ করে চলেছে। ‘নৈতিকতা’ শব্দটা এখন চলে বেশি। নৈর্ব্যক্তিক নৈতিকতা আর ব্যক্তিগত সাধ, এ দুটোকে কি মেলাতে পারে সামূহিক সাধনার নিবিষ্টতা?