পশ্চিমবঙ্গের নাম পাল্টাইবার প্রস্তাব পুনরায় খারিজ করিয়া দিল কেন্দ্র। তিন বছর আগে রাজ্যের বিধানসভায় দলমতনির্বিশেষে প্রস্তাব পাশ হইয়াছিল, পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলা’ হইবে। নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব রাজ্য সরকার সম্প্রতি কেন্দ্রের নিকট পাঠাইলে কেন্দ্র আবারও তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। এই প্রত্যাখ্যান হতাশাজনক ও বিস্ময়কর। রাজ্যের নাম পরিবর্তনের ঘটনা নূতন নহে, তাহার প্রক্রিয়াটিও সহজ। রাজ্য সমস্ত বিবেচনা করিয়া কেন্দ্রের নিকট প্রস্তাব পাঠায়, সাধারণত লোকসভায় তাহা মঞ্জুর না হইবার কারণ থাকে না। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তাহা নামঞ্জুর হইল কেন, উত্তর খুঁজিতে গিয়া কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক সংঘাতের কারণটিই চোখে লাগিতেছে— আমার রাজনীতির মতে তুমি মত দাও না, তোমার অন্য প্রস্তাবে আমি সায় দিব কেন? 

রাজনীতির টানাপড়েন রাজ্যের নাম পরিবর্তনের পথে অন্তরায় হইলে তাহা হতাশার উদ্রেক করে বইকি। কিন্তু এহ বাহ্য, আরও বড় ক্ষতি হইয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে রাজ্যের মুখের উপর দরজা বন্ধ করিয়া কেন্দ্র তাৎক্ষণিক আনন্দ পাইতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে ইহা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী, এবং সেই কারণেই অসাংবিধানিক। ইহা না-হয় তত্ত্বের ক্ষেত্র, ব্যবহারিক প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রেও রাজ্যের যুক্তির পাল্লাই ভারী হইবে। সংসদে প্রশ্ন উঠিয়াছে, ‘বাংলা’ নামকরণের কী প্রয়োজন, ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থাকিয়া গেলে ক্ষতি কী? এত দিন চলিতেছিল বলিয়া এখন নাম পাল্টানো যাইবে না, তাহার অর্থ নাই। বিশেষত অন্য রাজ্যের নাম পরিবর্তনের সময় যখন আঙুল উঠে নাই, দিব্য মানিয়া লওয়া হইয়াছে। বাংলার বিজেপি সাংসদরা লোকসভায় বলিয়াছেন, পশ্চিমবঙ্গ নামের সহিত বিরাট ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত, নাম পাল্টাইলে তাহা টাল খাইবে। ইহাও ধোপে টিকে না। বোম্বে, মাদ্রাজ যে মুম্বই, চেন্নাই হইল, তাহাতে কি ইতিহাস মুছিয়া গেল? পশ্চিমবঙ্গও নাম পাল্টাইয়া আদি ও অকৃত্রিম ‘বাংলা’য় ফিরিলে ক্ষতি দূরস্থান, আপত্তিরও কারণ থাকিতে পারে না।

দেখিয়া-শুনিয়া মনে হইতেছে, কেন্দ্রে শাসক দল আসলে ইতিহাস বলিতে দেশভাগের ইতিহাসকে জলজিয়ন্ত রাখিতে বদ্ধপরিকর। রাজ্যের নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থাকিলে তাহার পশ্চাতে ‘পূর্ববঙ্গ’-এর কথা, তথা দেশভাগের ঘটনা মনে পড়িতে বাধ্য— পটপরিবর্তনে আজ সেই পূর্ববঙ্গ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হইয়া ‘বাংলাদেশ’ হইলেই বা কী। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় শাসক দলের ইহা এক রাজনৈতিক চাল— রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ হইলে যে চালে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটিগুলিকে মাত করা যাইবে না। অথচ দেশভাগ অনেক পুরানো বিষয় হইয়াছে, পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশ হইয়া নূতন ইতিহাস গড়িয়াছে, দেশভাগের নিষ্প্রাণ শবটিকে এ বার কাঁধ হইতে নামাইয়া অগ্রসর হওয়া উচিত পশ্চিমবঙ্গেরও। ‘বাংলা’ নামকরণের মধ্য দিয়া রাজ্যের বিধানসভা তাহাই করিতে চাহিয়াছে, ইহাতে বাগড়া দিবার অধিকার কেন্দ্রের নাই। ‘বাংলা’ কেবল এক ভূমিখণ্ড মাত্র নহে, তাহা এক সুবিস্তৃত ‘ধারণা’রও নাম। বিপুল সংখ্যক মানুষের ভাষা, গান, লোকসমাজ, সংস্কৃতিকে এই শব্দটি বিশেষিত করিয়া থাকে। জীবন ও চেতনায় এ রাজ্যের মানুষ যাহাকে সম্পৃক্ত করিয়া লইয়াছে, রাজ্যের নামে সেই ‘বাংলা’কে দেখিলে তাঁহারা নন্দিত, গর্বিত হইবেন।