দেখলাম, পুলিশ গাড়ি থামাতে ইশারা করছে। দিল্লির রাস্তা। সিগন্যাল ভাঙিনি, গতি-সীমা অতিক্রম করিনি, সিট-বেল্টও পরে আছি, কাগজপত্র ঠিকঠাক। তা হলে? নেমে জানা গেল, গাড়ি বৈধতা হারিয়েছে। অর্থাৎ সচল, সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকলেও, তার বয়স ১৫ বছর অতিক্রান্ত— এ বার তাকে বিদায় জানাবার পালা। আইনমাফিক বাজেয়াপ্ত করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে তার সুঠাম শরীর। 

তর্কে গেলাম, এই দেখুন ২০৩২ অবধি রেজিস্ট্রেশন আছে, এই যে বিমার মান্যতা, দূষণের নথিও তো বলছে এ গাড়ি বিষ ওগরাচ্ছে না। কিছুই ধোপে টিকল না। সতেরো বছরের পুরনো গাড়ি, যেটা নিয়ে আগের বছরই দিল্লি থেকে কলকাতায় গিয়েছিলাম, অনায়াসে দিল্লিতে ফিরেও এসেছিলাম, কী কারণে বাতিল হয়ে গেল, জানা হল না। বৃদ্ধ আর বিকল, এই দু’টি তো সমার্থক শব্দ নয়। 

অবশ্য বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদী বাজারের মূলেই আছে বর্জন-প্রবৃত্তি। ক্রমাগত বাতিল না করলে, ‘নতুন’ পণ্য ঠাঁই পাবে কোথায়? পণ্যের প্রলোভন ক্রেতাকে বাধ্য করে অধিকাংশ সামগ্রীর সঙ্গে বন্ধনমুক্ত বহুগামী সম্পর্কে লিপ্ত হতে। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি যখন দূষণ দূরীকরণ ও পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে ক্রেতাকে বাধ্য করে ‘কেনা-ফেলা’র খেলায় উন্মুক্ত হতে, তখন সমস্যাটা এক ধাপ জটিল হয়। বাধ্যতামূলক বর্জন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় প্রাতিষ্ঠানিক মদত। বর্জিত পদার্থের ভারে যখন নাগরিক সভ্যতা এমনিতেই যথেষ্ট নাজেহাল, তখন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আরও জঞ্জাল জমা হতে থাকে। 

এ রণনীতির দু’টি স্তম্ভ— একটির নাম ‘বয়স-অজুহাত’; অন্যটি ‘দূষণ-অজুহাত’। মজার কথা হল, এই দুইয়ের মধ্যে আসলে কোনও সম্পর্ক নেই। একটা লোক-ভোলানো সম্পর্ক চাপানোর চেষ্টা হয়েছে মাত্র। গাড়ি বিষ ওগরাচ্ছে কি না, তার মাপকাঠি কে নির্ধারণ করে? কে সেটা মাপে? কে প্রমাণপত্র প্রদান করে, এ কথা লিখিত জানিয়ে যে এ গাড়ি দূষণের কারণ নয়? উত্তর— সরকার বাহাদুর। গাড়ি যদি নির্ধারিত দূষণ-মানদণ্ড লঙ্ঘন না করে, তা হলে গাড়ির বয়স ১৫ না ৫০, তাতে রাষ্ট্রের তো কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। 

যদি তা সত্ত্বেও আপত্তি জন্মায়, তা হলে বুঝতে হবে বয়সটা একটা ফালতু অজুহাত, অথবা তিন মাস অন্তর সুস্থতার প্রমাণপত্র জারি করার সরকারি প্রণালীর প্রতি সরকারেরই কোনও আস্থা নেই। আর সেই অনাস্থার খেসারত দিতে হবে জনগণকে, তার সঞ্চয়ের টাকা খসিয়ে, ১০/১৫ বৎসর অন্তর অন্তর নতুন গাড়ি কিনে! 

বয়সের দোহাইটা যুক্তির ধোপে টিকত, যদি বলা হত যে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির সুস্থতার মাত্রাগুলো মাত্রাতিরিক্ত কড়া হতে থাকবে, গাড়ির মালিককে যা বাধ্য করবে বুড়ো গাড়ির বাড়তি যত্ন নিতে। এমনও তো হতে পারে যে ১৫ বছরের পুরনো একটা গাড়ি চলেছে মাত্র ১৫,০০০ কিলোমিটার? তা হলে বয়সটাই কেন বিবেচ্য, কিলোমিটার নয় কেন? নাকি এ ব্যাপারেও সরকারের নিজস্ব যাচাই-প্রণালীর প্রতি ঘোর অনাস্থা, তাই মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে কিনে-কিনে-ফেলে-ফেলে আরও বর্জ্য সৃষ্টি করতে? ক্রয়-বর্জনের একটা বাধ্যতামূলক ও বিপজ্জনক বৃত্ত সৃষ্টি করা হচ্ছে? পরিবেশ রক্ষার নামে এমন কিছু ভুয়ো যুক্তি সাজানো হচ্ছে, যা আরও লক্ষ লক্ষ টন জঞ্জাল উৎপাদন করে আখেরে পরিবেশেরই ক্ষতি করবে। 

বহু নির্ভরযোগ্য সমীক্ষায় এটা প্রমাণিত যে দূষণের রাজধানী দিল্লির মতো শহরেও বায়ু দূষণের ক্ষেত্রে প্রাইভেট গাড়ির ভূমিকা পাঁচ শতাংশের থেকেও কম। তা হলে প্রাইভেট গাড়িকে বলির পাঁঠা বানানোর প্রয়াস কেন? এই প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করা যাক বরং। নতুন গাড়ি বিক্রি হলে কাদের লাভ? অবশ্যই গাড়ি নির্মাতার এবং যে মন্ত্রক কর আদায় করে, তাদের। ১০/১৫ বছরের বিধি আসার পর গত তিন বছরে কতগুলো নতুন মডেলের গাড়ি বাজারে এসেছে, ভাবুন। সেটা কাকতালীয় নয় নিশ্চয়। গত ক’বছরে গাড়ির এক্স-শোরুম আর অন-রোড মূল্যের ফারাক (যার অধিকাংশটাই রোড ট্যাক্স), সেটা কতটা বেড়েছে? ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ!

ক্রেতা কি তাতে ক্ষুব্ধ? সে রকম চোখে পড়ছে না। বিগত তিন দশকে পণ্যের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের এক আমূল পরিবর্তন হয়েছে। পুরনোর আশ্বাস নয়, নতুনের তীব্র প্রলোভনই এখন তাঁদের টানে। উদার অর্থনীতি শিখিয়েছে ভোগের মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে আবর্জনার বালতিগুলো নির্দ্বিধায় অহরহ ভরিয়ে ফেলতে। অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা পূরণে পণ্যের সার্থকতা যতটা, ততটাই চটজলদি বর্জিত হওয়ায়। ফেলে দেওয়া এখন আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।  

সরকার যদি এতই চিন্তিত পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে, তা হলে নতুন গাড়ি কিনতে বাধ্য না করে, গাড়ি কেনার ব্যাপারে নিরুৎসাহ করা হচ্ছে না কেন? সরকার গণপরিবহণে বিনিয়োগ করছে না কেন? গণপরিবহণকে আরও উন্নত ও সক্ষম করে তোলাটা বেশি প্রগতিশীল, না বাধ্যতামূলক ভাবে বর্জ্য উৎপাদন করাটা? উন্নয়নের মাপকাঠি কোনটা? সমস্যাটা আসলে গাড়ি, দূষণ বা পরিবেশকেন্দ্রিক নয়। সমস্যা হল রাষ্টের চোখে জনসাধারণ যথেষ্ট মাত্রায় ‘নাগরিক’ নয়, প্রজা মাত্র। যাদের ওপর চাইলেই আদেশ চাপিয়ে দেওয়া যায়, তাদের অভিমত বা অসুবিধের কথা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে। ভোগবাদ এসে যদি সেই রাষ্ট্রভাবনার হাত ধরে, তার ফল কি অন্য রকম হতে পারে?

শিব নাদার ইউনিভার্সিটিতে সমাজতত্ত্বের গবেষক