বাংলার ইতিহাসে প্রথমবার এমন এক সময়কাল এসেছে, যখন বিজেপি এ রাজ্যে দ্বিতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। এমনই এক সময়ে দেশের শাসকদল বিজেপির সর্বোচ্চ পদাধিকারী বাংলায় এলেন। বাংলার বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা স্বাভাবিক। কিন্তু দু’দিনের বাংলা সফর শেষে অমিত শাহ কি আদৌ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরলেন? নাকি সংশয় তাঁর সঙ্গী হল?

ঠাসা কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। দলের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে বার্তা দিয়েছেন— তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতার কণামাত্র সম্ভাবনা নেই, সর্বাত্মক বিরোধীতায় ঝাঁপাতে হবে বরং। বৈঠক করেছেন বিস্তারকদের সঙ্গে, বৈঠক করেছেন দলের সোশ্যাল মিডিয়া বাহিনীর সঙ্গে। ২০১৯ এবং ২০২১-এর দুই নির্বাচনকে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে নির্ধারণ করেই যাবতীয় আলোচনা। দলের নেতা-কর্মীদের ভরপুর ভরসা জোগানোর চেষ্টা করেছেন যে, বাংলাতেও বিজেপির জয় সম্ভব। তার পরে জনসংযোগে নেমেছেন, জনসভা করেছেন এবং তীব্র কণ্ঠস্বরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে কর্মীদের চাগিয়ে দিতে চেয়েছেন।

বঙ্গ বিজয়ের যে সঙ্কল্প বিজেপি নেতৃত্ব নিয়েছেন, তাতে অমিত শাহের তরফ থেকে ঠিক এমন ভূমিকাই প্রত্যাশিত ছিল। কর্মীদের মধ্যে ভরপুর আত্মবিশ্বাস দেখতে চাইবেন তাঁরা এবং সেই লক্ষ্যে সক্রিয়তা বহু গুণ বাড়াবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অমিত শাহ যতটা সক্রিয় হলেন বা তৎপরতা দেখালেন, বাংলার বিজেপি কি আদৌ ততটা মজবুত হতে পেরেছে এখনও? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সর্বাগ্রে জরুরি।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

কোনও সংশয় নেই যে, বিজেপি বাংলায় পেরেছে। বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসকে পিছনে ফেলে এ রাজ্যে বিজেপি এখন তৃণমূলের প্রধান চ্যালেঞ্জার, তাতেও সংশয় নেই। কিন্তু ২০১৯-এ বাংলা থেকে ২২টি লোকসভা আসন জেতা এবং ২০২১- এ বাংলার মসনদ দখল করার যে লক্ষ্যমাত্রা বিজেপি নির্ধারন করেছে, বঙ্গ বিজেপি তা পূরণে আদৌ সক্ষম? না, সক্ষম নয়। অন্তত এই মুহূর্তে নয়। অমিত শাহ নিজেও সম্ভবত তা বুঝতে পেরেছেন। তাই দলের রাজ্য নেতৃত্বকে পরামর্শ দিয়েছেন— তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে নিজেদের তুলে ধরতে।

আরও পড়ুন: মমতার বিরুদ্ধে বেনজির আক্রমণ অমিত শাহের, সরকার ছুড়ে ফেলার ডাক

বিজেপির কর্মকাণ্ডে প্রাচুর্য আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে বাংলায়। বিজেপি আজকে বাংলায় যতটা গুরুত্বপূর্ণ আগে কখনও ততটা ছিল না, এ কথাও ঠিক। কিন্তু তৃণমূলের বিকল্প হতে পারে বিজেপি— এমন ভরসা কি বাংলার মানুষের মনে এখনও তৈরি হয়েছে? একদিকে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টো দিকে বিজেপি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই ব্লুয়ের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, শাসকদলের ছাতার বাইরে থেকে রাজনীতি করা কতটা কঠিন এই পাহাড়ে।

বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে যে চরিত্রটি রয়েছে, সেটি এখনও অসমান্তরাল। বিজেপির জনভিত্তি বেড়েছে, প্রাচুর্য বেড়েছে, তৎপরতা বেড়েছে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কোনও মুখ তাদের হাতে নেই। আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুড়ে। ওই রকম কোনও রাজনৈতিক চরিত্র এই মুহূর্তে বঙ্গ বিজেপির হাতে নেই। পিছিয়ে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ বিজেপির জন্য সেটাই।

দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাম শাসকদের বাংলা থেকে যখন হঠিয়েছিলেন মমতা, তখন মমতার দলও আজকের মতো এত সংগঠিত ছিল না, জনভিত্তিও এত বিপুল ছিল না। কিন্তু মমতা নিজে ছিলেন। সেই কারণেই চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পেরেছিলেন। বিজেপির হাতে আজ জন সমর্থন রয়েছে, ক্রমবর্ধমান উৎসাহ-উদ্দীপনা রয়েছে। কিন্তু মমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়বেন, এমন নেতা বাংলার বিজেপিতে অন্তত নেই।

অমিত শাহ বঙ্গ বিজেপির আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলেন বটে। কিন্তু নিজে আত্মবিশ্বাস নিয়ে দিল্লি ফিরতে পারলেন কি? জবাব শুধুমাত্র অমিত শাহই দিতে পারবেন।