• badshah maitra
  • বাদশা মৈত্র
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে বলব, আমি তোমাদেরই লোক

singur
  • badshah maitra

দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ডানকুনি টোল ট্যাক্স পার করে বর্ধমানের দিকে কিছুটা এগোতেই সিঙ্গুর মোড়। এখনও এখান দিয়ে যেতে গেলেই চোখ আটকে যায় রাস্তার বাঁ দিকে, দুটো বড় লোহার গেট, অব্যবহারে মরচে ধরেছে জায়গায় জায়গায়। চারধার আগাছায় ভর্তি। গেটের ও-পারে রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা এগোলেই বিশাল বিশাল টিনের শেড খালি পড়ে আছে। কোথাও বা কিছু কিছু যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে তার মধ্যে। চার পাশের বিশাল জমিতে বড় বড় ঘাস। সব মিলিয়ে সূর্য ডুবে গেলে বেশ একটা গা ছমছমে ভাব আন্দাজ করা যায়।

অথচ, এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কয়েক বছর আগেও এই জায়গাটা লোকজন নিয়ে গমগম করত। সারা ভারতবর্ষ, এমনকী বিশ্বের অনেক দেশও তাকিয়েছিল এই সিঙ্গুরের দিকে। সবার মুখে একটাই কথা, টাটা কোম্পানির হাত ধরে বিশ্বের সবচেয়ে কম মূল্যের চার চাকার গাড়ি বেরোবে এখান থেকে। কারখানা ঘিরে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছিল এলাকার অর্থনীতি। সেই সময় সকালের দিকে সিঙ্গুর স্টেশনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যেত, শ’য়ে শ’য়ে মানুষ দল বেঁধে ট্রেন থেকে নেমে সাইকেল ভ্যানে  চড়ে চলেছেন কারখানার দিকে। গ্রামের অনেকেই এখানে ঘর ভাড়া দিচ্ছিলেন বাইরে থেকে কারখানায় কাজ করতে আসা বহু মানুষকে। রাস্তার ধারে তৈরি হয়েছিল বহু ভাতের হোটেল। সকাল-সন্ধে দু’বেলাই লোকের অভাব হত না সেখানে। সব মিলিয়ে একটা হইহই ব্যাপার। সঙ্গে চলছিল মিটিং-মিছিল। একদল চান এই কারখানা হোক। তার জন্য তাঁরা তাঁদের জমি সরকারকে দিতে রাজি। আর এক দলের ঘোর আপত্তি জমি দেওয়ায়। তাঁরা চাষের জমিতে চাষ করতে চান। কলকারখানায় তাঁদের কোনও আগ্রহ নেই। প্রায় ১০০০ একর জমির মধ্যে ৬০০ একরের মালিক কারখানার পক্ষে, বাকি ৪০০ একরের মালিক এর বিপক্ষে।

গন্ডগোলের সূত্রপাত টাটার কারখানার জন্য তৎকালীন সরকারের জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে। সরকারের বক্তব্য এই কারখানা বড় শিল্পে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটা পদক্ষেপ। আর পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে ভূমিসংস্কারের ফলে চাষির হাতে জমি যে হেতু বহু খণ্ডে বিভক্ত সেখানে অধিগ্রহণ ছাড়া একলপ্তে ১০০০ একর জমি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। উল্টো দিকে বিরোধীদের দাবি ছিল সরকার কেন টাটার জন্য চাষের জমি অধিগ্রহণ করবে? চাষি চাইলে নিজের জমি নিজে বিক্রি করবে, সরকার কেন সে কাজ করবে? বিশেষ করে যাঁরা জমি দিতে চান না তাঁদের উপর পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে দিন দিন। শেষ পর্যন্ত, জমি দেওয়ার ব্যাপারে সবাইকে একসঙ্গে রাজি করানো যায়নি। ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকের বিভেদ মিটিয়ে চালু করা যায়নি এই কারখানা। পরিণামে সুস্থ পরিবেশে কাজ করতে না পারার কারণ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পাট চুকিয়ে কারখানা চলে যায় গুজরাত। তার পর বহু সময় পার করেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি এখনও। রাস্তার ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যানো গাড়ি তৈরির এই কারখানা, ক্রমে কারখানার কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। না হয়েছে সেখানে চাষ, না হয়েছে সেখানে শিল্প। সময় যেন এখানে থমকে রয়েছে ওই বড় বড় শেডগুলোর ভিতরে।

অনেক দিন পরে লেখার সুযোগ পেয়ে বিষয় হিসাবে বেছে নিয়ে পৌঁছে গেলাম সিঙ্গুর। কী ভাবছে সেখানকার মানুষ, কেমন আছে তাঁরা, কী তাঁদের প্রত্যাশা, এই সব নানা কথায় কেটে গেল গোটা একটা দিন। গোপাল সাঁতরা, সিঙ্গুর আন্দোলনের পরিচিত নাম, বেড়াবেড়িতে তাঁর পাড়ায় হাজির হতেই চোখে পড়ল রাস্তার ধারে একটা বাঁশের মাচায় খালি গায়ে বসে তাস খেলছে কিছু মানুষ। পাশে যেতেই খুব নিচু গলায় এক জন আর এক জনকে প্রশ্ন করল, ‘বাদশা মৈত্র না?’ গলাটা একটু যেন তুলেই জানতে চাইলাম, ‘কথা বলা যাবে?’ তাসের আড্ডা জমে উঠেছিল ভালই। হঠাৎ এক আগন্তুকের প্রশ্নে তাল কেটে যাওয়ায় একটু যেন অনিচ্ছার ভঙ্গিতেই এক জন বলে উঠলেন, ‘বলুন কী বলবেন?’ অনুমতি না নিয়েই জুতো খুলে বেশ গুছিয়ে বসলাম মাচার ওপর। কী নিয়ে কথা বলব তা ভাল বুঝতে না পারায় একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে দেখে আমি কথা শুরু করলাম।

এখানে বলে রাখা ভাল, এই অঞ্চলটার পুরোটাতেই প্রায় অনিচ্ছুক কৃষকদের বাস। এঁরা কারখানার জন্য জমি দিতে রাজি হননি। তাই সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা না নিয়ে এঁরা যে যাঁর জমি ফিরে পেতেই বেশি আগ্রহী। আশা ছিল, ২০১১-র নতুন সরকার তাঁদের জমি ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু আইনের প্যাঁচে পড়ে সে সম্ভাবনা এখন বিশ বাঁও জলে। টাকাও পেলেন না, জমিও না, মাঝখান থেকে কারখানাটাও উঠে গেল গুজরাতে, এখন আফশোস হয়? তৎক্ষণাৎ উত্তর, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করছেন, কোর্ট না দিলে কী করা যাবে? তবে আমরা ভালই আছি, সরকার দু’টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে, সঙ্গে দু’হাজার টাকা। এতেই চলে যাচ্ছে অনেকের। কারও বা সঙ্গে কিছুটা চাষবাস আছে এখনও।’ ‘আজকের দিনে কী করে চলে ওই টাকায়?’ প্রশ্ন করতেই একটু যেন বিরক্ত হয়েই এক জন উত্তর দিল, ‘উপায় না থাকলে আর কী করা যাবে?’ নাম লেখা যাবে না এই শর্তে তুলসী কাঠের মালা গলায় পাশ থেকে এক জন উত্তর দিল, ‘আমাদের এখন আর কিছুই করার নেই। কবে জমি ফেরত পাব কিছুই জানি না। বিষয়টা কোর্টে চলে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণের টাকাও আর নেওয়ার কোনও উপায় নেই।

দেখুন সেই ভিডিও

এই মানুষদের সবাই প্রায় সেই সময় জমি না দেওয়ার আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। পুলিশের হাতে মার খেয়ে জেদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। শেষে টাটা বাধ্য হয় কারখানা এখান থেকে সরিয়ে নিতে। তবে কি সিঙ্গুরে বড় শিল্প হোক সেটা এরা কেউ চায়নি? এই প্রথম একটু থমকালো সবাই। কারখানার প্রয়োজন কেউ অস্বীকার করার অবস্থায় নেই। কিন্তু মনে সন্দেহ ছিল, তাঁদের কী হবে? জমি চলে গেলে তাঁদের ছেলে-মেয়েরা পড়ে কী করবে? তাঁদের চাকরির নিশ্চয়তা ঠিক কতটা? এই সব নানা প্রশ্নে দ্বিধা ছিল মনে। সঙ্গে জমি আন্দোলনের নেতাদের জমি ফেরতের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি। সব মিলিয়ে কীসে যে তাঁদের ভাল, সেটাই যেন ভাল করে বুঝে উঠতে পারেননি তাঁরা। তবে আমার মতে এই দায় তাঁদের একার নয়, দায় যাঁরা সরকারে ছিলেন তাঁদেরও। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টায় তাঁদের ঘাটতি ছিল অনেক। এই জাতীয় কাজে অনেক আন্তরিকতা দরকার। জমি চলে যাওয়া মানুষদের যে সহানুভূতির প্রয়োজন হয় তার অভাবই জমি আন্দোলনকে ফুলে-ফেঁপে উঠতে সাহায্য করেছিল। মনের মধ্যে জমে থাকা অনেক প্রশ্নের উত্তর পাননি তাঁরা কারও কাছে। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে সেই সময়ে রাজ্যের সমস্ত বিরোধী শক্তি। উঠে আসার আগে এক জন স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিল, ‘আমরা রাজনীতির শিকার।’ আর এক জনের কথায়, ‘আমরা সব বলির পাঁঠা।’ তুলসী কাঠের মালা গলায় মানুষটা বেশ জোরের সঙ্গেই আমার কাছে দাবি জানাল, ‘আপনি করুন না একটা চেষ্টা, দেখুন না কোর্টের বাইরে কিছু করা যায় কি না? কিম্বা জমি দেওয়া বাড়ির ছেলেমেয়েদের চাকরির একটা নিশ্চিত ব্যবস্থা। এ বার কিছু একটা হলে সবাই একসঙ্গেই জমি দেব। ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকের কোনও বিভেদ থাকবে না। এই ভাবে আর বেশি দিন বাঁচা যাবে না।’ মনটা ভার হয়ে এল। ভিতরে ভিতরে মানুষগুলো কতটা খারাপ অবস্থার মধ্যে থাকলে আমার মতো সামান্য এক অভিনেতাকে এই কথাগুলো বলতে পারে? এ যেন প্রবল বন্যায় ভেসে যাওয়ার আগে খড়-কুটো আঁকড়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা। কী বলা উচিত বুঝতে পারছিলাম না। কিছু করার মতো কোনও ক্ষমতাই আমার নেই, তাই সুযোগ পেলে কথাগুলো ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেব, শুধু এই প্রতিশ্রুতিটুকু দিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে। গাড়ি এগোলো পূর্বপাড়ার দিকে...সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের আঁতুড়ঘর...।

পরের অংশ পড়তে এবং আরও ভিডিও দেখতে নীচের ২-এ ক্লিক করুন

 

বাজারের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে আসা স্থানীয় এসএফআই কর্মী এর বেশি আর তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় বলে বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল উল্টো দিকে। গ্রামের ভিতরে কিছুটা এগিয়ে ডান দিকে বাঁক নিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা মানুষগুলো যেন একটু নড়েচড়ে বসল। কথা শুরু হতেই একে একে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকল। অভিযোগের বিষয়গুলো আগের মতোই, শুধু কথার ঝাঁঝ অনেক বেশি। তবে জমির ব্যাপারে এরা অনেক বেশি রিজিড। বিশ্বাস, জমি তারা ফেরত পাবেই। বিশেষ করে জমি অধিগ্রহণের সময় প্রশাসন তাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে সেটা কোনও দিন ভোলা সম্ভব নয়। পুলিশের লাঠির বাড়িতে কারও হাত ভেঙেছে, কারও আঙুল এখনও ভাল করে সোজা হয় না। সেই সময়টা তাদের কাছে এখনও দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়। খুব জোর দিয়ে জানিয়ে দিল, এইখানে কোথাও সিপিএমের ভোটের প্রচার চোখে পড়বে না। একটাও ভোট যে তারা সিপিএমকে দেবে না সে কথা বেশ জোরের সঙ্গেই জানিয়ে দিল কেউ কেউ।

আমার প্রশ্ন একটাই, স্থানীয় মানুষ কারখানা চায় কি চায় না? একটু আমতা আমতা শোনাল যেন এ বার উত্তরটা। বিষয়টা ঠিক টাটার কারখানা হওয়া না হওয়া নিয়ে নয়, বিষয়টা জমি নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে, জমির দাম নিয়ে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে। তবে কারও কারও এই বিশ্বাসও ছিল, কিছু দিন বাদে জমির দাম বেড়ে গেলে টাটা এখানে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করবে। কারখানা একটা আই ওয়াশ। কারও মতে, অল্প জমিতেও এটা করা সম্ভব। কেউ কেউ ভেবেছিলেন কারখানা হলে বাইরের লোকেরা এখানে এসে এলাকার দখল নিয়ে নেবে। আরও নানা ধ্যানধারণা তাঁদের মনের মধ্যে জমাট হয়ে আছে। সিপিএম এবং টিএমসি-র মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ এখানে এতটাই তীব্র যে, যুক্তি দিয়ে কোনও বিরুদ্ধমত নিয়ে আলোচনার জায়গায় এই মানুষগুলো আর প্রায় নেই বললেই চলে। একটা তীব্র আক্রোশ কাজ করছে সবার মধ্যে। রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে সমস্যার সমাধান করা যায় কি না জানতে চাইলে, একটাই উত্তর, আমাদের জন্য যা ভাবার মুখ্যমন্ত্রী ভাববেন। আর কারও কিছু ভাবার দরকার নেই। পরে আবার আসব, এইখানেই বসে কথা হবে, এই বলে উঠে এলাম ধীরে ধীরে। মাথার মধ্যে ঘুরছে একটাই কথা— যাদের আমরা এত দিন জমি দিতে অনিচ্ছুক চাষি বলে জেনে এসেছি তারা কি সত্যি সত্যিই অনিচ্ছুক? না কি জমির দাম, নেওয়ার পদ্ধতি এগুলোই ছিল তাঁদের অসন্তোষের কারণ? পরে যেটা জেদাজেদির জায়গায় চলে যায়। আরও ঘুরতে হবে, আরও মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জানতে হবে তাঁদের কথা, যাঁরা জমি দিতে রাজি হয়েছিল, তাঁরা কি ভাবছে, তাঁরা কি চাইছে...

টাটার গাড়ি তৈরির কারখানার জন্য জমি দিতে চাওয়া ইচ্ছুক চাষিরাই সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি, তাই তাঁদের কথাও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। জয়মল্লার পাখিরা পাড়া— নারায়ণচন্দ্র পাখিরা, মধ্য বয়সের মানুষ। পেশায় চাষি। কারখানার জন্য জমি দিয়েছেন সরকারকে। আশা ছিল, কারখানা হলে এলাকার মানুষের উন্নতি হবে। এলাকার কম বয়সী ছেলেগুলোকে আর বাড়ির বাইরে যেতে হবে না কাজের খোঁজে। অধিগৃহীত জমির সবখানেই যে সারা বছর খুব ভাল চাষ হয় মানতে নারাজ। বরং বহু জায়গায় একটু বৃষ্টি হলেই জল জমে থাকে অনেক দিন। সঙ্গে সার, বিদ্যুৎ, কীটনাশক এ সবের দামের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি চাষির আয় কমিয়ে দিয়েছে একটু একটু করে। বেশির ভাগ লোকের পরিবার যে ভাবে বাড়ছে চাষের জমি সে ভাবে বাড়ছে না। তাই জমির উপর নির্ভরশীল লোকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আয় কমতে থাকায় কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে চাষবাসের আগ্রহ কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সঙ্গে শহুরে জীবনযাত্রার হাতছানি। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় কলকারখানা তৈরি না করা গেলে পরের প্রজন্মের জন্য সেটা একেবারেই ভাল হবে না বলে তিনি মনে করেন।

দেখুন সেই ভিডিও

বৃদ্ধ শ্রীচরণ পাখিরা প্রথম দিকে রাজি ছিলেন না। পরে রাজি হয়েছেন জমি দিতে, কারখানা না হওয়ায় কপালে দুশ্চিন্তার মেঘ। রমাপদ সাঁতরা, হরি পাত্র, লতিকা ভর, কাজল ধারা দূর থেকে ক্যামেরা দেখে টিভি চ্যানেলের লোক ভেবে হইহই করে ছুটে এলেন অভিযোগ জানাতে। ভাল নেই তাঁরা। বন্যার সময়ে রাস্তাঘাট জলে ডুবে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। সরকারি সাহায্য কিছু জোটে না বললেই চলে। পঞ্চায়েতের স্বজনপোষণে সবাই ক্ষিপ্ত। যাঁদের পাওয়ার কথা তাঁরা কোনও সাহায্য পাচ্ছেন না। যাঁদের পাওয়ার নয় তাঁরা পাচ্ছেন। তাই কারখানা হোক। কারখানা হলে কিছু কাজ জুটবে এই আশায় বুক বেঁধেছিলেন অনেকে। আজ তাঁরা হতাশ। জানতে চেয়েছিলাম, নিজেদের মধ্যে এই ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকের বিভেদ কেন? পাশ থেকে এক জন বলে উঠল, এ সব রাজনীতির খেলা। প্রথম দিকে জমির দাম নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সেটা এ ভাবে নিজেদের কাজে লাগাবে সেটা তখন কেউ বোঝেনি। ভাল করে খোঁজ নিলে না কি দেখা যাবে, সেই সময় জমির দাম নিতে রাজি না হওয়া বহু মানুষ আজ নিজেদের ভুল বুঝেছেন। ক্ষতিপূরণের টাকা পেলে এক্ষুনি নিতে রাজি তাঁরা। কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় সে কথা বাইরে বলার উপায় নেই। বেরাবেরি মৌজার রবীন্দ্রনাথ সাঁতরা, গদাধর সাঁতরা, শুভেন্দু সাঁতরা, নৃত্যানন্দ সাঁতরা— প্রত্যেকের একই কথা।

কয়েক বছর আগেও এই অঞ্চলটা যে ভাবে জমে উঠছিল, আজ তার লেশমাত্র নেই। কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে, ব্যবসাপাতির অবস্থাও খারাপ। কেউ কেউ এখনও আশা রাখেন যদি সরকার আবার টাটাকে ফিরিয়ে আনতে পারে এখানে মানুষ দ্বিতীয় বার আর এই ভুল করবে না। এঁদের কথায়, ইচ্ছুক-অনিচ্ছুকদের অনেকেই আজ এটা বুঝতে পারছে যে কারখানা আকাশে হয় না। তার জন্য জমি লাগে। আর একটা এত বড় কারখানার জন্য যে পরিমাণ জমি লাগে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে তা যে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়, আজকের পশ্চিমবঙ্গ তার সব থেকে বড় প্রমাণ। এই প্রসঙ্গে আমার নিজেরও মত হল, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাস্তবের যা অবস্থা, তাতে জমি মাফিয়াদের হাত থেকে যদি সাধারণ চাষিদের বাঁচাতে হয় তবে এই জাতীয় কাজে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনও পথ নেই। সরকার না থাকলে জমির দালালেরা সেখানে শকুনের মতো উড়ে বেড়াবে। শকুন মরা মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই তাঁদের বেঁচে থাকার জন্য কয়েকটা মানুষের লাশ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আকাশের শকুনেরা কাউকে ঠুকরে লাশ করে না। তারা শুধু উপর থেকে নজর রাখে। কিন্তু দু’পেয়ে শকুনদের আবার ধৈর্য নেই। তারা শুধু নজর রাখে না, তারা লাশ বানিয়ে ছাড়ে... কোনটা ঠিক আমি বলার কেউ নই, মানুষ বলবে, সরকার বলবে... আমি শুধু বলতে পারি, মানুষকে লাশ বানানোর এই খেলায় আমার মত নেই। আমি তাঁদের বাঁচিয়ে রাখার দলে। সিঙ্গুরের মানুষের জন্য রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে যারাই কিছু করতে চায়, যারা শুধু দু’টাকা কেজি চাল আর দু’হাজার টাকা বিলিয়ে নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে রাজি নয়, যারা তাঁদেরকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে মানুষের মতো বাঁচিয়ে রাখতে চায় আমি তাদের দলে। সে দলের রং যাই হোক না কেন।

সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁদের পাশে গিয়ে বলে আসব আমি তোমাদেরই লোক!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
আরও খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন