রক্ত দেখলে তার গা গুলোয়। বন্দুক ধরতে হাত কাঁপে।

এ নায়ক কেমন নায়ক?

দেবের নতুন ছবির নাম ‘বুনোহাঁস’ ঠিকই। নামটা অনায়াসে ‘চ্যালেঞ্জ-৩’ ও হতে পারত। চ্যালেঞ্জ ১ আর ২ তো হয়ে গিয়েছে। এ বার নায়ক না-হওয়াটাই দেবের তিন নম্বর চ্যালেঞ্জ। “দেবকে লুকিয়ে রাখাটাই এ বার আমার প্রধান কাজ,” বলছেন তিনি নিজেই।

কারণ? নতুন ছবিতে দেব রংবাজি ছেড়ে এক নিরীহ ভালমানুষের ভূমিকায়। পরিস্থিতির হাতছানি, অতি সরল মন আর অনটনের চাপে যাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয় অপরাধ জগতের সঙ্গে। সাধারণত নায়কেরা কেরিয়ারের এই রকম পর্বে ইমেজ নিয়ে সচেতন হয়ে থাকেন। নায়ক হিসেবে চুটিয়ে কাজ করতে করতেই চরিত্র নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় নেমে পড়েন না। 

দেব কিন্তু ঠিক সেটাই করতে চাইছেন।

নায়ক হিসেবে আবির্ভাব আট বছর আগে। প্রথম ছবি ‘অগ্নিশপথ’। তার পরে ‘আই লভ ইউ’ (২০০৭), ‘মন মানে না’ (২০০৮), ‘চ্যালেঞ্জ’ (২০০৯)...। পরপর সুপারহিটের লাইনে ছেদ পড়েনি আর। এই ক’দিন আগেই মুক্তি পেয়েছে ‘বিন্দাস’। তারই মধ্যে এ বার সিঁথি কেটে চুল আঁচড়ানো নিরীহ যুবক সেজে পর্দায় আসছেন তিনি। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। দ্রুত রোজগার বাড়ানোর আশায় যে অজান্তেই একটা বিপজ্জনক রাস্তায় পা বাড়ায়।

অর্থাৎ? প্রসেনজিৎ-চিরঞ্জিত বা তাপসকে একটু অন্য ধরনের ছবিতে দেখার জন্য দর্শককে যতগুলো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, দেবের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। প্রসেনজিতের ব্লকবাস্টার ‘অমর সঙ্গী’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৭ সালে। ওই বছরই তাপস পালের ‘গুরুদক্ষিণা’, চিরঞ্জিতের ‘অমর কণ্টক’। সেখান থেকে প্রথম যে ভিনগোত্রীয় ছবিতে পূর্ণাঙ্গ চরিত্র করলেন প্রসেনজিৎ, সেটি ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’। ২০০০ সালের ছবি। চিরঞ্জিত এর পরেই করলেন ‘বাড়িওয়ালি’। তাপসকে দেখা গেল বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘উত্তরা’য়।

উদাহরণ আরও বাড়ানো যায়। মিঠুন চক্রবর্তী ১৯৭৬ সালে ‘মৃগয়া’ দিয়ে শুরু করার পরে ‘গান মাস্টার জি-৯’, ‘ডিস্কো ডান্সার’ পেরিয়ে ১৯৯২-এ এসে তবে ‘তাহাদের কথা’ করেছেন। দেবশ্রী রায় আশির দশকের গোড়ায় দাদার কীর্তি, ৩৬ চৌরঙ্গী লেন করার পরে উনিশে এপ্রিল করেন পাক্কা ১৪ বছর পর, ১৯৯৪ সালে।

এই লম্বা সময়টা কিন্তু দেব-কে নিতে হচ্ছে না। কারণ, সময়টাই বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে বাংলা ছবির চালচিত্রও। দেব নিজেই বলছেন, “এটা দ্রুত গতির যুগ। যে গতিতে সময় বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে ভাঙচুর করতে হবে।”

বাংলাতে পরমব্রত-শাশ্বত-আবির-ইন্দ্রনীলরা আছেন, যাঁরা মূলত ভিনধারার ছবির মুখ হিসেবেই পরিচিত। প্রসেনজিৎ নিজের ইমেজ ভেঙে দ্বিতীয় ইনিংসেও এক নম্বরে। দেব-ও কি এ বার সেই ক্লাবে নাম লেখাতে চলেছেন? নায়কের বক্তব্য এ ব্যাপারে খুব স্পষ্ট। “আমি এখন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে পরিণত করতে চাই। আমজনতার মন জয় করার পরে এ বার আরও সিরিয়াস দর্শকের কাছে পৌঁছতে চাই।”

‘চাঁদের পাহাড়’ করা হয়ে গিয়েছে। এর পরেই অপর্ণা সেনের নতুন ছবিতে দেখা যাবে তাঁকে। তার মধ্যে এল ‘বুনোহাঁস’। ছবিতে দেবের অন্যতম নায়িকা শ্রাবন্তী এর আগে অপর্ণার ‘গয়নার বাক্সে’ অভিনয় করেছিলেন। ভিনধারার ছবিতে ‘বুনোহাঁস’ তাঁরও দ্বিতীয় পদক্ষেপ। অন্যদের মধ্যে কোয়েল সৃজিত-সন্দীপ রায়ের ছবিতে কাজ করেছেন। শুভশ্রী অভিনয় করেছেন অঞ্জন দত্তের ছবিতে।

হিন্দিতে প্রায় একই ভাবে রণবীর কপূর ‘বরফি’ বা ‘বম্বে ভেলভেট’ করছেন, সোনাক্ষী সিংহ ‘দবঙ্গ টু’ করতে করতেই ‘লুটেরা’ করছেন। শাহিদ কপূর চকোলেট হিরো সাজার ফাঁকেই ‘কামিনে’ বা ‘হায়দার’-এ অভিনয় করছেন। আলিয়া ভট্টের দ্বিতীয় ছবিই ছিল ‘হাইওয়ে’। টলিউড হোক বা বলিউড, নতুন প্রজন্মের নায়ক-নায়িকারা আজকাল কোনও একটা ইমেজে বাঁধা পড়ে থাকতে নারাজ। অথচ এক সময় ছবিটা ছিল ঠিক উল্টো। সযত্নে পর্দার ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ভাবমূর্তিকে প্রতি পদে রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকতেন তারকারা। আজ তাঁরা ফেসবুক-টুইটারে সরাসরি জনসংযোগ করছেন, নিয়মিত ছোট পর্দায় আসছেন। সেই সঙ্গে নানা রকম চরিত্রে অভিনয় করে নতুনত্বের চমক দিতে চাইছেন।

এই বদলটা কী করে এল? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই এ দেশে ‘আর্ট সিনেমা’র ধারণাটা ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। সে সময় বেশ কিছুদিন মশলা ছবির বাইরে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নয়ের দশকের মাঝপর্বে আরম্ভ করে নতুন শতকের গোড়ার দিকে দর্শক মনোরঞ্জনে গুরুত্ব দিয়ে এবং জনপ্রিয় উপাদানকে ব্যবহার করে একটা মাঝামাঝি ধারার ছবি তৈরি শুরু হল। হিন্দিতে অনুরাগ কাশ্যপ-ইমতিয়াজ আলি-বিশাল ভরদ্বাজদের পাশাপাশি বাংলায় দেখা গেল সৃজিত মুখোপাধ্যায়-কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়-অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীদের। এঁদের ছবি এক দিকে তারকাদের কিছুটা ভিনগোত্রীয় চরিত্র করার সুযোগ দিল, আবার তাঁদের তারকা-মূল্যকে কাজে লাগিয়ে বক্স অফিস ধরার দৌড়েও এগিয়ে থাকতে চাইল।

‘বুনোহাঁসে’র পরিচালক অনিরুদ্ধ যেমন খোলাখুলি বলছেন, অনুরণন-অন্তহীন-অপরাজিতা তুমির মতো ছবি করার পরে তিনি এ বার উচ্চবিত্তের ড্রইং রুম ছেড়ে বেরিয়ে বৃহত্তর জনতার কাছে পৌঁছতে চান। দেব-এর উপস্থিতি অবশ্যই তাঁকে সে কাজে সাহায্য করবে। আবার অমলের মতো সরল সাদাসিধে চরিত্রর জন্য যে দেবের সুকুমার মুখটাই দরকার ছিল, এটাও সমান সত্য।

‘লে ছক্কা’ বা ‘দুই পৃথিবী’র মতো ছবিতে এর আগে দেব সাদাসিধে চরিত্র করেননি তা নয়। কিন্তু তারা শেষ অবধি নায়কই হয়ে উঠেছিল। ‘চাঁদের পাহাড়’ করেছেন। যেখানে শঙ্কর-এর চরিত্রায়ণ অনেকটা সুপারহিরোর আদলে গড়া হয়েছিল। কিন্তু আদ্যোপান্ত ‘কমন ম্যান’? ১৫ অগস্ট মুক্তি পেতে চলা ‘বুনোহাঁস’ই দেব-এর জন্য সেই ছবি, প্রথম ছবি।

ছবির একটি সংলাপ বলছে, ‘খোকাবাবু বড় হয়ে গেল!’ প্রতীকী নিঃসন্দেহে!