Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১১ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রায়

নতুন উপন্যাসের নাম ‘নো কান্ট্রি’। কিন্তু ভাবনায় তিনি দেশহীন নন। নিউ ইয়র্কে বসেও দিব্যি দেখতে পান দেশপ্রিয় পার্কের চিলেকোঠার ঘর। কল্যাণ রায়-এ

২৬ জুলাই ২০১৪ ০০:২৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
ছবি: কৌশিক সরকার

ছবি: কৌশিক সরকার

Popup Close

রীনাদি, কল্যাণদা, প্রথমেই বলি আমাকে যখন আনন্দplus-এর তরফে বলা হয় কল্যাণদার নতুন উপন্যাস নিয়ে আড্ডা হবে, আমি বলেছিলাম, উপন্যাসটা আমি পড়িনি। আমি হলাম বিয়েবাড়ির ডেকরেটর। ফুলশয্যার ফুল আমি সাজিয়ে দিচ্ছি। বাকিটা বর-বৌ বুঝে নেবে।
কল্যাণ: হা হা হা হা
অপর্ণা: কৌশিকটা না খুব...

আচ্ছা, উপন্যাস যখন বেরোচ্ছে তখন উপন্যাস নিয়েই কথাবার্তা শুরু হোক। কল্যাণদা, এটা কি তোমার প্রথম উপন্যাস?
কল্যাণ: না, প্রথম নয়। দ্বিতীয়। এর আগে আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম। কিন্তু সেটা ছিল একেবারে একটা ‘নিশ’ রিডারশিপের জন্য। সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটাই আমার প্রথম উপন্যাস বলতে পারো।

রীনাদির তো পড়া হয়ে গিয়েছে?
অপর্ণা: হ্যাঁ, অনেকবার পড়েছি কৌশিক। আমি তো স্বামীর গর্বে গর্বিতা। দারুণ রিভিউ বেরিয়েছে উপন্যাসের। প্রভূত প্রশংসা। আই ফিল নাইস। আই ফিল প্রাউড।

আচ্ছা কল্যাণদা ‘নো কান্ট্রি’র বিষয়বস্তুটা কী?
কল্যাণ: এই গল্পটির ব্যাপ্তি প্রায় দুই শতাব্দী আর তিনটে মহাদেশ নিয়ে। সেখানে কখনও আঠেরোশো শতকের ইন্ডিয়া আছে, সেই সময়ের ডাবলিন আছে, নিউ ইয়র্ক আছে। বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এবং চরিত্র এসে পড়েছে উপন্যাসের মধ্যে। আমাদের কলকাতাতেও যে হাইব্রিড আইরিশ-ইন্ডিয়ান পপুলেশন আছে তাদের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রেম, বিশ্বাস, খুন আরও অনেক কিছু।

তার মানে তোমার এই উপন্যাসের মেরুদণ্ড হল ইতিহাস।
কল্যাণ: হ্যাঁ, আমি ছ’বছর গবেষণা করেছি এই উপন্যাস লেখার জন্য। যাতে সমস্তটাই বাস্তব হয়ে ওঠে।

উপন্যাস নিয়ে আর কথা বলব না। বাকিটা পাঠকদের জন্য রহস্যই থাক। যে হেতু প্রেম এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য নিউইয়র্ক আর বাংলার প্রেম নিয়ে কথা হোক। কল্যাণদা, তোমাদের দেখা তো নিউ ইয়র্কে?
কল্যাণ: হ্যাঁ।

জানো রীনাদি, বাঙালি মনে করে তুমি খুব খুঁতখুঁতে। তাই রীনাদির কাউকে পছন্দ হয়েছে মানে সেটা বড় খবর। আফটার অল তুমি একমাত্র অভিনেত্রী যিনি উত্তমকুমারকে বলতেন উত্তমবাবু!
অপর্ণা: এই রে, আমার তো কখনও মনেই হয়নি উত্তমদা বলতে।

আচ্ছা তোমাদের দেখা হওয়ার কথায় ফিরি।
অপর্ণা: নিউ ইয়র্কে একটা পার্টিতে দেখা হয়েছিল। ও কথা বলছিল ডোনা (মেয়ে)র সঙ্গে। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে। কিন্তু শুনলাম কথা হচ্ছে মূলত বাংলাতে। ইংরেজিও যেটা বলছে, সেটা কোনও অ্যাকসেন্ট ছাড়াই। আরও শুনলাম যে, লোকটা রান্নাও করে। আমার তো ভাল লাগল। পরের দিন কথা বলতে গিয়ে দেখলাম লোকটা সত্যিই ভীষণ ইন্টারেস্টিং। (হেসে) তবে ও কিন্তু আমাকে বিয়ে করেছে কারণ আমি চিদানন্দ দাশগুপ্তের মেয়ে এবং জীবনানন্দ দাশের ভাগনি, তাই...
কল্যাণ: হা হা হা... এটা ও সব সময় বলে। তবে খানিকটা সত্যিও। আমি তো জীবনানন্দে বুঁদ হয়ে থাকতাম। আমাদের দু’জনের কমন ফ্যাক্টর মনে হয় কবিতা। দু’জনেই তো তাতে মগ্ন...

আচ্ছা, কলকাতায় থাকাকালীন তুমি রীনাদির কোনও ছবি দেখনি কল্যাণদা?
কল্যাণ: একটাই ছবি দেখেছিলাম। ‘বাক্সবদল’। সেই সময় আমাদের বাড়ির একটা রেওয়াজ ছিল। কারও বিয়ে হলে, বিয়ের পর ৩০-৪০ জন মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া হত।

কী সুন্দর রীতি ছিল আমাদের। ধীরে ধীরে এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
অপর্ণা: সত্যি, কৌশিক।

তারপর?
কল্যাণ: তারপর সেই সিনেমা দেখা হল। ভালই লাগল। তারপর বাড়ি ফিরে এলাম। আমার এক কাজিন, ওর তখন পাঁচ বছর বয়স। ওর মনে হয়েছিল বিয়ে হলে বর বৌকে প্রচুর লোকে পাত্তা দেয়। সেই দেখেই বোধ হয় ও বাড়ি এসে অ্যানাউন্স করল, ‘আমি অপর্ণা দাশগুপ্তকে বিয়ে করব’। পরে যখন বিয়ে হল আমার আর রীনার, সেই কাজিনকে গিয়ে বলেছিলাম, ‘সরি রে। তোর বিয়ে করার কথা ছিল, আমি করে নিলাম।’ ও তখন লজ্জা পেয়ে, ‘আরে বৌদি, দাদা কী বলছে’ জাতীয় কথা বলে পালাতে পারলে বাঁচে।

তার মানে তুমি শুধু ‘বাক্সবদল’ দেখেছিলে?
কল্যাণ: না, ওটা ছাড়া আমি ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন’ দেখেছিলাম।

তার মানে ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন’ দেখেই তোমার মন নরম হল?
অপর্ণা: একদম ঠিক বলেছে (অপর্ণা সেনের সেই বিখ্যাত হাসি)
কল্যাণ: একটা কথা বলি। আমি কিন্তু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখতে বসেছিলাম। এটা আমি রীনার কাছেও কনফেস করেছি। আমার মনে হয়েছিল সুন্দরী অভিনেত্রী, কেউ একটা বানিয়ে দিয়েছে।

হ্যাঁ, সেই সময় কলকাতা ভাবত সত্যজিত্‌ রায় বানিয়ে দিয়েছেন। পরে ঋতুপর্ণ ঘোষ যখন ‘উনিশে এপ্রিল’ বানাল, সবাই বলল অপর্ণা সেন বানিয়ে দিয়েছে। সেই কপালের ভাগ্য আমারও। ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ বলা হল ঋতুদা বানিয়েছে। আজকের চুর্ণীর ছবি জানি লোকে বলবে কৌশিক বানিয়েছে।
অর্পণা: এগজ্যাক্টলি। অদ্ভুত। তবে আগের ফিল্মমেকারদের ফিল্মোগ্রাফি দেখলে মনে হয় চূর্ণী ভালই করবে।

আচ্ছা, তোমাদের দেখা হওয়ার কথা কিন্তু শেষ হল না।
অপর্ণা: ওহ্‌ আচ্ছা। পরের দিন সকালে পুলের ধারে কথা হচ্ছিল আমাদের। কোনও বাসন ফেরত দিতে এসেছিল ও। আমরা ইয়েটসের কবিতা নিয়ে কথা বলছিলাম। একটা লাইন আমি বলছিলাম, আর একটা লাইন ও বলছিল। সে ভাবেই আমাদের বন্ডিংটা তৈরি হল। আবিষ্কার করলাম ভদ্রলোক একজন প্রোফেসর। এবং উনি গ্রিসে যাচ্ছেন গ্রিক ট্র্যাজেডি পড়াবেন বলে।
কল্যাণ: আসলে ও মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল (হাসি)
কল্যাণ: (হেসে) অ্যাকচুয়ালি তাই।


তার মানে তোমাদের বিয়ের ঘটকালি করেছিল ইয়েটস।
কল্যাণ ও অপর্ণা: হা হা হা হা

আচ্ছা, কল্যাণদা, তুমি যে এত বড় একটা উপন্যাস লিখলে, এটা কি নিউ ইয়র্কে একা থাকো বলে সম্ভব হল?
কল্যাণ: হ্যাঁ, কৌশিক। মনে হয় তাই। ওখানে ফোন নেই। সব ছেড়ে ছুড়ে মন দিয়ে লিখতাম। এমনকী ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস্‌’টাও পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

রীনাদি, উপন্যাস পড়ে তোমার মনে হয়নি ছবি করা উচিত?
অপর্ণা: হ্যাঁ, মনে যে হয়নি তা নয়। কিন্তু প্রেমাইসটা এত বড় যে ‘গডফাদার’য়ের মতো ১, ২, ৩ তিনটে পার্টে করতে হবে। আসলে কী জানো, আমি ইমেজের সাহায্যে একটা গল্প বলি। কল্যাণ শব্দের সাহায্যে গল্প বলে।

আচ্ছা অঞ্জন দত্তের একটা গান আছে না ‘অভিমানী অপর্ণা সেন’.... কল্যাণদা শুনেছে?
অপর্ণা: ও সব একদম বলবে না। অভিমান-টভিমান একদম বোঝে না তোমাদের কল্যাণদা।
কল্যাণ: হা হা হা...
অপর্ণা: অভিমান করে দেখেছি, কোনও লাভ হয় না।
কল্যাণ: (হেসে) আরে যখন ও প্রেমিকা ছিল, তখন অভিমান করলে আমি রই্যাক্ট করতাম। ও বুঝতে পারত। বিয়ের পর ওর অভিমানে রই্যাক্ট করলেও ও আর তাতে গুরুত্ব দেয় না। (হেসে) বুঝলেও বুঝছে না ভান করে থাকে, আর কী...
অপর্ণা: এটা ভীষণ অন্যায়।

রীনাদির ছবিতে একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি। ছবির ব্যাকবোনে থাকে পলিটিকাল ঘটনা, তাই ফিকশন হলেও ছবিগুলো দেখার সময় মনে হয় যেন বাস্তবেই দেখছি।
কল্যাণ: আমার উপন্যাস নিয়ে পাঠকের আগ্রহটাও মনে হয় সেই জন্য। এখনও চিঠি পাচ্ছি উপন্যাসটা নিয়ে। এই তো আয়ারল্যান্ড থেকে এক জন লিখেছিল যে তিনি এখনও প্রত্যেক গ্রীষ্মে আয়ারল্যান্ডের ওই সব জায়গাগুলোয় যান। কিন্তু উপন্যাসটা পড়ার পর থেকে জায়গাগুলোকে অন্যভাবে আবিষ্কার করছেন।

রীনাদি যখন ছবি বানায়, তুমি সেটে যাও কল্যাণদা?
অপর্ণা: ‘পারমিতার একদিন’য়ের শু্যটিংয়ের সময় কী একটা গণ্ডগোল হচ্ছিল। যত দূর মনে পড়ছে পাড়ার ছেলেরা ঝামেলা করছিল। প্রোডিউসরেরা সামলাতে পারছে না। ও এসে হাজির হল সেটে। কোন এক লোকাল ‘দাদা’কে ও চিনত কলেজের সময় থেকে...
কল্যাণ: প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় আমহার্স্ট স্ট্রিটের ও দিকটায় থাকতাম। তখনই ওই ‘দাদা’কে চিনতাম।

প্রায় এক ঘণ্টা আড্ডা হল আমাদের। একটা কথা বলতেই হচ্ছে, বিদেশে থাকলে লোকজনের ভাষা কেমন যেন বদলে যায়। কিন্তু কল্যাণদার মধ্যে এখনও একজন আড্ডাবাজ বাঙালি রয়ে গিয়েছে...
অপর্ণা: হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওর মধ্যে ওই বাঙালিয়ানাটা রয়েছেই...
কল্যাণ: আমি তো বাংলাতেও বড় গল্প লিখেছি। ‘তারা সায়রের মা’। সেই গল্প পড়ে সাগরময় ঘোষ আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার এ বার উপন্যাস লেখার সময় হয়েছে’। শুনেছি সাগরদা এই কথা আরও দু’জনকে বলেছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

একটা কথা বলো কল্যাণদা। তুমি যে কলকাতায় ফিরে আসবে, সেটা কি ঠিক করে ফেলেছ?
কল্যাণ: হ্যাঁ। একদম। (একটু থেমে) আমার না দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটা চিলেকোঠার ঘর দরকার। আসলে ওখানেই তো আমার আত্মা বাস করে। ওখানেই তো কলেজ জীবনে আড্ডা মারতাম। ক্যালকাটাই তো আমাকে নার্চার করেছে...

কল্যাণদা, ফিরে আসবে যখন ঠিক করেছ, এই বইটা তা হলে তোমার ফেয়ারওয়েল টু নিউইয়র্ক আর একাকীত্বের...
অপর্ণা: (পাশ থেকে) আমার একাকীত্বেরও ফেয়ারওয়েল।

ফিরে আসার পর কী হবে?
কল্যাণ: আমি আমার মতো করে সাজিয়ে নেব ঘর।
অপর্ণা: ও কিন্তু বড্ড বেশি অগোছালো। নিউ ইয়র্কে ওর কাছে গেলে আমাকে তো লিখতে ক্যাফেতে যেতে হয়।
কল্যাণ: রীনা বড্ড বেশি গোছালো।
অপর্ণা: একদিনই ও নিজের ঘর গুছিয়ে রেখেছিল। যে দিন প্রথম ওর বাড়ি আমি গিয়েছিলাম।
কল্যাণ: ধুর্‌, আমি জানতামই না তুমি আসবে।

কিন্তু তুমি ফিরে এসো কল্যাণদা। নিজের জায়গায়। দেশপ্রিয় পার্কের পাশের চিলেকোঠায়। যেটা না নিউ ইয়র্ক। না কলকাতা। সে জায়গার নাম হবে ‘নো কানট্রি’। আজ তা হলে উঠি।
অপর্ণা: তোমার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আমাদেরও ভীষণ ভাল লাগল। দেখা হবে ২৯ তারিখ বুক লঞ্চে...

ও দিন তোমাদের অ্যানিভার্সারি না?
অপর্ণা: এটাও তুমি জানো!

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement