আমেরিকায় তো দু’জনে চাকরি করছিলেন, সিনেমা করবেন এমন ভাবনা কবে এল?

আমরা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম ওখানে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোনও কানেকশনই ছিল না। কিন্তু ওই এক কাজ করতে করতে বোর হয়ে গিয়েছিলাম। তার পর এক দিন মনে হল যদি ছোট ছোট গল্প লিখি তা হলে একঘেয়েমি ব্যাপারটা তো একটু কাটবে। আর সেই গল্পগুলো দিয়েই যদি শর্ট ফিল্ম তৈরি করি।

দু’জন পরিচালকের জুটি বলিউডে খুব কম দেখা যায়। আব্বাস-মস্তানের পর বোধ হয় আপনারাই। দু’জন মিলে একসঙ্গে ছবি পরিচালনা করার সুবিধাটা কোথায়?

দেখুন, আমরা ও রকম টিপিক্যাল বলিউড ফিল্মমেকার নই। আর না তো আমরা ফিল্ম ইন্ডাস্টির লোক। ছবি তৈরির ব্যকরণটাও আমাদের জানা ছিল না। জীবনে একটা ফিল্মের সেটেও কখনও গিয়ে দেখিনি। তিনটে ফিচার ফিল্ম করার পর প্রথম বারের জন্য অন্য কোনও পরিচালকের সেটে আমাদের যাওয়া। প্রথম ছবি যখন করি তখনও সিনেমার কিছুই জানতাম না। যেটা জানতাম সেটা হল আমরা কী করছি। আর যা করছি তা আমরা দু’জন মিলেই করছি। যে ফিল্মমেকিংটা আমরা জানি, সেটা আমাদের দু’জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আপনাদের দু’জনের মধ্যে ঝামেলা হয় নাকি?

আসলে আমাদের দু’জনকে তো আর কেউ সিনেমা তৈরি করতে বলেনি। নিজেদের ইচ্ছেয় আমরা দু’জন মিলেই শুরু করেছি আমাদের সিনেমার জার্নি। কলেজের সময় থেকে আমরা একসঙ্গে আছি। একসঙ্গে চাকরি করেছি। একে অন্যের শক্তি, দুর্বলতা সবই জানা। কিন্তু হ্যাঁ, সব কিছু সত্ত্বেও দু’জনের আলাদা মত তো থাকেই। মতপার্থক্যও হয়। আমাদের সব সিনেমাই আমরা দু’জন মিলে লিখি। আর ওই লেখার টেবিলেই সব কিছু মিটমাট হয়ে যায়। তবে, শুটিংয়ের সময় একটু-আধটু ঝামেলা হয় বইকি! কখনও চেয়ারের রংটা আমার পছন্দ হচ্ছে না বা আমার কোনও শট টেকিং ডিকে-র পছন্দ হয়নি। এ সব কিছু নিয়েই টুকটাক চলতে থাকে। আর সে তো রোজই হয়ে থাকে আমাদের মধ্যে। আফ্টার অল, আমরা যে বন্ধু।

সেই তিরুপতিতে ইঞ্জিনিয়ারিং করার সময় থেকেই দু’জনের বন্ধুত্ব। রাজ নিদিমোরু (বাঁ দিকে) এবং কৃষ্ণা ডিকে (ডান দিকে)।

কমেডি আপনাদের ছবিতে থাকবেই। তা সে অ্যাকশনের সঙ্গেই হোক আর জম্বির সঙ্গেই হোক। কমেডির বাইরে কি আর অন্য কিছুই ভাবছেন না?

হ্যাঁ, হিউমর আমরা খুব পছন্দ করি। আমরা দু’জনেই যে কোনও বিষয়কে একটা সেন্স অব হিউমর দিয়েই দেখি। আর সব থেকে বড় কথা, হিউমার জোর করে আসে না। অবজ়ারভেশন থেকেই হিউমর আসে। তবে আমরা আমাজনের জন্য একটা অরিজিনাল সিরিজ তৈরি করছি। নাম ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’। শুট অর্ধেক করেও ফেলেছি। মনোজ বাজপায়ীর সঙ্গে প্রথম বার কাজ করছি। বিন্দুমাত্র হিউমর নেই ওখানে। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ পুরোদমের একটা ড্রামা থিলার। 

অক্ষয় কুমার এক বার বলেছিলেন যে, কাঁদানো খুবই সহজ। কিন্তু হাসানো ঠিক ততোধিকই কঠিন। আপনি কী বলছেন?

সত্যিই, ড্রামার থেকে কমেডি অনেক কঠিন। আমি অন্তত এটা বিশ্বাস করি। খুব সহজেই ড্রামা তৈরি করে ফেলা যায়। কিন্তু হিউমর অত সহজে আসে না। তার উপরে সেই হিউমরের মধ্যে একটা সেন্স থাকে, তা হলে সেটা তোলা খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের দেশে কমেডি সিনেমাকে ড্রামাটিক সিনেমার মতো কদর করা হয় না। মানে ওই আর কি, পয়সা দিয়ে হাসতে যাব? কমেডি ছবি যত ভালই হোক না কেন কোথাও সে পুরস্কার পাবে না। এমনকি, ভাল কমেডি ছবিকে ফিল্ম সমালোচকদেরও রেটিং দিতে গায়ে জ্বর আসে।

আরও পড়ুন: নিছক ভূতের গল্প কিংবা ‘অচ্ছে দিন’

রাজ অ্যান্ড ডিকে-র ছবি দেখলেই একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফ্লেভার চোখে পড়ে। সঙ্গে আবার কিছু কিছু মেইনস্ট্রিম উপাদানও থাকে। কম্প্রোমাইজ করতে হয় বলেই কি মেইনস্ট্রিম জায়গাটাও ধরতে হয়?

স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যে কাজ করতে গেলে কম্প্রোমাইজ তো করতেই হবে। ছবির পিছনে প্রযোজক একটা বিরাট অঙ্কের টাকা ঢেলে বসে থাকেন। ইচ্ছে না থাকলেও প্রয়োজনের থেকে বেশি গান ব্যবহার করতে হয়। সব যাতে সহজেই মানুষের মগজস্থ হয়, সে দিকটাও নজরে রাখতে হয়। পুরো বিষয়টা প্যাকেজিং করতে হয়। সব মিলিয়ে কম্প্রোমাইজ তো করতেই হয়। আর কম্প্রোমাইজ করতে হবে না বলেই তো ‘স্ত্রী’ প্রোডিউস করলাম।

আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো, ‘স্ত্রী’ লিখলেন আপনারাই অথচ পরিচালনা না করে প্রযোজনা কেন করলেন?

আমি আর ডি কে দু’জনেই প্রচুর লিখি। একটা ছবির শুটিং করছি। সঙ্গে আরও দুটো স্ক্রিপ্ট রেডি। এ-ও হয়েছে যে দুটো স্ক্রিপ্ট সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এক বছরে একটার বেশি ছবি আমরা তৈরি করতে পারি না। কারণ সেগুলো আর এই সময়ে দাঁড়িয়ে করা সম্ভব নয়। তাই ভেবেছিলাম যে তিন-চারটে স্ক্রিপ্ট তৈরি আছে সেগুলোর থেকে একটা আমরা ডিরেক্ট করব। আর বাকিগুলো প্রোডিউস করব। আর প্রোডিউস করলেও তো সে ছবি আমাদেরই সন্তান। চার বছর আগে ‘স্ত্রী’-র রাফ ড্রাফ্ট আমরা লিখে ফেলেছিলাম। আর যখন ঠিক করলাম প্রযোজনা করব,  এই গত বছরেই ফাইনাল ড্রাফ্ট  শেষ করি।

‘স্ত্রী’ দেখার সময়ে মনে হচ্ছিল যেন ছোটবেলায় দাদুর কাছ থেকে একটা ভূতের গল্প শুনছি। গল্পগাছার মতো কিছুটা। এ রকম আইডিয়া আপনাদের এল কী ভাবে?

কমেডি আর হরর, এই দুটো বিষয়কে মেলাতে আমাদের বেশ ভাল লাগে। ‘গো গোয়া গন’-এ একটা জম্বির মাধ্যমে বিষয়টা উপস্থাপনা করেছিলাম। আর ‘স্ত্রী’-র ক্ষেত্রে সোজা ভূত। তিরুপতিতে আমরা যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং করছিলাম, সেখানে শুনতাম ছেলেরা নাকি বাড়ির বাইরে রাতের দিকে বেরয় না। আর বেরলেও ঘরের মহিলাকে সঙ্গে নিয়েই বেরতে হয়। কারণ, সেখানে নাকি এক মহিলা ভূতের বড় উপদ্রব। পুরুষ মানুষ দেখলেই তাদের তুলে নিয়ে যায়। আর পড়ে থাকে শুধু তাদের জামাকাপড়। আমরা তো শুনেই হাসতে থাকি। ও বাবা। দু’দিন পর দেখি বাড়িতে বাড়িতে পোস্টার। লেখা ‘ও স্ত্রী কাল আনা’। পরে জানতে পারলাম, এ রকমটা লিখলে নাকি স্ত্রী আর আসে না। এক চুটকিতেই আমাদের দেশে মানুষ কী ভাবে ভয় পেয়ে যায়, আর কী ভাবে নিজেরাই তার টোটকা খুঁজে নেয়, সেই মানসিকতাগুলোকে আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি ছবিতে।

শট টেকিং নিয়ে দু’জনের অল্প-বিস্তর খিটিমিটি লেগেই থাকে বলছিলেন রাজ নিদিমোরু। 

ডিরেক্টর খুঁজতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল নাকি?

হ্যাঁ। প্রথমে তো কাউকে পাচ্ছিলামই না। পরে অমরের (‘স্ত্রী’-র পরিচালক অমর কৌশিক) কথা মাথায় আসে। অমর ‘গো গোয়া গন’ ছবিতে আমাদের অ্যাসিস্ট করেছিল। স্মলটাউন বয়। আর এই ছোট শহরের ছোট ছোট বিষয়গুলো নিয়ে ও অবগত। আর অমর আমাদের ভাবনাটা ভাল বুঝতেও পারবে। আমরা যে ভাবে হিউমরের সঙ্গে কানেক্ট করি সে বিষয়টাও ও ধরতে পারবে। তাই অমরের কথাই প্রথমে মাথায় এসেছিল।

প্রথম সপ্তাহে ৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি। আর ১১ দিনের মাথায় প্রায় ৮৩ কোটি টাকার মতো ব্যবসা করে ফেলেছে ‘স্ত্রী’। টাকার অঙ্কটা এত বড় জায়গায় যাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন?

না, কোনও ধারণাই ছিল না। প্রথম দিনে ভেবেছিলাম, ২-৩ কোটি টাকার মতো ব্যবসা করবে হয়তো। কিন্তু সেটা দাঁড়াল ৫ কোটিতে। তবে, এটুকু জানতাম যে, যে-ই ছবিটা দেখতে যাক তার খুব পছন্দ হবে। ওই ছোট শহর, সঙ্গে কমেডি আর হররের মিশেল যে মানুষের পছন্দ হবেই সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু কত জন মানুষের পছন্দ হবে, তার কোনও আন্দাজ ছিল না। স্বপ্নও দেখিনি।

আরও পড়ুন: মুভি রিভিউ: গ্রামে ঘোরে মহিলা ভূত, পৌঁছে দেয় গভীর বার্তা

‘স্ত্রী’ এত সফল। কিন্তু আপনাদেরই আগের দু’টি ছবি ‘হ্যাপি এন্ডিং’ এবং ‘আ জেন্টলম্যান’ সে ভাবে সফল হয়নি। তার কারণ কী মনে হয়?

গোটা দেশ দেখতে চাইছিল দেশের ভিতরটা। আর আমাদের ছবিতে দেখতে পাচ্ছিলাম একটা বিদেশি ছাপ। কেন হিট হল না? এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা চর্চা করতেই থাকি, না হলে আর সামনের দিকে এগনো যাবে না।

আর এই বিদেশি ছাপটার জন্যই কি রাজ অ্যান্ড ডিকে-র সব ছবির টাইটেল ইংরেজিতে?

না সেটা ভেবে দেখিনি। আসলে আমরা ইংরেজিতেই তো স্ক্রিপ্ট লিখি। আর লিখতে লিখতেই কিছু শব্দ মাথার মধ্যে গেঁথে যায়। আর সেগুলোই কখনও কখনও টাইটেল হয়ে যায়। তবে ‘শোর ইন দ্য সিটি’-র টাইটেল ভেবেছিলাম ‘শোর’। কিন্তু সেই টাইটেল রাখার অনুমতি আমাদের সিবিএফসি দেয়নি।

‘স্ত্রী’র জন্য কি রাজকুমার রাও আর শ্রদ্ধা কপূরই আপনাদের প্রথম পছন্দ ছিলেন?

হ্যাঁ। রাজকুমার রাও আমার পছন্দের অভিনেতা। স্ক্রিপ্টের ফাইনাল ড্রাফ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি রাজকুমারকে ফোন করেছিলাম। আর স্ক্রিপ্ট পড়েই আমাকে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ করে দিয়েছিল রাজকুমার। পঙ্কজ ত্রিপাঠিও আমার ফার্স্ট চয়েস ছিলেন। শুধু  শ্রদ্ধার কথা ভেবেছিলেন আমাদেরই কো-প্রোডিউসার দিনেশ বিজয়ন। শ্রদ্ধাও গল্প শুনে রাজি হয়ে গিয়েছিল।

অরিজিনাল সিরিজের রেকি করতে লাদাখে রাজ অ্যান্ড ডিকে।

সইফ আলি খান, কুণাল খেমু, সিদ্ধার্থ মলহোত্র, রাজকুমার রাও, মনোজ বাজপেয়ী— কার সঙ্গে সব থেকে বেশি কমফর্টেবল আপনি আর ডিকে?

সবার সঙ্গেই সমান কমফর্টেবল। তবে সইফ এক অন্য জগতের মানুষ। ‘গো গোয়া গন’ ছবির জন্য প্রোডিউসার পাচ্ছিলাম না। কুণাল (কুণাল খেমু) সইফকে আমাদের কথা বলেছিল। অ্যানিমেটড একটা টিজার বানিয়েছিলাম সইফকে দেখাব বলে। ওটা দেখার পরেই স্ক্রিপ্টটা পড়তে চায় সইফ। আর পড়া শেষ হতে না হতেই আমাকে ফোন করে বলে যে, ওই প্রোডিউস করতে চায়।

কী মনে হয়, বলিউড এখন ভাল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?

প্রথমেই বলি, মানুষ ভাল ছবি, অর্থাৎ কন্টেন্ট নির্ভর ছবি দেখতে চাইছেন। আর এক্কেবারে সে রকমই ছবি তাঁদের সামনে নিয়ে হাজির হচ্ছেন অনুরাগ কাশ্যপ, দিবাকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিক্রমাদিত্য মতওয়ানে, সুজিত সরকার, বিশাল ভরদ্বাজ এবং আরও বেশ কিছু পরিচালক। এই মুহূর্তে নানা জঁরের ছবি তৈরি হচ্ছে বলিউডে। ওই মশলাদার ফর্মুলাটাই এখন উধাও।

আপনার নাকি কলকাতায় হেব্বি কানেকশন?

আমার মাসি ক্লাসিকাল সিঙ্গার সুমিত্রা গুহ কলকাতাতেই থাকেন। কিছু দিন আগেই ‘পদ্মশ্রী’ও পেয়েছেন মাসি। ছোটবেলা থেকে বহু বারই মাসির বাড়ি গিয়েছি। আর আমার স্ত্রীও বাঙালি। ওঁর নাম সামলি দে। লুচি...ছোলার ডাল আর বেগুনি আমার সব থেকে প্রিয়। ক্ষিরকদম্ব আর ল্যাংচা তো আছেই। আমি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটা দেখেছি। কি সুন্দর একটা ছবি। সামলি আমাকে সিন বাই সিন ধরে ধরে বুঝিয়ে দিয়েছে। কলকাতা আমার খুব ভাল লাগে। খালি রাস্তার মাঝে মাঝে ওই ল্যাম্পপোস্ট খুব বিরক্তিকর।

নতুন প্রজেক্ট কিছু আসছে?

অরিজিনাল সিরিজ হচ্ছে। তেলুগুতে বেশ কিছু ছবি প্রোডিউস করছি। আর ‘গো গোয়া গন’-এর সিকুয়েলও তৈরি করব বলে ঠিক করেছি। পাঁচ বছর হয়ে গেল। অনেক দিন ধরেই আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করছে, ‘গো গোয়া গন’-এর সিকুয়েল কবে হবে? এ বার মনে হয় সময়টা চলে এসেছে।

(সেলেব্রিটি ইন্টারভিউ, সেলেব্রিটিদের লাভস্টোরি, তারকাদের বিয়ে, তারকাদের জন্মদিন থেকে স্টার কিডসদের খবর - সমস্ত সেলেব্রিটি গসিপ পড়তে চোখ রাখুন আমাদের বিনোদন বিভাগে।)