ফিরাঙ্গি

পরিচালনা: রাজীব ধিঙ্গরা

অভিনয়: কপিল শর্মা, ঈশিতা দত্ত, মনিকা গিল, রাজেশ শর্মা, কুমুদ মিশ্রা

জনপ্রিয় হিন্দি স্ট্যান্ড আপ কমেডি অনুষ্ঠান ‘দ্য কপিল শর্মা শো’ আমি টিভিতে কোনদিনও দেখিনি। ইউটিউবেও কোনও দিন দেখিনি। সত্যি বলতে, অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যমে কপিল শর্মাকে আমি প্রায় দেখিইনি। কিন্তু খবরের কাগজ আর বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালে কপিল শর্মাকে নিয়ে বিভিন্ন খবর রেগুলার বেসিসে চোখে পড়েছে। তা তাঁর সহকর্মী সুনীল গ্রোভারের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঝগড়া হোক বা তার টিভি শোয়ের আগে শাহরুখ খানকে অপেক্ষার করানোর মতো দুঃসাহসিক ঘটনা হোক বা দু’-মাস যাবত তার শো বন্ধ থাকার খবরই হোক বা অনুষ্ঠানটি কবে শুরু হবে তাই নিয়ে দর্শকদের আকুতির খবরই হোক। বরাবরই তিনি খবরের শিরনামে। আব্বাস-মস্তানের পরিচালনায় ২০১৫ সালে কপিল ‘কিস কিসকো পেয়ার করু’ নামক একটা ছবি করেছিলেন। এই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র ছবি ছিল। যা কি না সব দিক থেকেই একটি অ্যাভারেজ ছবি। তার জন্য এ ভাবে খবরের শিরোনাম পাওয়া যায় না। ফলে তাঁকে নিয়ে এত খবর যখন বেরচ্ছে তখন এটা খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে তিনি ছোট পর্দার এক জন বিশাল ব্যক্তিত্ব। সোজা কথায় হয়তো ‘কমেডি কিঙ্গ’। হয়তো এক জন অবিসংবাদী নায়ক। দীর্ঘ দিন পর্দার বাইরে থাকার পর এহেন কপিল শর্মা ফিরে এসেছেন তাঁর হোম প্রোডাকশনের ছবি ‘ফিরাঙ্গি’-র মাধ্যমে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন তাঁর ঘরের লোক রাজীব ধিঙ্গরা। রাজীব ‘দ্য কপিল শর্মা শো’-এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। ফলে এটি অনুমেয় যে ছবিটির ওপর সমস্ত কন্ট্রোল কপিলের হাতে ছিল। ফলে সব দিক থেকেই ছোট পর্দার এক জন মস্ত বড় সুপারস্টারের দ্বিতীয় এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র অধ্যায় হল ‘ফিরাঙ্গি’।

যাত্রা, থিয়েটার, টেলিভিশন সিরিয়াল, স্ট্যান্ড আপ কমেডি ইত্যাদি মাধ্যমের বহু নামকরা অভিনেতারা সিনেমায় এসে ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টোটাও বাহু বার হয়েছে। ব্যর্থ হওয়ার একমাত্র কারণ হল দুটো মাধ্যমের মধ্যে অভিনয়ের পার্থক্যটা বুঝতে না পারা। একটা মাধ্যমে যে জিনিসটা খুব সপ্রতিভ লাগে অন্য মাধ্যমে অধিকাংশ সময়েই সেটা অতিনাটকীয় বা ভাঁড়ামো হয়ে যায়। খুব কম মানুষই এই পার্থক্যটা বুঝতে পেরেছেন এবং দু’জায়গাতেই সফল হয়েছেন। হলফ করে বলতে পারব না, তবে ‘ফিরাঙ্গি’-তে কপিল শর্মাকে দেখে আমার মনে হয়েছে যে সিনেমায় উনি অনেক দূর যাবেন। হিন্দি সিনেমায় চিরকালই দাপুটে নায়ক, বলশালী নায়ক আর অতিমাত্রায় সুদর্শন প্রেমিক গোছের নায়কদের পাশাপাশি এক ধরনের নায়কের উপস্থিতি ছিল যারা স্বাভাবিক নায়ক। অমল পালেকর, ফারুক শেখ ঘরানার। মারাত্মক প্রতিভার অধিকারী কিন্তু অভিনয়ে তার প্রকাশ ঘটে খুবই নমনীয় ভাবে। কোনও হিরোইজম নেই। এরা আমার আপনার মতো খুবই সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। কপিল শর্মা এই ঘরানারই এক জন উত্তরসূরি হতে পারেন যদি ভবিষ্যতে এই হিরোইজমের টোপটা তিনি একেবারেই ত্যাগ করে দিতে পারেন। কারণ এই ছবিতে তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন ভেতরের স্টার সত্তা ঝেড়ে ফেলার, সফলও হয়েছেন অনেকটাই। কিন্তু কাপ আর ঠোঁটের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যটা থেকে গেছে।

‘ফিরাঙ্গি’ ছবির একটি দৃশ্যে কপিল শর্মা। ছবি: টুইটারের সৌজন্যে।

‘ফিরাঙ্গি’ একটি পিরিয়ড ড্রামা ফিল্ম। ১৯২১ সালের ব্রিটিশ শাসনকালে উত্তর ভারতের একটি রাজ্যের গল্প। এ সব ক্ষেত্রে ছবি তৈরির আগে নির্মাতাদের কিছু রিসার্চ করতে হয়। কিছু রেফারেন্স খুঁজে বের করতে হয়। রিসার্চ মূলত স্ক্রিপ্ট ও আর্ট ডিরেকশনের কাজের জন্য করা হয়। আর রেফারেন্স দরকার হয় বিভিন্ন কাজের গোড়াপত্তনের সময়। এ ক্ষেত্রে ছবির প্রোডাকশন ডিজাইন আর কনসেপ্ট ডিজাইন নিয়ে কয়েকটি ইন্টারেস্টিং জিনিস লক্ষ করা গেল। প্রোডাকশন ডিজাইন। মানে সহজ কথায় ছবিটা দেখতে কেমন হবে। আর কনসেপ্ট ডিজাইন করতে হয় ছবির অ্যাপ্রোচ কেমন হবে তার জন্য। আর এই দুটো ক্ষেত্রেই এই ছবির নির্মাতাদের এক এবং হয়তো একমাত্র রেফারেন্স হল ‘লাগান’। ২০০১ সালে নির্মিত আমির খান অভিনীত আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত ক্লাসিক ছবি। ভুবন ও তার সঙ্গীদের ক্রিকেট ম্যাচ খেলে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কালজয়ী গল্প মনে নেই এ রকম মানুষ পাওয়া দুষ্কর। এখানেও এ রকমই একটি বিষয় নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সে সব নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। ‘লগান’-এর রেফারেন্স-ও খানিকটা ‘দো বিঘা জমিন (১৯৫৩)’ আর ‘মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭)’ থেকে ধার করা ছিল। কিন্তু সমস্যাটা হল চিত্রনাট্যে। রেফারেন্স যেখান থেকেই নেওয়া হোক না কেন, প্রচেষ্টা যত ভাল হোক না কেন, গোছানো চিত্রনাট্যের অভাবে তা কখনওই পূর্ণতা পেতে পারে না। এই ছবিতেও পায়নি। কিন্তু এই কথা বলে ছবিকে খারাপ বলাটা অন্যায় কাজ। ছবিতে কিছু কিছু জিনিস খুব মিষ্টি। আর ছবির সব থেকে বড় গুণ হল ছবির ইনোসেন্স। ছবির সঙ্গে জড়িত এক জন ব্যক্তির মধ্যেও কোনও রকম পাকামো নেই। তাঁরা জানেন তাঁরা নবীন। অনেক কিছু এখনও শেখার বাকি আছে। যেতেও হবে অনেক দূর। এই ছবি তাঁদের এই পথকে সুগম করবে বলে আমি নিশ্চিত।

আরও পড়ুন, মুভি রিভিউ: ‘চিত্রকর’ দেখতে বসে বই পড়ছি বা বক্তৃতা শুনছি মনে হল

আরও পড়ুন, মুভি রিভিউ: এত তাল কাটাকাটি নিয়েও ‘সমান্তরাল’!

ছবিটা আপনারা দেখুন। আপনাদের চেনা কপিলকে হয়তো আপনারা পাবেন না। কিন্তু এক জন শিল্পী কী ভাবে ম্যাচিওর্ড হতে পারে সেটা ধরতে পারবেন। অচেনা মাঠে এক জন খেলোয়াড় কী ভাবে গোটা দলকে একার কাঁধে নিয়ে হার না মানা খেলা খেলতে পারেন, চোখের সামনে তার প্রমাণ পাবেন। সব কিছু হয়তো ভাল লাগবে না, কিন্তু একটা নতুন সম্ভাবনার ভাগীদার হতে পারেন। একটা নতুন ইতিহাস সূচনার সাক্ষী হয়তো হয়ে যেতে পারেন। কপিল শর্মা আপনি সত্যি এক জন ভাবুক। আপনি সত্যিই এক জন দার্শনিক। আপনি সত্যিই এক জন খুব বড় মাপের প্রতিভা। এর পর থেকে টিভিতে আপনার শো দেখব। আর পরবর্তী কালে ছবিতেও আপনাকে আরও অনেক বেশি করে দেখার অপেক্ষায় থাকব।