×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা: কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলা এক গল্প

রেশমী প্রামাণিক
২৮ জুলাই ২০১৭ ১৭:৩৩

লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা

পরিচালনা: অলংকৃতা শ্রীবাস্তব

অভিনয়: রত্না পাঠক শাহ, কঙ্কণা সেন শর্মা, অহনা কুমরা, প্লাবিতা বড়ঠাকুর, সুশান্ত সিংহ, বিক্রান্ত মাসি, বৈভব ত্তত্বাদি।

Advertisement

ধরুন, কোনও একটি বাচ্চা মেয়েকে আপনি কিছু উপহার দেবেন। সেটা পোশাক হতে পারে, খেলনা হতে পারে, ব্যাগ বা অন্য কিছু। আপনার নজর কিন্তু প্রথমেই যাবে ‘পিঙ্ক’ রঙের দিকে। ‘ব্লু’ কিংবা ‘সি গ্রিন’ নয়। আসলে ছোট থেকে কোথাও যেন আমাদের মধ্যে গেথে দেওয়া হয়েছে ‘পিঙ্ক’ রংটি কেবলমাত্র মেয়েদের জন্য ধার্য। কোনও ছেলে ‘পিঙ্ক’ পরলেই তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে হবে। কিংবা কোনও ছেলে যদি শখ করে দু’বেলা গালে ক্রিম ঘষে, ‘ওটা মেয়েলিপনা’— এই জাতীয় খোঁটা তাকে শুনতে হয়। আবার কোনও মেয়ে যদি ছোট করে চুল ছেঁটে রাখে, তা হলে তাকে বলা হয় ‘মেয়েছেলে’ হয়ে ‘ব্যাটাছেলে’দের মতো চুল কাটা কেন?

‘বিবি হো, সোহর বন্নে কি কোশিশ মত করো’, ‘লিপস্টিক মত লাগাও, অ্যাফেয়ার হো যায়ে’— ট্রেলরেই মোটামুটি একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সমাজ এখনও তার সামাজিক ঘেরাটোপের মধ্যে আটকে রাখতে চায় মেয়েদের অন্তরের ইচ্ছেগুলোকে। ‘সহনশীলতা’ হল তাদের একমাত্র মাপকাঠি।

এ গল্প ভোপালের চার সাধারণ মেয়ের। ‘চুরি’ থেকে ‘মিথ্যে বুলি’— নিজেদের ইচ্ছেপূরণের জন্য যা খুশি তাই করে। সামাজিক বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এসে এরা ‘পরিবার’ এবং ‘পুরুষতন্ত্র’কে নেড়ে ঘেঁটে একাকার করে দেয়। এক জন ছেলে যদি অন্যের উপর জোর খাটিয়ে তার ইচ্ছেগুলো আদায় করতে পারে, তা হলে একটি মেয়েরও সেই অধিকার থাকে তার মনের ইচ্ছাপূরণ করার। ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’ সেই বাঁধনটাই খুলে দেয়।



রোজি নামের একটি মেয়ের গল্পের মাধ্যমে কাহিনিতে প্রবেশ চার প্রোটাগনিস্টের। মধ্যবয়সী স্বামীহারা বুয়াজি (রত্না পাঠক শাহ), যার মনে প্রবল যৌন ইচ্ছা। স্বামীর থেকে লুকিয়ে বাড়ি বাড়ি সেলসগার্লের কাজ করা গৃহবধূ শিরিণ (কঙ্কণা সেন শর্মা)। এবং এই কাজে তার বেশ নামডাকও হয়। বিউটি পার্লার চালানো লীলা (অহনা কুমরা)। যার কাছে যৌনতা মানে কেবল ফুলশয্যার রাত নয়, শরীরের চাহিদা অনুযায়ী যখন ইচ্ছে তখন। সদ্য কলেজ পড়ুয়া পাশ্চাত্য সঙ্গীতানুরাগী রেহানা (প্লাবিতা বড়ঠাকুর)। যার বাবার বোরখার দোকান। যে নিজে কলেজে বোরখার নীচে জিন্স পরে যায় এবং ফ্রেশার্সের পর ছোটে কলেজ ব্যান্ডে অডিশন দিতে। এ ভাবেই এগিয়ে চলে মেয়ে থেকে মহিলা হয়ে ওঠার গল্প। ‘লিপস্টিকওয়ালির স্বপ্ন’। মাঝবয়সী বুয়াজির সাঁতার শিখতে যাওয়া এবং হাঁটুর বয়সী সেই সাঁতার প্রশিক্ষকের সঙ্গে প্রেমে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া সুইমিংপুলের নীল জলে।

কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে এ গল্প বলতে পারার জন্য কুর্নিশ পরিচালক অলংকৃতা শ্রীবাস্তবকে। তাত্ত্বিক বিচারে তিনি ঠিক বেঠিকের রাস্তায় হাঁটেননি। এমনকী শেষ পর্যন্ত সঠিক মুক্তির পথ পায় না তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা। শুধু থেকে যায় তাদের কল্পনা। সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা কিছু ঘটনাকে পাশাপাশি তুলে ধরেছেন মাত্র। অনিচ্ছা সত্বেও মেনে নিতে হয় স্বামীর পরকীয়াকে। প্রতি রাতে চোখ বুজে সহ্য করতে হয় যৌনযন্ত্রণা। অনুমতি না নিয়েই অন্যত্র বিয়ে ঠিক করেন পরিজনেরা। হবু বর মেয়েটির মনের কথা না জেনেই তার ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নেয় খেলার সংসার। আর বাক্সবন্দি করে রোম্যান্সটা তুলে রাখতে চায় বিবাহ পরবর্তী দিনগুলোর জন্য।

আরও পড়ুন:‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’র সেলেব রিভিউ

বেশ কিছু দৃশ্যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক অলংকৃতা। মোটামুটি ভালই লাগে ছবির সঙ্গীত পরিচালক জেবউন্নিশা বঙ্গেশের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর। নিজ নিজ চরিত্রে যথাযথ রত্না পাঠক শাহ এবং কঙ্কণা সেন শর্মা। তাঁদের যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন সুশান্ত সিংহ, বিক্রান্ত মাসি। নবাগতা হিসেবে দারুণ চ্যালেঞ্জিং কাজ করে ফেলেছেন অহনা কুমরা এবং প্লাবিতা বড়ঠাকুর। তবে শেষটা যেন দ্রুত হয়ে গেল। আর একটু যত্ন নিয়ে এন্ডিংটা হলে ভাল হত। ছবি দেখলে মালুম হয় যৌনতা নিয়ে কতটা ছুঁৎমার্গ রয়েছে সেন্সর বোর্ডের।

তবে ‘লেডিস ছবি’ ‘ফেমিনিস্ট ছবি’ প্রচুর ‘লেডিস’ দেখতে আসবে এই দিয়ে তো আর সিনেমার বিচার হয় না। ছবিটি দেখে আপনি কতটা আনন্দ পেলেন বা আপনাকে আদেও আনন্দ দিতে পারল কিনা সেটাই মুখ্য। দুঃখ কষ্টের মধ্যেও মজা পাগলামিতে ভরপুর এই ছবি। সময় করে দেখে আসতে পারলে ক্ষতির কিছু নেই। সমালোচনা নয়, ছবি দেখে কিছু উপলব্ধির কথা ধরা রইল এই প্রতিবেদনে।

সবশেষে যেটা বলার সিগারেটের ‘সুখটানেই’ কিন্তু আল্টিমেট মুক্তি নয়।



Tags:
Film Review Lipstick Under My Burkha Alankrita Shrivastava Prakash Jha Konkona Sen Sharma Aahana Kumra Ratna Pathak Vikrant Masseyলিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখাঅলংকৃতা শ্রীবাস্তব

Advertisement