নিছকই ছবি রিলিজ নয়। বরং কলকাতার জন্যও একটা পরীক্ষা। পরিচালক সুমন ঘোষ খানিকটা সে-ভাবেই বিষয়টা দেখছেন। 

আজ, শুক্রবার শহরের মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পাচ্ছে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে বহুচর্চিত তথ্যচিত্র ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’! কফিহাউস, কলেজ ক্যান্টিন থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার আসরে তার্কিক কলকাতার সঙ্গে এখনও দেখা হচ্ছে অহরহ। তবে বড় পর্দায় ‘বাহুবলী’, ‘দঙ্গল’ বা বড়জোর বাঙালির ব্যোমকেশ-ফেলুদার বিচরণের ময়দানে এই তথ্যচিত্র কতটা খাপ খাবে প্রশ্ন সেখানেই। 

এর সূত্র ধরেই উঠে আসছে অন্য তর্ক। একটি আমন্ত্রণমূলক শোয়ে তথ্যচিত্রটি আগেই দেখে ফেলেছেন প্রাক্তন আইএএস-কর্তা তথা সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ জহর সরকার। ছবিটি দেখতে দেখতে তাঁর মনে পড়ছিল, বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে রাজা মিলিন্দের প্রশ্নমালা বা প্লেটো, অ্যারিস্টটলের সংলাপ-ভিত্তিক সাহিত্যকর্মের কথা। অমর্ত্য এবং তাঁর যশস্বী ছাত্র কৌশিক বসুর আলাপচারিতাই ছবিটির সুর বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক ছবি দেখতে কতটা সাড়া দেবেন সাধারণ দর্শক? 

পরিচালক সুমন হাসছেন, ‘‘দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতার ঝোঁকটা জরিপ করছি, ধরুন!’’ নন্দন-টু ছাড়া তিনটি মাল্টিপ্লেক্সে সান্ধ্য শোয়ে চলবে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্র। তবে জহরবাবুর কাছে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে বাঙালির আবেগও গুরুত্বপূর্ণ ঠেকছে। তাঁর সরস টিপ্পনী, ‘‘বিদেশে স্বীকৃতির পরে রামমোহন, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কাউকেই বাঙালি ফেরায়নি। অমর্ত্যই বা কেন ব্যতিক্রম হবেন?’’ তবে এ ছবি দেখলেই মননশীলতার পরীক্ষায় বাঙালি উতরে গেল বলতে রাজি নন আর এক সুলেখক, চিন্তাশীল বাঙালি স্বপন দাশগুপ্ত। 

রাজ্যসভায় বিজেপির সদস্য স্বপনবাবু এ ক্ষেত্রে অমর্ত্য সেনের ভারতবীক্ষা নিয়ে তর্কে যাচ্ছেন না। ‘‘ভারতে সংস্কৃতির বহু স্বর বা কনটেস্ট অব আইডিয়াজ মেনে নিলেও, বাংলায় ভিন্ন মতের টক্কর কই?’’ স্বপনবাবুর পর্যবেক্ষণ, ‘‘এখানে একপেশে বাম ঝোঁক ভরপুর ঐকমত্যই প্রকট। তবে বলা যায় না, সেটাও হয়তো পাল্টে যাবে!’’ 

ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিত অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক সুকান্ত চৌধুরী কিন্তু মনে করেন, বাংলায় বৌদ্ধিক চিন্তার খোলা হাওয়া এখনও উবে যায়নি। তবে তাঁর শঙ্কা, ‘‘এখানেও মু্ক্ত চিন্তা রুখে দেওয়ার প্রবণতা দেখছি। যা অশনি সঙ্কেত।’’ সার্বিক ভাবে কলকাতার মেধার চর্চাতেও কিছু দৈন্যের ছাপ দেখছেন অনেকে। দিল্লিতে অন্তত ঋদ্ধ করার মতো তথ্যচিত্র, চিত্রকলা প্রদর্শনী, আলোচনাসভার বহর কলকাতার তিন-চার গুণ বেশি। স্বপনবাবুর মতে, ‘‘অর্থনৈতিক বিকাশ থমকে বলেই বৌদ্ধিকতার উৎকর্ষও মার খাচ্ছে।’’  

     তবে কোনও অবস্থাতেই এমন তথ্যচিত্রের পরিসর খুলে দেওয়ায় বাধা নেই, মনে করেন শঙ্খ ঘোষ। ‘‘আমার বিশ্বাস, কলকাতায় অনেকেই এমন ছবি দেখতে চাইবেন। আর ক’জন দেখতে চাইলেন বড় কথা নয়। বাজার কতটা বড় না-মেপেই ছবিটা দেখানো উচিত।’’ —বলছেন, প্রবীণ কবি।