Advertisement
E-Paper

পর্দায় ঠোঁটে ঠোঁট রাখার নেপথ্য গল্প, সাবালক হতে টলিউড খুঁজছে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর?

পেশাগত পরিচয়ে যাঁঁদের বলা হয় ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর, হলিউড থেকে বলিউডে ইদানীং তাঁদের বেশ কদর। টলিউডও কি সাবালক হতে কোচিং নেওয়ার কথা ভাবছে?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
টলিউডও কি খুঁজছে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর?

টলিউডও কি খুঁজছে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

‘ব্যাডস অফ বলিউড’ সিরিজ়ে ইমরান হাশমি অভিনীত চরিত্রের কথা মনে আছে? তরুণ দুই অভিনেতাকে তিনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন অন্তরঙ্গতার পাঠ। পেশাগত পরিচয়ে যাঁঁদের বলা হয় ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর। হলিউড থেকে বলিউডেও ইদানীং তাঁদের বেশ কদর। টলিউডও কি সাবালক হতে কোচিং নেওয়ার কথা ভাবছে?

শেষ কয়েক বছরের বাংলা ছবির দিকে একটু নজর রাখলে সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘কিলবিল সোসাইটি’-র ক্লাইম্যাক্সে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের চুম্বন দৃশ্য নিয়ে বেশ চর্চা হয়েছে। কৌশানীকে বলতেও

শোনা যায়, পরমব্রত নাকি ইমরান হাশমির মতো চুমু খায়। তবে যতদূর জানা যায়, ওই ছবির ফ্লোরে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছিলেন, মুম্বই থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল তাঁকে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের এই দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে সুবিধা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কৌশানীর কথা, ‘আমার যেহেতু জীবনে এটা প্রথম বার অনস্ক্রিন লিপ কিস, সেটা নিয়ে আমি স্বচ্ছন্দ হতে পারছিলাম না। কারণ, আমরা তো কমার্শিয়াল ছবি করে অভ্যস্ত, সেখানে আমরা নায়ক-নায়িকার রসায়ন দেখি। কিন্তু সেখানে একটা মাত্রা থাকে, টেকনিক্যাল দিকটাও থাকে। কিন্তু ছবির ক্লাইম্যাক্সের চিত্রনাট্যেই এই দৃশ্যের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তাই আমায় এটা করতেই হত। আমার একটাই শর্ত ছিল। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং প্রযোজনা সংস্থা আমায় খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করিয়েছেন। তাঁরা এক কথায় ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর মুম্বই থেকে নিয়ে আসেন, শুধুমাত্র ওই দৃশ্যের জন্য। আমার মনে হয়েছে তাঁর উপস্থিতি বেশ সাহায্য করেছিল আমায় স্বাভাবিক হতে।’

‘কিলবিল সোসাইটি’ ছবির দৃশ্য়।

‘কিলবিল সোসাইটি’ ছবির দৃশ্য়। ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ছবিতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং আগেও হয়েছে। নান্দনিক ভাবেই তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে অভিনেতারা নিজেদের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতায় দৃশ্যটিকে বাস্তবসম্মত করে তুলতেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় ‘চোখের বালি’ ছবিতে রাইমা সেনের সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন। যে দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। প্রসেনজিৎ বলেন, রাইমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের শয্যাদৃশ্যের শুটিং করেছি। আমি রাইমাকে প্রম্পট্‌ করে করে শুটিং করেছিলাম। আবার রানি মুখার্জি যখন প্রথম বাংলা ছবি করল, ‘বিয়ের ফুল’ সেখানেও আমার সঙ্গে রোম্যান্টিক দৃশ্য ছিল। রামদা তখন ওকে বোঝাতে পারছিল না, রানির তখন পনেরো বছর বয়স। তখন ওকে রোম্যান্স করতে শিখিয়েছিলাম। সম্পর্কে আমি তখন ওর মেসো। এ রকম কঠিন দৃশ্য অনেক বারই এসেছে আমার কেরিয়ারে।’

প্রবীণ অভিনেতা চিরঞ্জিতের আবার মত আবার খানিক ভিন্ন। তাঁর মতে, ‘‘এমন দৃশ্য করার আগে অভিনেতারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে নেন। দু’জন অভিনেতার বোঝাপড়াটাই আসল। আমার তো মনে হয় বেশিরভাগ ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যই হত। আবার অন্যভাবে দেখলে পর্দায় উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেনের থেকে বেশি অন্তরঙ্গ তো কেউ ছিলেন না। তখন শয্যাদৃশ্য না থাকলেও ছবি এমনিই সুপারহিট হত। বাঙালিয়ানায় ওই ধরনের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য এখনও লাগে না বলেই মনে হয় আমার।’’

ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে আবীর-তনুশ্রী।

ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে আবীর-তনুশ্রী। ছবি: সংগৃহীত

সময় দ্রুত বদলাচ্ছে। ওটিটি-র জমানায় এখন নানা ধরনের ছবির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে দর্শকের। ফলে বাংলা ছবিরও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের জমানা বদল হচ্ছে। গত বছর জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি 'ডিপ-ফ্রিজ'-এ আবীর চট্টোপাধ্যায় এবং তনুশ্রী চক্রবর্তীর চুম্বন দৃশ্যে কোনও এক্সপার্ট রাখা হয়নি। আবীর চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এই কনসেপ্টটা নতুন। ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর থাকলে যদি কাজের সুবিধা হয় তা হলে আমি স্বাগত সেটাকে জানাই। যদি সেটা রুচিসম্মত ভাবে এবং অভিনেতা অভিনেত্রীরা যদি সাবলীল ভাবে কাজ করতে পারেন তা হলে তো তার থেকে ভাল কিছু হতে পারে না।’’

তবে পরিচালক অর্জুন দত্তের ভাবনা আলাদা। তাঁর মতে যাঁরা দু’জন এই দৃশ্যে অভিনয় করছেন তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকাটা খুব দরকার। যেমন ডিপ-ফ্রিজ-এ আবীর চট্টোপাধ্যায় এবং তনুশ্রী চক্রবর্তীর চুম্বন দৃশ্য অনায়াসে শুটিং করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এটা অভিনেতাদের উপর নির্ভরশীল। বিদেশি ছবিতে থাকে, ইন্টিমেসি ডিরেক্টরও থাকেন। অর্জুন বলেছেন, ‘‘আবীর-তনুশ্রী দু’জনেরই বন্ধুত্ব রয়েছে তাই একে অপরের সঙ্গে কথা বলে দৃশ্য করতে স্বচ্ছন্দ হয়েছেন। অন্য দিকে, আবীর-অনুরাধার দৃশ্যে চিট করে শুট করতে হয়েছে। বাংলা ছবি তৈরি করতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাজেটের ঘাটতি থাকে, সে ক্ষেত্রে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর রাখতে গেলে বাজেট আরও বাড়বে।’’

পরমব্রত ও ইশার চুম্বনদৃশ্য।

পরমব্রত ও ইশার চুম্বনদৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

অনির্বাণ ও পরমব্রতর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে ইশাকে। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘সবসময় কো-অ্যাক্টরের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকতে হবে তাঁর কোনও মানে নেই। অনির্বাণের সঙ্গে একটা দৃশ্য ছিল, পরমব্রতদার সঙ্গেও ছিল। কিন্তু এমন নয় যে, ওঁদের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল আমার আগে থেকে। এটা মিউচ্যুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং, অভিনেতার সঙ্গে কাজ করতে করতে একটা কমফোর্ট লেভেল তৈরি হয়। খুব টেকনিক্যালি হয় বিষয়টা সকলের মধ্যে, মনে হতে পারে অভিনেতারা এনজয় করছেন, তা কিন্তু একেবারেই নয়।’’

কী ভাবে কাজ করেন এই ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর? ইন্ডাস্ট্রির লোকজন জানালেন, ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটররা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য অভিনেতাদের আড়ষ্টতা কাটিয়ে দেন এবং মহড়ার সাহায্যে অভিনেতাদের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করে দেন যাতে তাঁরা অভিনয় ও ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন। এ ছাড়াও ক্যামেরার কারসাজিও অভিনেতাদের বুঝিয়ে দেন তাঁরা। দুই অভিনেতার সম্মতিতে অন্তরঙ্গতার সীমানা নির্দিষ্ট করেন এবং অবশ্যই অভিনেতার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়তা করেন তাঁরা। কোনও ভাবে যাতে দু'জন অভিনেতার মধ্যে দৃশ্যের প্রয়োজনের বাইরে শারীরিক কোনও স্পর্শ না হয় সে দিকটাও দেখেন ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর।

অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ে সিনেমাটোগ্রাফারের ভূমিকা অনেক। এটা মনে করিয়ে দিয়ে চিত্রগ্রাহক শমীক হালদারের বক্তব্য, ‘‘আমরা খুব ছোট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করি। আমরা সবাই সবাইকে চিনি। যদি কেউ সিনিয়র থাকেন তাঁরা নিজেদের মতো করে করে নেন। টেকনিক্যালি অনেক অ্যাঙ্গেলে শট নেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্যামেরার কারসাজি থাকে, অনেক কাট করা হয়। এ ভাবেই শুটিং করা হয়।’’

দেব-শুভশ্রীর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য।

দেব-শুভশ্রীর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

প্রযোজকের কতটা ইন্টিমেসি ডিরেক্টরকে ছবিতে রাখার সামর্থ্য রয়েছে। রানা সরকারের মতে, ‘‘বাজেট থাকলে ইন্টিমেসি ডিরেক্টরই নিয়ে আসব। তবে আমাদের ভান্ডার তো অতটা নয়। সে ক্ষেত্রে সেই দৃশ্য রাখব না ছবিতে। আর না হলে যে অভিনেতা-অভিনেত্রী স্বচ্ছন্দবোধ করবেন তাঁদের নিয়ে কাজ করব।’’

পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী টলিউড এবং বলিউড, দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। তাঁর মতে, ‘‘ফাইট ডিরেক্টর হোক বা কোরিয়োগ্রাফার, আমরা তো সকলকেই নিয়ে আসি অভিনেতাদের জন্য। আমি যা ছবি করেছি, আগে অভিনেতাদের স্বচ্ছন্দের কথা মাথায় রেখেছি। ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে একটা ড্রামা একটা ভালোবাসার মুহূর্ত তৈরি হয়। আমি আমার সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে কথা বলে কতটা নান্দনিকতার সঙ্গে সেই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা যায় তার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি ওই দৃশ্য কারও হাতেও ছাড়তে পারব না। পরিচালকদেরই উচিত রেফারেন্স তৈরি করে দৃশ্যটি ফুটিয়ে তোলা, সকলের সঙ্গে কথা বলে। পরিচালককে দায়িত্ব নিতে হয়। ‘কড়ক সিং’ ছবিতেও ছিল এমন দৃশ্য যা আমি ওই ভাবেই শুটিং করেছিলাম। বলিউড হোক বা টলিউড, নিজের হাতেই এই দায়িত্ব রেখেছি।’’

বাজেটে টান আছে। নানারকম সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ক্ষেত্রেও হাতে যা আছে তা দিয়েই মোটের উপর কাজ চালিয়ে নিচ্ছে বাংলা সিনেমা। ভবিষ্যতে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর এনে কি একটু সাবালক হয়ে উঠবে ইন্ডাস্ট্রি? এ প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়।

Intimacy coordinator Tollywood Koushani Mukherjee Prasenjit Chatterjee Abir Chatterjee chiranjeet
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy