• Sunanda Sikdar
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সুখদা বরদা লক্ষ্মীদেবী, লিখছেন সুনন্দা সিকদার

ঘন গাছপাতায় ঘেরা সেই উঠোনে শরৎ-পূর্ণিমার স্বপ্নিল সেই আলো এক অলৌকিক জগতে নিয়ে যেত আমাকে।

Laxmi Puja
অলঙ্করণ: সুমন চৌধুরী।
  • Sunanda Sikdar

আমি যখন আমার শৈশবের গাঁয়ে ছিলাম, তখন সম্পন্ন হিন্দুরা গ্রাম ছেড়েছেন। সেখানে পুজো করার মতো সম্পন্ন অবস্থা কারও ছিল না। বড়দের মধ্যে গল্প হত, এ বার মা আসছেন নৌকায়, বন্যা হবে খুব। মা ফিরবেন ঘোড়ায়, ও মা, ছত্রভঙ্গ হবে চারিদিক। অথবা, মা আসছেন দোলায়, হায় হায় মড়ক লাগবে যে! মা ফিরবেন গজে- বসুন্ধরায় আসবে শান্তি, সমৃদ্ধি।

এমনি আলোচনা শুনতে শুনতে এক দিন বুঝতে পারতাম, মা চলে গিয়েছেন, এসেছে বিজয়া দশমী। এখন শুধু মিষ্টি খাওয়া আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা। ভারী অবাক হয়ে ভাবতাম, মা কোন পথেই বা এলেন, কোন পথেই বা গেলেন? তবে তাঁর আসা যাওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন আঁকা হয়ে যেত প্রকৃতিতে। শরতের শিশির ভেজা ঘাসে, নুয়ে পড়া স্থলপদ্মের ভারে, শিউলির সুগন্ধে তাঁর আসা যাওয়ার রহস্য বিছানো ছিল।

আমার শৈশবের গ্রামে হিন্দুর সংখ্যা ছিল কম। শ্রমজীবী হিন্দু ছিলেন দশ-বারো ঘর। বামুন, কায়েত মিলে বড়জোর আর পাঁচ-ছ’টি পরিবার। ব্রাহ্মণরা ছাড়া আর সবাই আসতেন আমার পালিকা মা’কে প্রণাম করতে। তার হাতের নাড়ু, মুড়কির কদর করতেন গ্রামের মুসলমানরাও। বেশ ক’দিন ধরে মিষ্টি খাওয়া আর শুভেচ্ছা বিনিময় চলত।

বিজয়া দশমীর রেশ কাটতে না কাটতেই এসে যেত লক্ষ্মীপুজো। এই পুজোটা তত ব্যয়সাধ্য নয় বলে আমার পালিকা মায়ের পক্ষে উদ্যোগী হওয়া সম্ভব হত। এই উপলক্ষে তার শুচিশুভ্র জীবন ক’দিনের জন্য রঙিন হয়ে উঠত। মহা উৎসাহে তৈরি করত সে নানা রকম নাড়ু, মুড়কি, নারকোলের চিঁড়ে ইত্যাদি। এই সব জিনিসের সুগন্ধে একদিকে যেমন উৎসবের আমেজ ছিল, অন্য দিকে কবে প্রসাদ পাব, এ সব ভেবে ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠতাম। নাড়ু হত তিলের, নারকোলের আর ক্ষিরের। আর নারকোলের চিঁড়ে বানানো ছিল খুব কঠিন কাজ। নারকোলকে চিঁড়ের মতো পাতলা পাতলা করে কেটে চিনির রসে ফুটিয়ে ঝাঁঝরি থালায় ছড়িয়ে দেওয়া হত। রস শুকিয়ে গেলে ওই মুচমুচে চিঁড়ে খেতে হত দারুণ। লক্ষ্মীদেবীর নাকি এই চিঁড়ে খুব পছন্দ, তবে আমাদের মতো ছোট ছোট ভক্তরাও এই চিঁড়ে প্রসাদ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকতাম।

লক্ষ্মীপুজোর দিন সকাল থেকে শুরু হত মায়ের আল্পনা দেওয়া। চালের গুঁড়ো গুলে গুলে উঠোনে মা একটি পদ্মলতা আর মঙ্গলকলস আঁকত। আর যে ঘরে পুজো হত, সে ঘরের পৈঠে থেকে আল্পনা শুরু হত। লক্ষ্মীর পা আঁকা হত এমন ভাবে যেন তিনি ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে চৌকাঠ ডিঙিয়ে চলেছেন পুজোর জায়গায়। আর তার পাশ দিয়ে আঁকা হত ধানের ছরা, শঙ্খলতা। আল্পনার ধারা গিয়ে শেষ হত ঠাকুরের আসনের সামনে। সেখানে আঁকা নানা লতা-পাতা-ফুল, একটি বড় আকারের প্যাঁচা, মঙ্গলকলস ইত্যাদি। পুজোর জন্য ছিল মা লক্ষ্মীর একটি পট। পটটি সাজানো হত স্থলপদ্ম, শিউলি আর টগর ফুলের মালা দিয়ে। আসনের সামনে জলভরা বিরাট মঙ্গলঘট, তার গায়ে স্বস্তিকাচিহ্ন আঁকা, সিঁদুর দিয়ে। ঘটের আমের পল্লবের উপর সশীর্ষ ডাব। ডাবের গায়েও সিঁদুরের ফোঁটা। পুজোর ঘরের দু’পাশে দু’টো কলাগাছ, লক্ষ্মীদেবী এই পথ দিয়ে ঢুকবেন, তাই এই সৌন্দর্যসাধন। লক্ষ্মীর আসনের পিছনের দেওয়ালে নতুন ধানের ছরা বাঁধা। বর্ষার পরে ধান কাটা সারা হয়ে যেত। অন্যান্য ফসলও কিছু হত। কলাগাছের খোল দিয়ে পাঁচটি সুদৃশ্য পাত্র তৈরি করে ধান ছাড়া়ও আরও চার রকমের শস্য— পান, সুপারি, কড়ি ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হত লক্ষ্মীর আসন। ওই শৈশবে আমার মনে হ়ত তিনি যেন কৃষিকাজের দেবী। বর্ষার পরে তিনি এসেছেন ফসল সমৃদ্ধ বসুন্ধরার রূপ দেখতে। ফসলের সমৃদ্ধি বোঝানোর জন্যই হয়তো যব, ছোলা, মটর, তিল, সর্ষে ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হত ঠাকুরঘর। সুখসমৃদ্ধি আর মঙ্গলের বার্তা নিয়ে আসতেন এই দেবী।

আজকের দুনিয়ায় যাকে সমৃদ্ধি বলে, ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগে তার কোনও আঁচ আমার গ্রামে পৌঁছয়নি। গ্রামের মানুষের কাছে মাঠ ভরা ফসল, গোলা ভরা ধান, উঠোনের চার ধারে কয়েক রকমের ফলের গাছ— এটাই ছিল সমৃদ্ধি। এতেই তাঁরা তৃপ্ত ছিলেন। এক চাষির মুখের একটি ছড়ার উল্লেখ করছি এ জন্য যে, কৃষিকে ঘিরেই গ্রামে ছিল সমস্ত সুখের স্বপ্ন। তার বেশি কল্পনার ডানা মেলার শক্তি তাঁদের ছিল না। ছড়াটি হল—

শুন শুন সর্বজন শুন দিয়ে মন-

সত্যযুগে চাষা ছিল সোনার বরণ।

সোনার লাঙল দিয়া করে হালচাষ-

মহাসুখে শাকভাত খায় বারোমাস।

আজকের দি‌নে ভোগে আক্রান্ত মানুষ ওইটুকু পেয়ে আদৌ খুশি হবেন না। মা লক্ষ্মীর কাছে তাঁদের দাবি অনেক বেশি। দেবীও নিশ্চয় ভক্তদের দাবি পূরণের চেষ্টা করেন। তবে মর্ত্যে আসার জন্য তাঁর বাহন নিরীহ সেই সাদা প্যাঁচাটি। এই শব্দদূষণের যুগেও সইতে পারেন না কাঁসরের আওয়াজ। শঙ্খ-ঘণ্টার ধ্বনিটুকুই তাঁর করুণা জাগানোর জন্য যথেষ্ট। এখনও তাঁর পছন্দ নাড়ু-মুড়কি-পান-সুপুরি।

গ্রামে থাকতে পালিকা মায়ের কাছে শুনেছি, কোজাগরী পূর্ণিমার রাত জেগে কাটাতে হয়। লক্ষ্মীদেবী ভোররাতে স্বর্গে ফেরার সময় বর দিয়ে যান। দাওয়ায় পাটি বিছিয়ে আমি আর মা সারা রাত জাগতাম। ঘন গাছপাতায় ঘেরা সেই উঠোনে শরৎ-পূর্ণিমার স্বপ্নিল সেই আলো এক অলৌকিক জগতে নিয়ে যেত আমাকে। গাছের মাথায় মাথায় পূর্ণ চাঁদের মায়া। দেখতে দেখতে বর চাইতে ভুলে যেতাম। কখন এক সময়ে ঘুমিয়েও পড়তাম। সকালে চমকে উঠে বলতাম, মাগো, বর চাইতে ভুলে গেছি। মা বলত, চিন্তা কী? আমি তোর জন্য বর চেয়ে নিয়েছি।

আজকের কোনও শিশু কি কোজাগরী রাতে পূর্ণ চাঁদের মায়া দেখতে পাবে? বিদ্যুতের আলোয় ডুবে যায় পূর্ণিমার আলোর অলৌকিক সেই সৌন্দর্য।

কালের নিয়মে বদলেছে মানুষের আশা-আকাঙ্খা। বর চাইবার বিষয়ও পাল্টে গেছে। তবে বদলায়নি লক্ষ্মীর পাঁচালি। বহু যুগ আগের মতো লক্ষ্মীনারায়ণ এখনও মধুর আলাপে রত।

বসন্ত পূর্ণিমা তিথি, নির্মল আকাশ

ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস।

লক্ষ্মীদেবী পাশে করি বসি নারায়ণ

করিছেন নানা কথা সুখে আলাপন

আমাদের জীবনে যত পরিবর্তনই আসুক দেবতারা বুড়ো হন না, জরা তাঁদের আক্রমণ করে না, তাঁদের জগতে চিরবসন্ত। অর্থ সংগ্রহের জ্বালা নেই, অসুখবিসুখ নেই। মন্দমলয়ানিলে মধু আলাপনে রত থাকতে বাধা কোথায়? সেই আলাপনের মাঝখানে নারদ এসে তোলেন মর্ত্যবাসীর নানা সমস্যা ও দুঃখের কথা।

লক্ষ্মীদেবী মেয়েদের নানা দোষের উল্লেখ করেন। ছেলেদের সম্পর্কে তাঁর কোনও অভিযোগ নেই। মেয়েরা ঝগড়া করে, অশান্তি করে। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির পরিজনদের প্রতি তাঁ‌দের ভক্তির অভাব। তারা উঁচু গলায় কথা বলে, উঁচু গলায় হাসে। এদের জন্যই নাকি পৃথিবী দুঃখময়।

হায়, মা লক্ষ্মী মেয়েদের প্রতি এত বিরূপ? তারা জোরে হাসবে না? জোরে কথাও বলবে না? বর যদি নিচু গলা অগ্রাহ্য করে, তাও? ঘরে বসে ব্রতপালন আর সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোই তার একমাত্র কাজ? সারা দিন ধরে বর আর শ্বশুরবাড়ির যত্ন নেবে?

হায় রে। তা হলে বহির্জগতে মেয়েরা কাজ করবে না? লেখাপড়া শিখবে না? মধ্যযুগের মতো পুরুষরাই শুধু নিজের সাফল্যকে প্রমাণ করবে? অর্ধেক জগৎ থাকবে অন্ধকারে? লক্ষ্মীদেবী কি এ রকম চাইতে পারেন সত্যি সত্যি? মনে হয় না। 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন